মৃত সন্তানকে জিম্মি করে টাকা আদায় অমানবিক চিকিৎসা বাণিজ্য বন্ধ হোক

চিকিৎসা সেবাকে মানবিক বৃত্তি বলা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে ডাক্তাররা সংবেদনশীল হৃদয়ের অধিকারী। বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষা করেন একজন চিকিৎসক। মানুষের জীবন রক্ষার চাইতে মহৎ কাজ আর কিছু হতে পারে না। এরকম পেশায় থেকেও কিছু ব্যক্তির কারণে মহান এই পেশাটি আজ কলকিংত হচ্ছে। সুদখোর, ঘুষখোরের মতো সম্প্রতি চিকিৎসা ব্যসায়ীদেরও চশমখোর হতে দেখা যায়। এরা টাকার জন্য অসুস্থ মানুষকে জিম্মি করে রাখতে এমন কি বিপন্ন মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলা করতেও দুইবার চিন্তা করে না। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদে সিলেটের আল রাইযান নামক একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক নবজাতক শিশুর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে অমানবিক বাণিজ্যপ্রবণতার চিত্র ফুটে উঠেছে। জানা যায়, সুনামগঞ্জ শহরের আলীপাড়ার বাসিন্দা সাব্বির হোসেন চৌধুরী ও শেফালী বেগম দম্পতির নবজাত শিশু সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সাথে সাথে কিছু জটিলতার আক্রান্ত হওয়ায় তারা শিশুটিকে সিলেটের আল রাইযান হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির সুস্থতার জন্য কী চিকিৎসা করিয়েছেন তার কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও একদিনের ব্যবধানেই শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪০ হাজার ২০৬ টাকার একখানি বিল ধরিয়ে দেয় সন্তানহারানোর দুঃখে পাগলপারা বাবা-মার হাতে। টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মাছুম শিশুটির লাশ আটকে রাখে। এক পর্যায়ে টাকা পরিশোধ করে সন্তানের লাশ গ্রহণ করেন বাবা-মা। বিলের পরিমাণ ও চিকিৎসা বিবরণ দেখে শিশুর বাবা সাব্বির আহমদ কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সদুত্তর পাননি। পুরো প্রক্রিয়াটি অবলোকন করে সাব্বিরের এক বন্ধু মন্তব্য করেছেন, ‘ঘটনাটি আসলে মৃত্যুপথযাত্রী নবজাতকের চিকিৎসার নামে টাইম পাস করে টাকা কামানো। অনেকটা ভারতীয় সিনেমা গাব্বার ইন ব্যাক-এর কাহিনির মতো’।
বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে টাকা খরচ করতে হবে কিংবা রোগী মারাও যেতে পারে, এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন কোনরূপ চিকিৎসা সেবা না দিয়েই বা নামমাত্র সেবা দিয়ে অথবা চিকিৎসার নামে কালক্ষেপণ করে বিল রেজিস্টারে নানা খাতে ব্যয় ধরে মোটা অংক আদায় করার অমানবিক প্রচেষ্টা চালানো হয় তখন সেটি হয় খুবই দুঃখজনক, অনাকাক্সিক্ষত এবং নিন্দনীয়। আল রাইযান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে অমানবিক আচরণের যে দৃষ্টান্ত রাখলেন তা চিকিৎসাসেবা নামক মহৎ বৃত্তিটিকেই কলুষিত করল। মৃত শিশু সন্তানের বাবার অভিযোগ খতিয়ে দেখে স্বাস্থ্য প্রশাসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা আশু প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
ইদানিং কিছু বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ন্যুনতম চিকিৎসাসেবা দেয়ার সক্ষমতা না থাকলেও নানা উপায়ে রোগী সংগ্রহ করে চিকিৎসার নামে বাণিজ্য করছে বলে প্রায়শই অভিযোগ শোনা যায়। বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা মায়েদের এরা সহজ টার্গেটে পরিণত করে। অপরাশেনের প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বেশিরভাগ মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশনের পরামর্শ দেয়া হয় বলে অনেকেই বলেন। সিজারিয়ান অপারেশনের সময় অবহেলাজনিত দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে। চিকিৎসাসেবায় এমন নৈরাজ্যকর অবস্থা কখনও কাম্য নয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো ব্যাঙের ছাতার মতো এখানে ওখানে গজিয়ে উঠা এইসব বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোতে সরকারি তদারকি ও নজরদারির পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
অনেক হৃদয়বান মানবিক গুণসম্পন্ন চিকিৎসকের কথা আমরা জানি। অভিজ্ঞতায় বলা চলে, এমন মানবিক চিকিৎসকের সংখ্যাই সমাজে বেশি। সামান্য কিছু সংখ্যক ব্যক্তি বা চিকিৎস্-াবেনিয়াদের কারণে এই পেশাটি যাতে সাধারণ মানুষের অশ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত না হয় সেজন্য চিকিৎসক সংগঠনগুলোরও চিন্তা ভাবনা করা উচিৎ।