চলমান মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কার্যক্রমে বিভিন্ন উপজেলায় বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের এমনকি টাকা ফেরত দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় কমিটির জনৈক মুক্তিযোদ্ধা সদস্য তালিকায় নাম উঠিয়ে দেওয়ার কথা বলে কয়েকজনের নিকট থেকে টাকা গ্রহণ করেছেন। পরবর্তীতে তদন্তে তিনি টাকা গ্রহণের কথা স্বীকার করে ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জগন্নাথপুরে জনৈক রাজাকার তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। দোয়ারাবাজারে এক রাজাকার তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছেন। অবশ্য এবার যাচাই বাছাই কার্যক্রমে তিনি বা তার পরিবারের কেউ আর আসেন নি। ধর্মপাশায় যাচাই বাছাই কাজে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ। কমিটিতে যাদের রাখা হয়েছে তাদের কমিটির সদস্য হওয়ার কোন যোগ্যতা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। অনুমিত হয় যে, সংবাদপত্রের এই তথ্যের চাইতে বাস্তবক্ষেত্রে অনিয়ম দুর্নীতির মাত্রা আরও অনেক বেশি। দেশের স্বাধীনতার বেদীমূলে আত্মোৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির নামে এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি-হয়রানি একেবারেই অনভিপ্রেত যা মূলত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্মানের জায়গাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। সুতরাং মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দকে এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা নামধারী কেউ যাতে কোন অনৈতিক কর্মকা-ে লিপ্ত না হন এবং কোন অমুক্তিযোদ্ধা যাতে তালিকাভুক্ত না হতে পারেন সে বিষয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদেরই্।
স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকবার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। দুর্ভাগ্য স্বাদীনতা যুদ্ধের পর দীর্ঘ ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয় নি। প্রতিবারই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভূক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠে। প্রতিবারই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তালিকা করার কথা উঠে। প্রতিবারই তালিকায় বহু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম না থাকা ও অমুক্তিযোদ্ধার নাম উঠার অভিযোগ পাওয়া যায়। এই অবস্থা একটি স্বাধীন জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এটি অবমাননাকর বটে। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে কাগজপত্র দেখিয়ে তালিকাভুক্ত হবেন এমনটি বোধ করি যুদ্ধে যাওয়ার সময় কেউই চিন্তা করেন নি। স্বাধীনতার পর অনেকে নিজেদের নাম তালিকায় তুলতে আগ্রহী হন নি এই কারণে যে, তাঁরা কোন কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধে যান নি। আবার অনেক সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা কীভাবে নাম তালিকাভুক্ত করাতে হয় সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কেই ধারণা রাখতেন না। এরাও তালিকার বাইরে রয়েছেন। আবার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগে বহু অমুক্তিযোদ্ধা এমনকি রাজাকার-দালালরাও তালিকায় নাম উঠিয়ে রীতিমত মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন। এইসব বিভ্রান্তি নিরসন করে একটি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়ন করাই ছিল চলমান যাচাই বাছাই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। এখন আমরাই যদি এই কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করি অথবা অগ্রহণযোগ্য করি তাহলে প্রকৃত তালিকা করা সম্ভব হবে কোন কালে ?
উপজেলা পর্যায়ে যাচাই বাছাই করার জন্য একটি কমিটি আছে। এর বাইরে রয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। সর্বোপরি রয়েছেন জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ। আছেন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ। সকলের নিকট আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ, আপনারা সবাই মিলে এবার অন্তত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ শেষ করুন। এমন একটি তালিকা জাতিকে আপনারা উপহার দিন যাতে তালিকার কোন নাম নিয়ে কেউ কখনও প্রশ্ন তুলতে না পারেন। যারাই এই মহান দায়িত্ব পালনে স্খলন কিংবা অনৈতিকতার আশ্রয় গ্রহণ করেন তাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করুন কঠোর ব্যবস্থা। কারণ এই তালিকার যে কোন বিচ্যুতির জন্য ব্যর্থতার ঐতিহাসিক দায় বর্তাবে আপনাদের উপরই।

