১৫ লাখ শ্রমিক না নেওয়ার মালয়েশিয় সিদ্ধান্তটি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঠেকেছে এদেশের বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের নিকট। বাংলাদেশ সরকারের সাথে এই পরিমাণ শ্রমিক নেওয়ার চুক্তি করার পরও সে দেশের উপ প্রধানমন্ত্রী আহমাদ জাহিদ হামিদি নিজ নির্বাচনী এলাকার গ্রাম প্রধানদের সমাবেশে দেওয়া এই নেতিবাচক ঘোষণাটি বিদ্যুৎগতিতে বাংলাদেশে চলে এসেছে। উপ প্রধানমন্ত্রী নতুন শ্রমিক আমদানির পরিবর্তে দেশে যেসব অভিবাসী শ্রমিকদের ওয়ার্ক পারমিট শেষ হয়ে গেছে কিংবা যারা অবৈধ বিবেচিত হয়েছেন তাদেরকে নিয়োগ দানের পরমার্শ দিয়েছেন নিয়োগকারীদের প্রতি। মালয়েশিয় উপ প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একেবারেই অনভিপ্রেত ও দুর্ভাগ্যজনক। যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোন ভাষ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই এ ঘোষণাটির খুঁটিনাটি দিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন। তবে সেই প্রতিক্রিয়াও যে সুখকর কিছু হবে না সেটি বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধান খাত হলো অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স। মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় কর্মক্ষেত্র। কিন্তু মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে নানা সংকটের কথা প্রায়শই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। সেখানে পুলিশের তাড়া খেয়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে বেড়ানো বাংলাদেশিদের মানবেতর জীবন যাপনের কথা সকলের জানা। মালয়েশিয় মালিকরা বাংলাদেশি শ্রমিকদের সাথে ভাল আচরণ করেন না বলে ব্যাপকমাত্রায় অভিযোগ আছে। তারপরেও দেশের অনিশ্চিত জীবিকার কারণে বাধ্য হয়ে বহু লোক প্রতিবছর বৈধ-অবৈধ পথে মালয়েশিয়া চলে যান। এইসব কষ্টসহিষ্ণু ভাগ্যবিড়ম্বিত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্সে আমরা বড়াই করার মতো জায়গায় এসেছি বটে কিন্তু তাদের দুঃখ মোচনের জন্য তেমন কিছুই করছি না। বিদেশবিভুইয়ে অসহায় বাংলাদেশিদের খবরাখবর প্রচারিত হলেও দুতাবাস কখনও তাদের সাহায্যে এগিয়ে গেছেন এমন খবর কদাচিৎ মিলে।
পৃথিবীর সর্বত্র এখন বাঙালিদের পদচারণা। ভেতো বাঙালি বিদেশে গিয়ে কর্মক্ষমতার দৃষ্টান্ত রেখে সফলতা দেখিয়ে আসছে বিগত এক শ’ বছর ধরে। কৃষি খাতের পরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এই অভিবাসীরা। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে কখনও যদি অভিবাসী শ্রমিক খাতে কোন অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ নেমে আসে তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসবে তা রোধ করার সাধ্য নেই কারও। সদ্য বিকশিত গার্মেন্টস খাতের সাধ্য নেই এই বিপর্যয় সামাল দেওয়ার। সুতরাং বিদেশে বাংলাদেশিদের সংকট নিয়ে সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে। যেখানেই সমস্যা দেখা দিবে সেখানেই তড়িৎ হস্তক্ষেপ করে সমাধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। মালয়েশিয়া হঠাৎ করে কেন ১৫ লাখ শ্রমিক নেয়া বন্ধের ঘোষণা দিল তার কারণ উদঘাটন করতে হবে পররাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়কে।
শেষ পর্যন্ত কোন দেশই বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখতে পারে না। আমরা ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয় এবং ২০৪১ সনের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের মানুষকে স্বদেশেই উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার বিস্তার, শিল্প ও কৃষির বিকাশ ভিন্ন উন্নতিব আর কোন বিকল্প নেই। ওই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার উপস্থিতির প্রয়োজন রয়েছে। সেরকম কোন পরিকল্পনা কি দৃশ্যমান আছে? রঙিন ফানুস যতক্ষণ ফুলানো থাকে ততক্ষণ সেটিকে নাদুস-নুদুস ও সুন্দরই মনে হয়। কিন্তু ছোট একটি কাঠির খুঁচায় এই ফানুসটি মুহূর্তে চুপসে যায়। তাই ফানুসের সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। আমরা এরকম সৌন্দর্য দেখতে চাই না। আমরা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন দেখতে আগ্রহী।

