ইকবাল কাগজী
সরকারী সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। গত শতকের প্রথমার্ধে, ১৯৪০ সালে, প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয়। আগের পাকা দেয়ালের উপর লাল টিনের দু’চালামতো ঘরগুলোর দক্ষিণে একদা ছিল বড়রাস্তা। এখন এই ঘরগুলোর ও রাস্তার ফারাকটুকুতে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বী, উত্তরমুখী দু’তলা দালান উঠেছে। উত্তরের প্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়ালে লাল টিনের ছাওয়া পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বে তোলা ঘরগুলোর সম্মুখে বেশ কীছুটা ফাঁকা উঠোন। সবুজ ঘাসে ছাওয়া এই উঠোনটি, যে-কোনও রুচিবান ও সৌন্দর্য পিপাসুর কাছে এই বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে মনে হতে পারে, আর মনে হতে পারেই বা কেন, আসলেই তো এই উঠোনটি এক অর্থে এই বিদ্যালয়ে পড়–য়া বালিকাদের মুক্তির ময়দান, এখানে তারা একটখানি মুক্তকচ্ছ হতে পারে খেলা কিংবা জটলা করে আড্ডা মারার ছলে, শরীরে মেখে নিতে পারে একটুখানি রোদের সোনারেণু, পাঠাভ্যাসের অবসরে। তা তো মিথ্যে নয়।
‘বালিকাদের মুক্তির ময়দান’-য়ের কথা বলছিলাম। আর একটি ‘মুক্তির ময়দান’ আছে এই বিদ্যায়তনের পূর্বপাশের দালানের দু’তলায়। সেটাকে ময়দান বলতে যদি কারও আপত্তি থাকে, তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে তিনি ময়দান যদি বলতে না চান তবে নিশ্চয়ই সেটাকে একটি অন্যরকম ভুবন বলতে বাধ্য হবেন, যে-ভুবনের বৈচিত্র্যের কোনও শেষ নেই, নেই কোনও সীমা কিংবা কোনও দিগন্তরেখা। তাই সে ভুবনে যে প্রবেশ করে সে পায় মুক্তির অসীম আস্বাদ, জীবন ও প্রকৃতিকে জানার সে-আনন্দের রঙবৈভিন্ন্যের তুলিতে আঁকা স্বাধীনতার কোনও তুলনা হয় না। একবার কবি আল্লামা ইকবাল যখন এই স্বাধীনতাকে ভোগ করছিলেন তখন ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে শিয়ালকোট তোলপাড় হলেও বইয়ের ভুবনে নিমগ্নচিত্ত কবিকে ভূমিকম্প স্পর্শ করার কোনও ক্ষমতা রাখেনি। মানুষকে নিমগ্নচিত্তের আনন্দময় ভুবনের বাসিন্দা করে তোলে যে-বই সে-বইয়ের ভুবনের নাম পাঠাগার, ইংরেজি ভাষা থেকে শব্দ ধার করে আমরা বলি লাইব্রেরি, যদিও তার কোনও প্রয়োজন নেই।
১৯ অক্টোবর ২০১৭, বৃহস্পতিবার। পূর্বাহ্ণে সরকারি সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠাগার দেখতে গেলাম। এই এক পলকের দেখা। একটি ঘর, বইভর্তি বেশকটা আলমিরা। এইভাবে দেখে নেওয়াকে পাঠাগার দেখা বলে কি না জানি না। তবে এমটাই তো হলো, ভীষণ দুর্ভাগ্য যে এমন না-দেখার মতো করেই দেখা হলো পাঠাগারটিকে। প্রকৃতপ্রস্তাবে একে দেখা বলে না। তারপরও বলি, ভাব হলো না বটে, তবু তো দেখা!
বেশ কীছুক্ষণ পাঠাগারে ছিলাম। পাঠাগারে থাকার সময়টুকুতে বিদ্যালয়ের পাঁচ পাঁচজন শিক্ষকÑ অসীমচন্দ্র বর্মণ, মো. নাসির উদ্দিন, মো. আবুল হাসান, মো. ওবায়দুল কিবরিয়া, সুভাসচন্দ্র দাসÑ আমাকে সঙ্গ দিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই কমবেশি আমার পূর্বপরিচিত, প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়। তাছাড়া তাঁরা প্রত্যেকেই আমার কন্যাদ্বয়ের সরাসরি শিক্ষক। তাঁদের সঙ্গে নাতিদীর্ঘ কিন্তু ভাঙাচুরা টুকরাটাকরা আলাপচারিতায় অনেক অজানাকে জানা গেলো।
দেশে সরকারি বিদ্যায়তনগুলোতে নাকি গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগদানের কোনও ব্যবস্থা এখনও কার্যকর নয়। সাধারণত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের মধ্য থেকে কোনও একজনকে পাঠাগার পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করেন। বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরুর আগে, মধ্যবিরতির সময় ও পাঠদান শেষে অর্থাৎ ছুটির পর, সময় করে গ্রন্থাগারিকরূপে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে বই বিলি করে থাকেন। এই ভাবেই চলছে, গ্রন্থাগারের কার্যক্রম। তাঁরা জানালেন, শিক্ষার্থীরা প্রায় প্রত্যেকেই জ্ঞানপিপাসু, বই পড়তে তারা ভীষণ উৎসুক। সে বিষয়ে কারও কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কাঁধে পাঠক্রমের যে-বিপুলবিশাল ও ভারি বোঝা চাপানো হয়েছে সে গুরুভারই বইতে পারছে না শিক্ষার্থীরা, পাঠক্রমের
বাইরের বই পাঠ করার তাদের অবকাশ কোথায়। সর্বসাকুল্যে বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, বছর বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিদ্যালয়ের পাঠাগারের বই কেনার টাকা আদায় করো, বর্তমানে বছরে বিশ টাকা করে আদায় করা হয়, বছর বছর কীছু বই কেনো, কীছুটা হলেও পাঠাগারের বহর বাড়াও। এই পর্যন্তই, এর বেশি কীছু নয়। কেউ সে বই পড়ল কি না পড়ল তাতে কারও কীছু যায় আসে না। সকল কার্যক্রম আর সকল কীছু মিলেমিশে জ্ঞানবিস্তারের যে-অভিপ্রায়ে বিদ্যালয়ে পাঠাগার রাখা হয়েছে সেই মহৎ অভিপ্রায়টিই ক্রমাগত মাঠে মারা যাচ্ছে। পাঠক্রমের বৃত্তে নির্দিষ্ট করা জ্ঞানের বাইরে জ্ঞানের বৃহৎ জগতের দ্বার খেলে দিতে চাইলে পাঠক্রমের গুরুভারটিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা চাই যাতে পাঠাগারের বই পড়ার অনুকূল পাঠক্রম চালু হতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যোদ্ধা বিজয়ীরা অধিকৃত দেশের পাঠারগার পুড়াতে বড় বেশি পছন্দ করেছেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বাঙলা জয়ের আগে পথিমধ্যে কোনও কোনও স্থানে পূর্ণপাঠাগার পুড়িয়ে তো দিয়েছেনই, এমকি বইয়ের সঙ্গে গ্রন্থাগারিক ভিক্ষুদেরও পুড়িয়ে এসছিলেন বলে কথিত আছে। সে-সব গ্রন্থাগার ছিল জ্ঞানী সব মানুষের হাজার কয়েক বছরের জ্ঞানসাধনার অর্জন, যে-গুলো মানবকল্যাণে আর আলোকিত বিশ্ব নির্মাণের কাজে অবদান রাখতে পারতো। আর এদিক থেকে বখতিয়ার ছিলেন চেঙ্গিস খাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি। বাংলাদেশের বিদ্যালয় পাঠাগারগুলোকে পুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয় বটে, তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে, সেগুলোকে শিক্ষার্থীদের জন্যে ব্যবহারের বাইরে রেখে দেবার ব্যবস্থা ঠিকই করে রাখা হয়েছে। আগেকার বখতিয়ারগণ বই পুড়িয়ে দিতেন আর এখনকার বখতিয়ারগণ বইকে পাঠাগারবন্দি করেন, বই পাঠ করার অবসর দেন না পাঠকদের, তফাৎ এইটুকুই। তফাৎ যা-ই থাক, প্রকৃতপ্রস্তাবে কার্যকারিতা একই, সেই একই অভিপ্রায়ের বিস্তার, সাধারণ মানুষকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে রাখার চক্কর। অর্থাৎ মানুষকে শিক্ষিত করে তোলো না, শোষণ করার বাইরে চলে যাবে। বেশি বেশি বই পড়–য়াকে এখনকার বখতিয়ারগণ বইপোকা নাম দিয়েছেন, তারা ভীষণ ভীষণ বইপোকাবিরোধীই কেবল নন, বইপোকাবিদ্বেষীও।
সরকারি সতীশচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের পাঠাগারটি সম্ভবত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাল থেকেই বিদ্যমান ছিল। সেজন্য এটিতে যথেষ্ট সংখ্যক পুরনো বই আছে। শিক্ষকরা বললেন, পাঠাগারের বই সংখ্যা সাত হাজারের মতো।
তারপর কী আর করা! ‘নটে গাছটি মুড়ালো আমার গল্প ফুরালো’র আগে অবশ্যই আশা করবো, এই পাঠাগারটি আমাদের কচি কচি মেয়েদের মুক্তির ময়দান হয়ে উঠবে।


