মুনাফার আশায় ট্রলার বদলই দুর্ঘটনার কারণ

এনামুল হক, ধর্মপাশা
বেশি মুনাফার আশায় নির্ধারিত ট্রলার বদল করে একটি ফিটনেসবিহীন ট্রলারে যাত্রী পরিবহণ করার ফলে নেত্রকোনার কমলাকান্দা উপজেলার গুমাই নদীতে দূর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী। নির্ধারিত ট্রলারটি যাত্রী পরিবহণ না করে চলে গিয়েছিল বিয়ের ভাড়ায়। আর এ সুযোগ নিয়েছে একটি ফিটনেসবিহীন ট্রলারের লোকজন। ফলে বৃহস্পতিবার মধ্যনগর থেকে ঠাকুরাকোনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী ট্রলারের সাথে একটি বাল্কহেড নৌকার মুখোমুখী সংঘর্ষে ১০ জনের প্রাণহানী হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অনেকেই। তাই বাড়তে পারে মৃত্যের সংখ্যা। এদিকে নিখোঁজদের সন্ধ্যানে বৃহস্পতিবারও উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে দমকল বাহিনীর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনের পৃথক দুটি ডুবুরি দল। তবে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত নিখোঁজ কারও সন্ধ্যান মিলেনি। নিহতদের মধ্যে মধ্যনগর ইউনিয়নের ইনাতনগর গ্রামের ৭জন, পাইকুরাটি ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের ২জন ও নেত্রকোনার মেদনী গ্রামের বাসিন্দা।
জানা যায়, মধ্যগনগর বাজার ঘাট থেকে আশপাশের গ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায় ট্রলার চলাচল করে। বুধবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটে মধ্যনগর বাজার ঘাট থেকে মধ্যনগর ইউনিয়নের কামাউড়া গ্রামের অলি উল্লাহ ও হালিম উদ্দিন নামের দুই ভাইয়ের মালিকানাধীন একটি ট্রলার যাত্রী নিয়ে ঠাকুরাকোনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। তাদের এ ট্রলারটিসহ আরও একটি ট্রলার এই রোটে চলাচল করে। বুধবার অলি উল্লাহ ও হালিম উদ্দিনের ট্রলারটি ১৮ হাজার টাকায় সুনামগঞ্জের জালামগঞ্জ উপজেলার মাতারগাও গ্রামে একটি বিয়েতে ভাড়া হয়ে যায়। আর এ সুযোগ গ্রহণ করে কলামাকান্দা উপজেলার চেমটি গ্রামের ফরহাদ মিয়ার ট্রলার চালক তার ছোট ভাই সোহাগ মিয়া। সোহাগ মিয়া হালিম উদ্দিনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাদের (হালিম উদ্দিন) পরিবর্তে ঠাকুরাকোনায় যাত্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি নেয়। তবে ঘটনার পর থেকে চালক সোহাগ মিয়া পলাতক থাকায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। ফরহাদ মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ হয়নি।
এদিকে হালিম উদ্দিন তাদের পরিবর্তে সোহাগ মিয়া যাত্রী নিয়ে ঠাকুরাকোনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করে বলেন, ‘প্রায়ই বিয়ের ভাড়া পাওয়া গেলে সিরিয়াল খালি থাকে। তাই অন্যরা টিপ (ভাড়া) নিয়ে ঠাকুরাকোনা যায়। বুধবার বিয়ের ভাড়া থাকায় সোহাগ ঠাকুরাকোনা যাত্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে মোবাইল ফোনে বললে আমি তাকে যেতে বলি।’
ইনাতনগর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুল আলম মঞ্জু বলেন, ‘কাঠের তৈরি ট্রলারটির পরিবর্তে প্লেনশীট দিয়ে তৈরি ট্রলারে করে যাত্রী পরিবহণ করায় এ দূর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করি। যদি সিরিয়ালের ট্রলারটি অতি মুনাফার আশায় অন্যত্র ভাড়া না যেতো তাহলে এ দূর্ঘটনা ঘটতো না।
মধ্যনগর ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, ‘অদক্ষ চালক আর লোহার তৈরি নৌকার কারণে সহজেই ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলারে নিরাপত্তামূলক কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণহানী ঘটেছে। প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রলারে লাইফ জেকেট রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত।’
বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে উদ্ধার কার্যক্রমে থাকা কলমাকান্দা উপজেলা সহকারী কশিনার (ভূমি) অমিত রায় বিকেল সাড়ে তিনটায় বলেন, ‘ইনাতনগর গ্রামের যে দুজন নিখোঁজ রয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে তাদের সন্ধ্যান পাওয়া যায়নি।’
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, ‘নিখোঁজ কারও সন্ধ্যান পাওয়া যায়নি। তবে উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে।’
বেশি মুনাফার আশায় সিরিয়ালে (ক্রমিক) থাকা ট্রলারটি কেন যায়নি সে ব্যাপারে খতিয়ে দেখছেন বলে জানান মধ্যনগর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) আবু তালেব বলেন, ‘সিরিয়ালে থাকা ট্রলারটি ছেড়ে না যাওয়ার বিষয়টি জানি। তবে কেন যায়নি সে ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার জন্য মধ্যনগর থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ বলেন, ‘নৌযানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় অতীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে।’ এছাড়াও তিনি নৌযানে যাত্রীর আনুপাতিক হারে লাইফ জেকেটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।
সমকালের কমলাকান্দা সংবাদদাতা শেখ শামীম জানান, এ ঘটনায় নিহত ইনাতনগর গ্রামের লুৎফুরন্নাহারের স্বামী বাসিন্দা আব্দুল ওয়াহাব বাদি হয়ে বাল্কহেড নৌকা ও যাত্রীবাহী ট্রলারের চালকসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার কলামাকান্দা একটি থানায় মামলা করেছেন। বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাল্কহেড নৌকার চালকসহ আটক ৫ জনকে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে নেত্রকোনা আদালতে প্রেরণ করেছে কমলাকান্দা থানা পুলিশ। এদিকে যাত্রীবাহী ট্রলার চালক সোহাগ মিয়া ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে। বাল্কহেড নৌকায় থাকা আটক ৫ জন হলেন, চালক সোহাগ মিয়া (৩৫), আবাদুল (২২), জাফর আলী (৩২), বাপন মিয়া (১৯) ও বাদল মিয়া (৪৫)। তারা সবাই কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার পাটুলি এলাকার বাসিন্দা।
কলমাকান্দা থানার ওসি মাজহারুল করিম বলেন, ‘মামলা দায়েরের পর আটক ৫ জনকে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং ট্রলারে চালক পলাত সোহাগ মিয়াকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক কাজী মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’