বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের সর্ববৃহৎ রাবারড্যামের (মিছাখালী রাবার ড্যাম) নির্মাণ কাজ শেষ হবার আগেইে একটি অংশ ধসে পড়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর ও দৈনিক সমকাল’এ সংক্রান্ত সংবাদ ছাপা হবার পর অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বিষয়টি কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে অবহিত করেন। কৃষিমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন। পরে মন্ত্রীর নির্দেশে এ বিষয়ে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। কমিটির প্রধান করা হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. আব্দুর রউফকে। এই কমিটিকে সরেজমিন তদন্ত করে ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত বিশ্বম্ভরপুরের মিছাখালী নদীর আশ-পাশের গ্রামসহ সুনামগঞ্জের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের মিছাখালী নদীতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ এই রাবার ড্যাম। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসির) উদ্যোগে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির উপর ৫৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে বোরো ফসল অকাল বন্যা ও পাহাড়ী ঢল থেকে রক্ষা করতে ৫ স্প্যান বিশিষ্ট ২২০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৪ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন দেশের বৃহৎ এই রাবারড্যামটির নির্মাণ কাজ করছে ঢাকার সেগুন বাগিচার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স কেবিআইএমএমকে। রাবার ড্যামের উপরে ৫ স্প্যান বিশিষ্ট ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে। গত ৩ রা মার্চ (বৃহস্পতিবার) বিকালে মিছাখালী রাবার ড্যামের নির্মাণাধিন ব্রিজের শেষ অংশের একটি স্প্যান হঠাৎ ধসে পরে।
নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী ও কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়ায় কাজ চলাকালীন সময়েই একটি অংশ ধসে পড়েছে বলে তাৎক্ষণিক দাবি করেছিলেনন স্থানীয়রা। ধসের ঘটনায় ৬ শ্রমিকও আহত হয়েছিলেন। এঘটনায় ঐ দিন রাবার ড্যাম এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল- সমাবেশও করেছিলেনন স্থানীয় বিক্ষুব্ধ লোকজন। মিছিল-সমাবেশে ঠিকাদারের শাস্তিও দাবি করা হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা ঐ দিন গণ-মাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার ( ৩রা মার্চ) সকাল থেকেই ব্রিজের ঢালাই চলছিল। ঢালাইয়ে কাজ করছিল নারী-পুরুষ মিলে ২৭ জন শ্রমিক। ঢালাই দেয়ার কয়েক ঘণ্টার পর বিকাল প্রায় সোয়া ৩ টায় হঠাৎ বিকট শব্দে ব্রিজের এক অংশ (একটি স্প্যান) ধসে পরে। এসময় ব্রিজের উপরে থাকা ৮-১০ জন শ্রমিক ঢালাইয়ের নিচে পড়ে ও বাঁশ-রডের আঘাতে আহত হয়।
দৈনিক সুনামগঞ্জের প্রধান সংবাদ ও দৈনিক সমকালের শেষ পৃষ্ঠায় (৪ মার্চ) ঐ সংবাদ ছাপা হলে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান ঐ দিনই বিষয়টি কৃষিমন্ত্রীকে জানান। কৃষিমন্ত্রী শুনে ক্ষুব্ধ হন এবং সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি করার নির্দেশ দেন।
শুক্রবার তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মো. আব্দুর রৌফ, কমিটির সদস্য বিএডিসি (ক্ষুদ্র সেচ) এর পরিচালক মো. সাইদুর রহমান সেলিম, আই এম ই ডি পরিচালক মো. আফজাল হোসেন, কৃষি মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব সুব্রত ভৌমিক, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, বিএডিসি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী ফারুক হোসেন মিছাখালী রাবার ড্যাম এলাকায় গিয়ে আশপাশের গ্রামের যারা লিখতে পারেন তাদের অনেকের কাছে ১৫ টি প্রশ্ন সংবলিত একটি ফরম পূরণ করে দেবার অনুরোধ জানান এবং যারা লিখতে পারেন না তাদেরকে মৌখিকভাবে প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করেন। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের নানা প্রশ্নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তদারককারী কর্তৃপক্ষ এই কাজটি নিয়মিত তদারকি করেছেন কী? তদারককারী কর্তৃপক্ষের গাফিলতি থাকলে সেগুলো কী?। এছাড়া নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রী সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের একজন জানিয়েছেন,‘তদন্তকালে স্থানীয়রা তাদেরকে জানিয়েছেন, রাবার ড্যামের উপর স্প্যান ঢালাইকালে বা ধসে পড়ার সময় তদারককারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কেউ ওখানে ছিলেন না। ঢালাই কাজে ব্যবহৃত পাথর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, ঢালাই করার সময় পাথর ধোয়া হয়নি, বালুতেও ময়লা ছিল। ঢালাইকাজে ব্যবহৃত মালামাল মিশ্রণের সময় নির্দেশনা মোতাবেক সিমেন্ট দেওয়া হয়নি। রাবার ড্যামের নিচের ব্লকের কাজেও ঠিকমত সিমেন্ট ব্যবহার হয়নি’।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মো. আব্দুর রউফ বলেন,‘ক্ষুদ্র-মাঝারী নদীতে দেশে ৩ টি রাবার ড্যাম স্থাপন প্রকল্পের কাজ করছে বিএডিসি, এর মধ্যে একটি মিছাখালী রাবার ড্যাম, এর একটি অংশ নির্মাণাধীন সময়ে ধসে যাওয়ার বিষয়টি অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানের কাছ থেকে শুনে এবং পত্রিকায় এ সংবাদ দেখে সংশ্লিষ্টদের উপর মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এ কারণে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে সরেজমিন এসে তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেবার জন্য বলা হয়েছে। তদন্তকালে আমরা মিছাখালী রাবারড্যাম এলাকায় গিয়ে সুবিধাভোগীদের হাতে ১৫ টি প্রশ্ন সংবলিত ফরম দিয়েছি, যারা লিখতে পারেন না, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে চেয়েছি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার তদন্ত প্রতিবেদন নির্দেশনা মোতাবেক জমা দেওয়া হবে’।


