মুক্তিযোদ্ধার প্রতিবাদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা

মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর কিশোর বয়সেই মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর এবং তাঁর মতো যুদ্ধগামী লাখো মুক্তিযোদ্ধার চোখে স্বপ্ন ছিলÑ একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণের। পাকিস্তানি শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে জ্বলন্ত বারুদের স্তূপ হয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন সেদিন, একটি বিকলাঙ্গ রাষ্ট্রের বিলোপ সাধন ঘটিয়ে বঞ্চনাহীন-সমতার নতুন এক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়দীপ্ত হয়ে। যুদ্ধে তিনি মরে যেতে পারতেন, যেমন শহীদ হয়েছেন ৩০ লাখ বাঙালি। বেঁচে মুক্ত স্বভূমে ফিরে এসেছেন, এটি তাঁর ভাগ্য। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধা ভেবেছিলেন, স্বাধীন দেশটি পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে একেবারেই ভিন্ন একটি দেশ হবে। যেখানে সকলে মিলে প্রত্যেকে বেঁচে থাকবে একে অপরের জন্য। গত বৃহস্পতিবার সকালে সেই মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীরকে দেখা গেল জেলা প্রশাসকের বারান্দায় বসে প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করতে। কিসের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদরূপ এই অবস্থান? না, ব্যক্তিগত কোন স্বার্থসিদ্ধির খোঁজ পাওয়া যায় নি এখানে। সকলের জন্য যেমন একাত্তরে অসম সাহসে যুদ্ধে গিয়েছিলেন তেমনি বৃহস্পতিবার আবারও সমাজের আরেক বৈষম্যকে ধারণ করে জেলা পর্যায়ের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের বারান্দায় তিনি বসে পড়লেন। এদিন তার প্রতিবাদের বিষয়বস্তু ছিল সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ক্লাশ না হওয়ার প্রসঙ্গ। কলেজের এই করুণ অবস্থাটি জেনেছেন তিনি ওই কলেজে অধ্যয়নরতা নিজ মেয়ের বয়ানে। মেয়েটি মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে বলেছিল, কলেজে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সারা বছরে একটি ক্লাসও হয় না। কলেজে ক্লাশ না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা প্রস্তুতি নেয়া হয়ে উঠে না, বিশেষ করে যারা প্রচুর টাকা খরচ করে প্রাইভেট টিউশনে যেতে পারছে না তাদের তো একেবারেই ডিম্ব পাওয়ার মতো বেরহম অবস্থা। আমরা অনেকেই মহাবিদ্যালয়-বিদ্যালয়ে ক্লাস না হওয়ার ঘটনার পূর্বাপর জানি বেশ ভালভাবেই। কেউ প্রতিবাদে উচ্চকিত হই না।  মালেক পীরের বিদ্রোহী মন। তিনি মনে করলেন, এর প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ। যেমন মনে করেছিলেন, একাত্তরে দেশ স্বাধীন করাটা পবিত্র কর্তব্য। ভাবনা মোতাবেক জেলা প্রশাসকের বারান্দায় বসে প্রতিবাদ জানালেন, জেলা প্রশাসককে কলেজে শিক্ষা দানের এই করুণ অবস্থা জানালেন, জেলা প্রশাসক তাঁকে আশ্বস্থ করলেন প্রতিবিধানের। এইভাবে মুক্তিযোদ্ধা মালেক পীর এই সময়ে দেশের একটি ভয়াবহ সমস্যাটিকে দিনের আলোয় সকলের চোখের সামনে নতুন করে নিয়ে আসলেন। তাঁকে টুপিখোলা কুর্নিশ।
প্রশ্ন জাগে, এই প্রতিবাদ কি আদৌ কোন সমাধানের পথ উন্মুক্ত করবে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতন গ্রহণকারী শিক্ষকদের ক্লাশ গ্রহণ না করা, বিপরীতে প্রাইভেট পড়িয়ে বেতনের অনেক গুণ বেশি অর্থ কামাই করার যে সংস্কৃতি জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের বুকে বসে আছে সেই পাথর কি সামান্যতম ঝাঁকুনি অনুভব করবে এতে? হয়তো, এটিই আপাতত বাস্তবতা, ওই পাথর নড়বে না এক মুক্তিযোদ্ধার প্রতিবাদে। কিন্তু মালেক পীর এর বেশি কিইবা করবেন? তিনি যেটুকু পেরেছেন করেছেন। বাকিটুকু সমাজের অপরাপর অংশের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দান না করার এই বাস্তবতাকে কেউ যদি দেশের একটি অন্যতম সমস্যা মনে করেন, তাদের দায়িত্ব এই প্রতিবাদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যদি জাগ্রত হয় সেই প্রতিবাদের চেতনা, তাহলেই স্বার্থকতা মালেক হুসেন পীরের।