মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়ার যুদ্ধ ও লাল মরিচের গল্প

আকরাম উদ্দিন
সদর উপজেলা সুরমা ইউনিয়নের বেরীগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া। বয়স ৬৫ বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। তখন অবিবাহিত যুবক। বর্তমানে চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে । প্রায় ১ বছর আগে ভৈষারপাড় এলাকায় সিএনজি ও অটোরিক্সার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া। হাতে, পিঠে ও কোমরে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ঢাকায় দীর্ঘ চিকিৎসায় প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে তাঁর। এখন তিনি সামান্য সুস্থতা বোধ করলেও পুরোপুরি চলাফেরা করতে পারেন না। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ১২ হাজার টাকা থেকে প্রতি মাসে ওষুধের খরচ হয় ২ হাজার ৬ শত টাকা করে। বাড়িতে হুইল চেয়ারে বসে চলেন চাঁন মিয়া। আশপাশে বের হলে অল্পক্ষণ স্ক্র্যাচে ভর করে চলেন তিনি। সঠিকভাবে চলাফেরা করতে না পারায় অন্যান্য রোগে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে শরীরে। মাঝে মধ্যে সহযোদ্ধাদের সাথে দেখা করতে অথবা বিশেষ দরকারে শহরে আসেন মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া। এই সময় তাঁকে ধরে রাখার জন্য সাথে থাকেন আরও দুইজন। শনিবার দুপুরে তাঁর বাড়িতে দেখতে গেলে করুণ স্বরে এসব সমস্যার কথা জানান বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া।
যুদ্ধে যাবার প্রেরণা :
বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া বলেন, দেশ স্বাধীনের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তখন আমার পরিবারে ৪ ভাই, ৪ বোন, বাবা ও মা ছিলেন। আমাদের বাড়ি ছিল মঙ্গলকাটা বাজারের পাশে ঢালারপাড় গ্রামে। এই ঢালারপাড়ের বাসিন্দা ওয়াহাদ মোড়ল নামের একজন শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। ওয়াহাদ মোড়ল প্রতিদিন বেরীগাঁও পাকহানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে এসে খবরা-খবর আদান প্রদান করতেন। এই এলাকায় বেরীগাঁও, কৃষ্ণতলা ও লালঘর ক্যাম্প ছিল এবং পার্বতীপুর ছিল হানাদার বাহিনীর ব্যাংকার। এছাড়া ষোলঘর (শ্রীমাতাল) এলাকায় ছিল হানাদার বাহিনীর আরেকটি ক্যাম্প।
এসব ক্যাম্পে শাক-সবজি, ফলমূল সহ সকল প্রকার খাবার সরবরাহ করতেন ওয়াহাদ মোড়ল। একদিন শাক সবজির সাথে লাল টুকটুকা পাকা নাগা মরিচও নিয়ে আসেন তিনি। হানাদার বাহিনীর সদস্য জিজ্ঞেস করে-এটা কি? ওয়াহাদ মোড়ল হাসি মুখে বলেন-এটা ঝাল ও সুঘ্রানী মরিচ। কিছুক্ষণ পর হানাদার বাহিনীর এক সদস্য দুইটি নাগা মরিচ একসাথে খেয়ে ফেলে। এতেই ঘটে লংকা কান্ড। এই ঘটনায় ওয়াহাদ মোড়লকে বেধড়ক মারপিট করে হানাদার বাহিনীর একাধিক সদস্য। এলাকায় এসে আমার মতো যুবক বেশ কয়েক জনকে ডেকে বলেন-বাঁচতে চাইলে ভারতে চলে যাও বাবারা। যেকোনো সময় আমাকেও মেরে ফেলবে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। ওয়াহাদ মোড়লের এমন কথায় আমরা আতংকিত হয়ে পড়ি। যুদ্ধে যাবার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নিই।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ :
বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া বলেন,‘ওয়াহাদ মোড়লের কথা শুনে যুদ্ধে যেতে আমি, মঙ্গলকাটা গ্রামের সুরুজ মিয়া, বজলু মিয়া, রাজু আহমদ সহ কয়েকজন নারায়নতলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যাই। সেখানে গেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাশিম আমাদেরকে বলে দেন তাড়াতাড়ি বালাটে চলে যান, ট্রেনিং বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মোজাহিদ ট্রেনিং আছে বলবেন। বালাট সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর সালাহ উদ্দিন। পরে ছিলেন মেজর মোতাল্লিব। এই সময় বালাটের ডালডা কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন গোলাম রব্বানী। বালাটে যাবার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে অস্ত্র ও গোলা বারুদ নিয়ে নারায়নতলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফিরে আসি আমরা। তখন নারায়নতলা কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন এনামুল হক। নারায়নতলা থেকে আমাদেরকে মঙ্গলকাটা, ঢালারপাড় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাঠানো হয়।
যুুদ্ধ শুরু :
বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া বলেন,‘মঙ্গলকাটা, ঢালারপাড় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে থেকে যুদ্ধ শুরু করি। এই এলাকায় প্রায় প্রতিদিন যুদ্ধ আতংকে কাটিয়েছি। আমাকে প্রায়ই নারায়নতলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের প্লাটুন কমান্ডার মো. আব্দুল হাশিম ও মালদার ভাই পরামর্শ ও সাহস দিতেন। আমার সহযোদ্ধা ছিলেন ইব্রাহীমপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সামছুল হক, শহরের হাছন বাহারের সামছুল হক, আমবাড়ির মদরিছ আলী মাস্টার, ছেরাগ আলী, গেদা মিয়া, রইছ উদ্দিন। ২ মাস থাকার পর আমাদেরকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দি বাজার এলাকায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠানো হয়। চিনাকান্দি থেকে এসে পলাশ চালবন্দ ও ভাদেরকেট এলাকায় যুদ্ধ করি আমরা। এ সময় রতারগাঁও স্কুলে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ও মথুরকান্দি এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে খাবার পাঠানো হয় আমাদের।
কয়েকটি ঘটনা :
১। বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া বলেন,‘মঙ্গলকাটায় যুদ্ধালীন সময়ে মীরেরচর এলাকায় আমাদের উপস্থিতির খবর পেয়ে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা আক্রমণ শুরু করে। এ সময় আমরা ক’জন দলাই নদীর উত্তরপাড়ে চলে যাই। কিন্তু দক্ষিণপাড়ে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করে এবং হত্যা করে। আমার চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটে।
২। বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া বলেন,‘তেরাপুর গ্রামের বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী ফাতেমাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলে এবং দেওয়ান আলীকে (৫০) গুলি করে মেরে ফেলে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। নলুয়া গ্রামে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। বর্তমানে এই স্থান গণকবর নামে সংরক্ষিত আছে।
৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া বলেন,‘মঙ্গলকাটা এলাকায় রাজাকার ও দালালের সহযোগিতায় বেশিরভাগ গ্রামের ঘর-বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। এসব আমি দেখেছি। এই এলাকায় এখনও চিহ্নিত রাজাকার ও দালালেরা জীবিত আছে।
কেমন বাংলাদেশ প্রত্যাশা :
বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়া বলেন,‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতায় মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা পাচ্ছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানাই এবং দীর্ঘায়ূর জন্য দোয়া করি। শিক্ষায় ও চাকুরিতে এবং চিকিৎসা সেবায় দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বৃদ্ধিসহ সকল নাগরিকের জন্য ভাতা চালু করতে হবে। সুন্দর ও সমৃদ্ধ রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই।