মেধাবী মুখ- সউদ ফারহান চৌধুরী দীপ

বিন্দু তালুকদার
যারা কম্পিউটার ব্যবহার করেন তাদের সকলেই কম্পিউটারের মস্তিস্ক বলে বিবেচিত সিপিইউ বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বস্তুটির সাথে পরিচিত। মূলত এই সিপিইউ’র মাধ্যমেই কম্পিউটার যন্ত্রটি যাবতীয় সফটওয়্যারকে কার্যকর করে। সিপিইউ নির্মাণের জন্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সারা বিশ্বে এক নামে ইন্টেলের নামই সকলে জানেন। কারণ ইন্টেলের বানানো সিপিইউ ব্যবহারকারীর সংখ্যাই বিশ্বে সর্বাধিক। বলা যায় ইন্টেল এই জায়গায় অনেকটা মনোপলি ব্যবসা করছে। ইন্টেল একটি আমেরিকান কোম্পানি। এরিজনা রাজ্যে ইন্টেলের রিসার্চের মূল অফিস। ইন্টেলের বিভিন্ন স্থাপনায় কাজ করেন প্রায় ১ লাখ ২ হাজার কম্পিউটার প্রকৌশলী। এরিজোনার রিসার্চ সেন্টারে কর্মরত প্রকৌশলীর সংখ্যা ১০ হাজার। এই ১০ হাজার প্রকৌশলীর মধ্যে বাংলাদেশি প্রকৌশলী রয়েছেন ৭০ জন। বাংলাদেশি ৭০ জনের একজন হলেন আমাদের সুনামগঞ্জের সউদ ফারহান চৌধুরী, ডাক নাম যার দীপ। শহরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর সন্তান। কুমিল্লা ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে ২০০৩ সনে এসএসসি পাস করার পর দীপ ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে ২০০৫ সনে এইচএসসি পাস করেন। এরপর বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর বিএসসি শেষ করেন ২০১১ সনে। বিএসসিতে তাঁর ফলাফল ছিল বেশ ভাল। একই বিষয়ে ১৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে দীপ ১৭তম স্থান অর্জন করে মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। বিএসসি পাস করার পর রেনিসোর্স টেকনোলজিস লি: নামের একটি কম্পিউটার সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন কিছু দিন। ২০১২ সনে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, আমেরিকা তাঁকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর পিএইচডি করার জন্য বৃত্তি দেয়। দীপ এই বৃত্তির আওতায় ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাট -এ ভর্তি হন ২০১২ সনে। ২০১৬ সনে তাঁর পিএইচডি শেষ হয় অসাধারণ ফলাফল করার মধ্য দিয়ে। ৪.০০ গ্রেড পয়েন্টের বিপরীতে তাঁর প্রাপ্ত পয়েন্ট ছিলো ৩.৯৬। পিএইচডি করাকালীনই ইন্টেলে ইন্টার্নশীপ করেন তিনি। তাঁর মেধা ও অসাধারণ ফলাফল দেখে ইন্টাল তাঁকে চাকুরির অফার করে। দীপ তাতে সাড়া দেন এবং ২৮ মার্চ ২০১৬ তারিখে ইন্টেলের চাকুরিতে যোগদান করেন।
সংক্ষেপে এই হলো আমাদের মেধাবী ছেলে দীপের এগিয়ে চলার কাহিনী। এই কাহিনী শুরু কেবল। এর শেষ কোথায় আমরা জানি না। তবে এটুকো আমরা জানি দীপ অনেক দূর যাবেন, নিজের সাথে বাংলাদেশ তথা আমাদের হাওরের মাঝে শাপলা ফুলের মতো ফুটে থাকা সুনামগঞ্জকেও বিশ্ব দরবারে আরও পরিচিত করে তোলবেন। তাঁর কথা থেকেও সেই আঁচ পাওয়া যায়। মাত্র দেড়সপ্তাহের ছুটিতে তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশে জুলাই মাসে। সুনামগঞ্জেও ছিলেন কয়েকদিন। এর মাঝেই ২০ জুলাই সন্ধ্যায় তিনি এসেছিলেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর কার্যালয়ে। এসময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে কথা হয়। তখনই তিনি বলছিলেন তাঁর ভবিষ্যৎ ইচ্ছার কথা। তিনি ইন্টেলে যে বিষয়ে রিসার্চ করছেন সেটি হলো সিপিইউ ডিভাইসের জীবন বাড়ানো নিয়ে। তিনি বলছিলেন, মানুষ প্রযুক্তিকে ক্রমশ হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে চায়। যে কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন ডিভাইসের আকার ছোট হচ্ছে। পাওয়ার ব্যবহারের বিষয়টিকেও রিসার্চে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কম পাওয়ারে কী উপায়ে বেশি সময় ডিভাইস ব্যবহার করা যায় সেটিও গবেষণার আরেকটি দিক। ইন্টেলে আমরা এ নিয়েই কাজ করছি। 20160720_220528
বাংলাদেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়েও তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম। বলেছিলাম, দেশের সব মেধাবীরা যদি বিদেশে থেকে যায় তাহলে এই দেশটি এগোবে কী করে? দীপের সাবলীল উত্তরÑ আমাদের পূর্বপুরুষরা এই দেশটি স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। সুতরাং বাংলাদেশ নিয়ে আমার স্বপ্ন আকাশের সমান উঁচু। এখন তো সবেমাত্র কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলাম। অভিজ্ঞতা হয়ে গেলে ফিরেই আসব দেশে। বাংলাদেশে কম্পিউটার নির্ভর অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনা। আপাতত যন্ত্র তৈরি নয় বরং বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে সফটওয়্যার তৈরি ও আউটসোর্সিংএর উপর গুরুত্ব দিয়ে। আমি সুযোগ পেলে বিদেশি কোন প্রখ্যাত কোম্পানির সহায়তায় দেশে তাঁদের স্টার্টআপ কোম্পানি গড়ে তোলতে চাই।
মুক্তিযোদ্ধা পিতার সন্তান হিসাবে কেমন অনুভূতি জানতে চাইলে দীপ কিছুটা আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের কথা জেনেছি বাবার মুখে। তাঁর সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়েছি। আমি আমার পিএইচডির অভিসন্ধর্ব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে উৎসর্গ করেছি। উনিশ শ একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির বর্বরতার কাহিনী শোনে পাকিস্তানিদের প্রতি আমার মনে এক ধরনের ঘৃণা তৈরি হয়েছে। আমেরিকায় আমি কোন পাকিস্তানির সাথে কথা বলি না। আমেরিকার যেখানেই কথা বলার সুযোগ পাই সেখানেই আমি নিজের বক্তৃতা শুরু করি ‘আই এ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ’ বলে। অপার সম্ভাবনার এই দেশটি একটা সময়ে ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে উন্নীত হবে।
দীপের সাথে কথা বলার সময়ই একবার বিদ্যুৎ চলে যায়। কৌতুহলবশত তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। আমেরিকায় আপনার চার বছরের অবস্থানকালে এরকম বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখেছেন কখনও? দীপ বললেন, ‘আমি যে শহরে থাকি সেই কানেক্টিকাট শহরে বছর চারেক আগে ঘুর্ণিঝড় স্যান্ডি আঘাত হেনেছিলো। এইসময়ে মাত্রা দুই ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ ছিল না। এর বাইরে চার বছরে কোন বিদ্যুৎবিভ্রাট হতে দেখিনি আমি।’ আসলে উন্নত আর উন্নয়নশীল দেশের ব্যবধান এইটিই। আমাদের নিত্যসঙ্গী বিদ্যুৎবিভ্রাট আর লোডসেডিং তখনই বিদায় নিবে যখন আমরা সত্যিকার অর্থে উন্নত দেশে পরিণত হব। এসময় তাঁকে আবারও জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা আমরা যেমন ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছি, তাতে আমাদের জীবন ধারণের সবকিছুই যন্ত্রের হাতে চলে যাচ্ছে। কখনও যদি প্রযুক্তি কলাপস্ করে তখন মানবসভ্যতার কী হবে? দীপ প্রত্যয়দীপ্ত ভাবে বললেন, ‘না এমনটি হবে না। প্রযুক্তি কিংবা যন্ত্র যাই বলুন, প্রতিটির পিছনেই রয়েছে মানুষের মস্তিস্ক ও হাত। প্রযুক্তি যাতে কলাপস্ না করে সেজন্য বহুস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আবিস্কৃতি হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটছে প্রতিদিনই। মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দময় করে তুলতেই যন্ত্র ও প্রযুক্তিসভ্যতার যাত্রা শুরু করেছে। সুতরাং মানুষই এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে এবং রক্ষা করে চলবে।’
দীপের মনে আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম আর স্বজাত্যবোধের যে পরিচয় পাওয়া গেছে, আমাদের সব মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যেই অনুরূপ দেশপ্রেম রয়েছে। এই দেশপ্রেমের জোরেই নতুন প্রজন্মের মেধাবী দীপরা বাংলাদেশকে স্বপ্নের ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে নিয়ে যাবে, এই বিশ্বাস আমাদের। দীপ শব্দের মধ্যে আলোকিত করার বিষয়টি নিহিত রয়েছে। এই আলো বাংলাদেশকে আলোকিত করবে। এমন বিশ্বাস ধারণ করেই সউদ ফারহান চৌধুরী দীপের সাথে আলাপ শেষ করলাম। তাঁর ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হোক।