মেরুন পরি

নাসরীন জাহান
যখন হুঁশ ফেরে নিজেকে সে আবিষ্কার করে একটি খড়কুটোর ওপর। জটাকালী রূপধারী আসমানটার শাদা দাঁত একটু একটু করে যতই বিকশিত হয়, ততই মনে হতে থাকে সে মৃত্যুর পরে কোনো অজানা জগতে চলে এসেছে…ক্রমশ ধাতস্ত হতে হতে সে অনুভব করে শাদা আসমানটা ফের আঁচল গুটাতে শুরু করেছে, সূর্য শেষবারের মতো ভূম-লে তরমুজের ভেতরকার রঙের লাল রক্ত চারপাশটায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেন জীবনের জন্য শেষ বিদায় নিচ্ছে।
ফের নিকষ কালো আঁধার চতুর্দিক গ্রাস করতে থাকলে অজানা ভয়ে আকুল হয়ে কিছু-একটা খামচে ধরতে চায় রইসউদ্দিন। কাঠের পাটাতনে নখ ঠেকে। খড়কুটো নয়, সে যেনবা মহাসমুদ্রের ওপর একটি বৈঠাহীন নৌকার ওপর ঘাই খাচ্ছে।
প্রভাতের পাহাড়ি ঢলটার কথা মনে পড়তেই ভয়ে মনটা শুকিয়ে আসে, বেঁচে আছে সে ? আর বাকিরা ? ধীরে ধীরে ঘাড় তোলে, আবছা করে দেখা যায় রাক্ষুসে স্রোতের হাওরটা তা-ব থামিয়ে ঘুমাচ্ছে। ফের অবসাদ আর ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়ে সে।
সার সার গাঢ় সবুজ কলাবাগান। ঠা ঠা দুপুরে একাকী নিমগ্ন হাঁটছিল সে। আচমকা হাসির কুচকাওয়াজে চমক ভাঙে। গাঢ় লাল ডুরে শাড়ি পরা দু’বেণীর কিশোরীকে দেখে ভেতরটায় এমন কম্পন ওঠে তার আশপাশে যে আর কেউ আছে চোখেই পড়ে না। কলাপাতা, লাল শাড়ি যেন পতপত পতাকা, যেন ভরদুপুরে আসমান ভেঙে নেমে আসা পরি। কী ভাগ্য রইসের। কী ভাগ্য, মাস ঘুরতেই সেই দুলর্ভ দুর্দান্ত স্বপ্ন, যে তার দিন রাতের খাদ্য ঘুম ছিনতাই করেছিল, তাকে পেয়ে গেল স্ত্রী রূপে। বাসররাতে যতই তাকে ঘোমটা খুলে চোখ মিটিয়ে দেখার খায়েস করেÑপুষ্প ও পুষ্প তুমি কি খুশি ?
ততই বালিকা ভয়ে থরথর কাঁপে। মেয়েটিকে মন ভরে দেখার তৃষ্ণায় হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভব করার আকাঙক্ষাÑসত্যিই এ আমার বউ! যতই এগোয় ততই মেয়েটির ভীতকম্পন, সৌন্দর্যের ঐশ্বর্য তার কাম নিভিয়ে দেয়।
বালিকা তা বোঝে না। এক রাক্ষুসে হামলার ভয়ে বিড়বিড় করতে থাকে, বাবা শয্যাশায়ী, মা পরের বাড়ি কাম করে, অভাবে, খিদায়…।
পুষ্প থামো থামো…মেয়েটি তার স্বপ্নের মধ্যে তেতোজল ফেলতে থাকলে নিজের অজান্তেই ধমকে ওঠে রইস। তার নিজেরও তো ছ্যাতলা পড়া বেড়ার ঘর। এক ফালি জমির ওপর পুরো পরিবারের বাঁচন-মরণ। এই পরি আসার পর কই তার ঘরের কোনো দৈন্য তার চোখে পড়ছে না ?
ধমক খেয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে অজান্তেই রইসের হাতের চাপে অজ্ঞান হয়ে পড়ে বালিকা।
স্ত্রীকে ঘুম থেকে উঠিয়ে রাতভর পরম আস্থায় তাকে প্রগাঢ় মমতা দিয়ে তার ভয় কাটিয়ে ঘুমাতে দিয়েছিল রইস। নিজে রাতভর বেদিশার মতো জেগেছিল।
এরপর কত দিন কত রাত কত বছর… ?
সন্ধ্যা তো নয় যেনবা জটাবুড়ি অমাবস্যা মহাপৃথিবীতে চুল বিছিয়েছে। নিজের অস্তিত্বকে জাগতিক পৃথিবীতে জীবিতবোধ  করার পর মৃত্যুভয় অবশ-অসাড়তা সব সরে দেহ কাঁপতে থাকে ক্ষুধা আর বুভুক্ষু তৃষ্ণায়। নিজেকে কষে টেনে সে আঁধারের মধ্যে ধীরে ধীরে নিজেকে তুলে এলোপাতাড়ি হাত চালাতে থাকে।
জলের নাগাল মেলে। কম্পিত রইস নিজ দেহের শেষ শক্তি দিয়ে উবু হয়ে খাবলা দিয়ে হাওর আন্ধারের জল তুলে তুলে জিভ ভেজাতে থাকে।
দেহে একটু শক্তি এসে ক্রমশ বাঁচার সাধ জাগতে থাকে স্ত্রীর ছেনালি ভঙ্গির হিহি হাসি তার শরীরে কী এক হিংস্র বোধের জন্ম দেয় রইস নিজেও জানে না, সে ওপরের দিকে মুখ করে অস্ফুট চিৎকার করে, হে আল্লাহ! বাঁচাইয়াই যদি রাখছ, কূলের দিশা দেও ?
চোখের কোণ দিয়ে নোনাজল ঝরে।
বিয়ের ক’দিন পর তার মমতায় আদরে সহজ হয়ে আসা মেয়েটি তার ছিন্নমূল অঙ্গন হাসিতে মুখরিত করে রাখত। অবাক তাজ্জবে প্রশ্ন করত, আমি দেখতে কালা…আমার গেরামে ছোটবেলা থাইক্যা কত হুনছি যে এই কালা মাইয়ারে বিয়া করবো ক্যাডা ? খালার বাড়িতে বেড়াইতে আইয়া আপনার আজিব চোখ দেইখ্যা এমুন ডরাইছিলাম! আপনার চক্ষু কী দিয়া বানানি যে আমার মতো ভূতনীর মইধ্যে আপনে আসমানের পরিরে দেহেন ?
বলে কী মেয়ে ? দাদির শৈশবের সমস্ত গল্পেই তো উড়ানিয়া পরির গায়ের রঙ ছিল শ্যামলা, ডাগর চক্ষু, সাপের মতো দু’বেণী লটকে লটকে সে লাল ঘাঘড়া আর সবুজ ডানা পরে সবুজ অরণ্যে উড়ে বেড়াত। কলাবনের পাশে সে তেমনই এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে হতবিহ্বল হয়েছিল!
কী ? তুমি কালা ? ভূতনী ? তুমার গেরামে এই কতা কইতো ? রইসের গলায় পানি আটকে যায়।
কালা-ই তো…এই দেখেন…দেখেন আমার শইল্যের রঙ ? আমরার গেরামে বেবাক মাইয়াই দেখতে অনেক ধলা। পরানে পরম স্বস্তির আরাম হয়েছিল রইসের। নিজের চেয়ে আধাবয়সী যে মেয়েটিকে বিয়ে করে সারাক্ষণ তার বুক ধড়ফড় করত, অসুন্দর, বয়সী স্বামীকে নিজের চাইতে হাজার গুণ দীন ভেবে দৈন্যে পড়ে বিয়ে করা মেয়েটি কবে না নিজ সৌন্দর্য নিয়ে কোনো সুন্দর যুবকের সঙ্গে উড়াল দেয়! নিজের রূপ সম্পর্কে এই ধারণায় রইসের  সব জড়তা আর ভেদ দূর হয়ে যায়, বাঁধভাঙা কাম টানে মেয়েটাকে বুকে টানতে গিয়েই বাঁধে বিপত্তি, কেমন ভীত আড়ষ্টতায় কাঁপতে কাঁপতে নিজেকে সরাতে থাকে সে। একসময় রইসের বিমর্ষ-বিষণœ মুখ দেখে বুদ্ধিমতী বালিকা যেনবা নিজেকে কষে বেঁধে বিন্যস্ত করে রইসের খপ্পরে নিজেকে উজাড় করে ছেড়ে দেয়।
মেয়েটি খাদ্যযন্ত্রণায় ভুগেছে প্রচুর। কচু সেদ্ধ, গমের জাউ খেয়ে খেয়ে জিহ্বায় পেটে রীতিমতো ওটকানো ঘা জমেছিল। ফলে ওই জীর্ণ কুটিরেই দুটি গরম ভাত আর মাছের ঝোলে যেন সে অমৃতের স্বাদ পেয়েছিল।
রইসও নিজের জীবনের নানা অক্ষমতা দৈন্য ভুলে যখন রূপকথায় ডুবছে তখনই শুরু হতে থাকল বছরের মূল বোশেখি ফসলের ওপর পাহাড়ি ঢলের তা-ব। প্রতি বছরই এই ঢলে গ্রামের বহু জমি উজাড় হয়েছে। কিন্তু রইসের ভিটে সংলগ্ন জমিটা একটু উঁচু জায়গায় থাকায় এদ্দিন মোটামুটি এর প্রকোপ থেকে বেঁচেছিল। বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা-মা বিছানায় যন্ত্রণায় চিৎকার করে, পথ্য মিলে না। রইসের ছোট দুই ভাই পাস ফেল করে করে মেট্রিক পাস করে শহরে যুদ্ধ করছে। রইসের আরেক ভাই যে পুষ্পরই বয়সী, গ্রামের স্কুলে পড়ে। বাড়ি ফিরে রোজ সে ভাবির সঙ্গে  কৈশোরিক খেলায় মেতে উঠত। সেই বাবলুও পড়া-ক্লাস বাদ দিয়ে দিন রাত বড়ভাইয়ের সঙ্গে জমিতে পড়ে থাকে। তাগড়া ধানগাছ ঝড় ঢেউয়ে ল-ভ- হলে তক্কে তক্কে থাকে নরম মাটিতে ফের চারা রোপণের আশায়।
চারদিকে যুগ যুগ মাটি খোঁড়া বন্ধ থাকায় হাওরের পাশে যেন উঁচু-নিচু জমি নয়, জমির গরিব ধনী শ্রেণীভেদ বন্ধ। এর মধ্যেই শুকিয়ে জীর্ণ হতে থাকা পরি ক্রমশ মেরুন হারিয়ে সবুজ হারিয়ে পোয়াতি হয়ে শিশুর জন্ম দিয়ে অপুষ্টির রোগে বিছানা নিয়েছে, মফস্বলে গিয়ে কুলিগিরি করে কখনো হাত পেতে সংসারের জোগান দিতে দিতে রইসের হুঁশের মধ্যেই থাকে না।
বৈশাখ চলছে। রইসের আত্মার ধুকপুকের মধ্যে কেবলই ধোঁয়াটে বাতাসের গুমরানী। পাঁচদিন ধরে আসমান ভেঙে বৃষ্টি হওয়ার পর আজ শেষ রস কচলে টিবানি ঝরছে। এবারও বৈশাখের সব ফসল  আসমান পাতাল জলের তলায় একেবারে লেজেগোবরে বিলীন হয়ে গেছে।
এদিকে তার স্বপ্নের স্ত্রী রইসের অভাব তিতুকুটে অসহায়-অবহেলার মধ্যে সন্তান জন্ম দিয়ে কী যে এক বেদিশার মধ্যে পড়ল, রক্তপড়া বন্ধ হয় না। কবিরাজ এসেছিল। পয়সা না থাকায় ফি বাবদ একটি তরকারির পাতিল দিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে নতুন আবুর টেঁউ টেঁউ শুনে রাত কাবার করেছে। চিমসানো স্তন লটকে একসময় আবু ঘুমিয়ে পড়ে। চেপে রাখা কাপড়ের ন্যাকড়া ফুঁড়ে স্ত্রীর শায়া বেদম লাল লহুতে একাকার। না এ তার সেই স্বপ্নে দেখা পরি না। স্বপ্নের পরি থাকে খোয়াবের চক্করে। ডানা ঘুরিয়ে সেই কবেই চলে গেছে নিজ রাজ্যে। রইস বাপের মৃত্যুর পর মা’র মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা মানুষ, এই শিশুকে এর মাকে তার অসহ্য এক বোঝা বোধ হয়। হাওরের ওপারের দক্ষিণ-পুবের গ্রামগুলো রাক্ষুসী ছোবলের কোপে কোপে ছিন্নভিন্ন হয়ে ভেঙে পড়েছে।
আলো-আঁধারির মধ্যে দেখা যায়, স্ত্রীর নিঃসাড় হাঁ-এর ওপর একটা মাছি উড়ছে। বিপদের জন্য জমিয়ে রাখা মুড়ি গুড় মরার মধ্যে থেকে উঠে চুরি করে খেয়ে ‘মাগি, দেহো কেমন ঘুম দিতাছে’। রইস উদ্দিন ধাক্কা দেয়, আবুর মা…ও…।
কবে থেকে ওকে পুষ্প ডাকা ছেড়ে দিয়েছে রইসের মনেও পড়ে না।
পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাকি ভাইয়েরাও ফসল বাঁচাতে ঝুপড়ির মধ্যে ভিড় করেছিল। বন্যায় সব ভেসে যাওয়ায় সন্তানসহ বোনরাও এই বাড়িতে। ঘরে হাঁটার জায়গা নেই। কিছু একটা খাদ্যের ব্যবস্থা না হলে সব মানুষকে তার বউয়ের বুনি চুষে বাঁচতে হবে।
রইসের চিমসানো দেহ ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
ওপরে আসমান। কত লতা কত পাতা, না পাইলে কি গরুর ল্যাদাও নাই ? রইসের হলুদাভ চোখে ছায়া। কাদাজল আর ধু-ধু বিরানভূমি। আহারে বৈশাখের আগে আগে কী জাঁকালো ফসল হয়েছিল এবার! সাপের কণার মতো ধানের ডগাগুলো ধেই ধেই করছিল। সে-ই কয়েকটা দিন গেছে রইস উদ্দিনের। এবার আবহাওয়া ভালো। তারপরও একদিকে বুকের মধ্যে ডহর ডহর সুখ, অন্যদিকে মৃত্যুর মতো মিশমিশে ভয়। ফসলের ডগা বুকে, গালে শরীর মেখে মেখে শুধু প্রার্থনা করে গেছেÑপোক্ত হ। পোক্ত হ। ভেতরে দুধের মতো ধানের দানা। কখন পাহাড়ি ঢল আর বন্যা এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়Ñরইস উদ্দিন এই দিনগুলোতে তক্কে তক্কে বুঝেছে মুহূর্ত কেমন মানুষের ওপর দিয়ে লাঙ্গলের ফলার মতো দৌড়ে দৌড়ে যায়।
রাতে পাতা খসখস করলেও তার মনে হতো, এই বুঝি ঢল নামল। সে রাতভর ছটফট করে আর ঘর বাহির করে। ক্ষুধার তাড়নায় যৌবন ঢেকে ভর ভরন্ত পোয়াতি স্ত্রী মরণ ঘুম ঘুমায় ?
কেমনে ঘুমায় মাগি ?
যখন তা-ব শুরু হলো স্ত্রীকে খামচে ধরে চিৎকার করে রইসউদ্দিন…তুই মর খানকি, অলক্ষ্মীÑতরে বিয়ার পরই আমার…।
আজ ভোরে তার নিস্পৃহ চোখ তা-বমাখা গ্রামে মিহি বাতাসে রইসকে থিতু করতে করতে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে ফেলে…যেনবা সেই বাতাস সাঁতরে ডানাভাঙা ছেঁড়া মেরুন কাপড়ে পরি ঘেই খেয়ে খেয়ে তার সামনে এসে বড়ো করুণ চোখে তাকায়, কচুর ঘেন্টু গমের জাউ খাওয়াও আমি আমার লাবণ্য হারাই নাই। তুমি রক্তচুষা, আমারে বিয়া কইরা হাড্ডি রস সব চুইসা অহন গলায় দাঁত ফুটাইছো ? ক্যান ? আমার কী দোষ আছিল ?
গ্রাম থেকে গিয়ে অসৎ পথে টাকা কামাতে থাকা রাজধানীর বন্ধুটির কথা মনে পড়ে।
নিজ ভিটায় আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না রইস।


গ্রামে টিনের ঘর উঠেছে। কোলাহলমুখর প্রাইভেট ভার্সিটির কোনায় পান-বিড়ির দোকান সাজিয়ে বসেছে রইস। চৌকস গাড়ি থেকে চকচকে পোলাপান নেমে আসে, সিগ্রেট চাওয়ার ফাঁকে আঙুলের ইশারায় কথা হয়, কার কটা ইয়াবা লাগবে। শহরের নানারকম দামি লোকদের কাছে তার কদর তাকে রোমাঞ্চিত করে। যখন সদ্য কিশোর হতে থাকা শিশুগুলো নিজের ‘বাপ’কে ভুলে ইয়াবার প্রতীকী নাম বাবা বাবা ডেকে হাত বাড়ায়, অন্যজগতে ঘোর খেতে থাকা এইসব শিশুকে ধ্বংসের পথে যেতে দেখে নিজ রাজপুত্রের কথা মনে পড়লে মাঝে মধ্যে ফাৎনার মতো কলজেটা টান খেয়ে ফের মিলিয়ে যায়, না, সে তার স্ত্রী-সন্তানকে এই শহরে আনবে না। এবার গ্রামে গেলে আরেকটা সন্তানের চেষ্টা করবে। মা’র মতো খুকি পরি জন্ম নিলে টাকা আরও টাকা জমিয়ে মফস্বলে বাড়ি নেবে…ঘুঙুর পরা কন্যাকে দেখে তার অন্তরাত্মা গেয়ে উঠবেÑআয় খুকু আয়। বিহ্বল রইসের চোখ ভিজে ওঠে।
ওরা নেশার অন্য এক জগতে ডুব দিলে বন্ধুর পাশে শুয়ে রইসের পুষ্পর কথা মনে পড়ে। বিকাশ-এ টাকা পাঠায় রইস, গ্রামে গেলে তার সর্ব অস্তিত্ব অদ্ভুত রোমাঞ্চে কাঁপতে থাকে। শাড়ি গয়নায় সজ্জিতা পুষ্প এখন শুধু পরি নয়, পরির রানি হয়ে সারা বাড়ি গ্রামের বাতাস মাতিয়ে ওড়ে। তার গর্ভজাত রাজপুত্র কোথায় যায় কী করে তার কোনো হদিস নেই। দেহের গোশতের নিচে মিহি মিহি তেল জমে তার মধ্যে লাবণ্যের অগ্নুৎপাত ঘটাতে শুরু করেছে।
শহরে রইস এখন যেনবা কলে পড়া জন্তু। উত্তপ্ত দেহ-মনে কেবল ঝলসায়। বন্ধু কত দিন বলেছে রঙ্গিণীদের ওখানে গিয়ে দেহের কামনা মিটিয়ে আসতে। মাদক বেচুক, বাঁচার জন্য দু’নম্বরি যতই কায়দা জানুক রইস, সে তার পুষ্পপরির সঙ্গে এই বেঈমানি করবে না। মাঝে অভাবের চ-াল তাকে উন্মাদ করেছিল, সে তো মেরেই ফেলছিল তার স্বপ্নকন্যাকে। এরপর এঁটো দেহ নিয়ে ওর ওমে রোমাঞ্চ করবে ? এ আল্লাহ সইবেন না।
স্ত্রীর বিচ্ছেদ অসহনীয় হয়ে উঠলে একদিন যেনবা স্ত্রীর স্বপ্নে ঘ্রাণে আচ্ছন্ন রইস মূর্চ্ছায় অসাড়ের মতো রাতের বাস, রিকশা ধরে নিকষ ভোরে নিজ আঙিনার হাওর ঘেঁষা বাঁশঝাড়ের পাশে পা রেখে কাঁপতে থাকে, স্ত্রীর চোখে বিস্ময়ের আনন্দ দেখতে ধড়ফড় বুক নিয়ে ‘পুষ্প’, উচ্চারণের আগেই খিলখিল হাসির শব্দে সে মুহূর্তে স্থবির হয়ে আসে। এই বাবলু থামো…বাবলু…এক রাইতেও ঘুমাইতে দেও না…আম্মায় টের পাইলে…। এরপর আরও অসহ্য আগুনের হলকার মতো কিছু বাক্যাবলি রইসকে কখনো নিথর করলে কখনো হু হু রোদনে ভাসাতে থাকলে অবচেতন ক্রুদ্ধ সত্তাটা যখন কুড়াল হাতে নেবে…তখনই পাহাড় ভেঙে নিমিষে চারপাশ আন্ধার করে এমন ঢল নামল…।


যেনবা আলকাতরাভরা ডাইনি বুড়ি তার চুল গুটাতে থাকল, বাদলের কালো উজ্জ্বলতার গায়ে ঢলে পড়তে আসমান, যেনবা আসমানের বক্ষ খামচে ধরা রাক্ষসটার নখ হয়ে যেতে থাকল শিথিল। পুরো চরাঞ্চলকে অপূর্ব জ্যোৎস্নায় ভাসিয়ে যখন গাঢ় করে চাঁদটা উঠল তখন রইস যেনবা কোনো ডিঙি নয় মহাকাশের বৈতরণীতে শুয়ে মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে থাকে। চারপাশের আহত সঞ্জীবনী সুধা যেন…আজব এক বাঁচার শক্তিতে উঠে বসে বিমূঢ় হয়ে যায় সে। চারদিকে মেঘালয়ের পাহাড়ের অপূর্ব প্রকট মোচড় যেন হাওর নয়, ব্যাপক এক পৃথিবীকে স্বপ্ন সুতোতে ঘিরে রেখেছে। আর আলোর রুপোর গুঁড়ো পড়ে চকচক স্রোতের হাওরের মাঝখানের অভূতপূর্ব সৌন্দর্য তাকে এমন অচেনা বোধে বিমূঢ় করল, যা সে অনেকটা হয়েছিল কলাপাতার ফাঁকে প্রথম উড়ায়! পরিকে দেখে ভাষাহীন বেকুব স্তব্ধতায় কাঁপছিল সে, বাঁশঝাড়ের ফোঁকর গলিয়ে অপূর্ব পুষ্পাকে নগ্নিকারূপে বাবলুর ওপর মোচড়াতে মোচড়াতে দেখে। কী বলছিস পুষ্প ? রইস বুড্ডাটা জীবনে আসার পরই তার প্রথম মৃত্যু ঘটেছিল ? বাবলু তার মৃতদেহে প্রাণের সঞ্চার করেছে ? শরীর-মনের প্রেম কী বাবলু না থাকলে এ জীবনে জানাই হতো না ? ঘেন্নোক্লিষ্ট চেহারার রইস পুষ্পকে পরি পরি করে তার দেহে সোহাগ করলে গা ঘিনঘিনে বোধে মনে হয় কোনো এক কুত্তা তার শরীর লেহন করছে ? বাবলু কিছু একটা কামাইয়ের ব্যবস্থা করে তাকে এখান থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাক ? তার কাছে রইসের দেওয়া অনেক স্বর্ণ আর টাকা  গচ্ছিত আছে ? রইসের দুকানে গরম শিশা ঢুকে শক্ত হয়ে যায়।
হা হা হা…উন্মাদের মতো যেনবা জল তেপান্তর হাসে। এইসব কথার তীব্র ফালায় কখনো কান্না কখনো খুনিবোধে সে যখন দিকভ্রান্ত, তখন পাহাড়ি ঢলের ব্যাপারটি তার হুঁশের মধ্যেই ছিল না। আচমকা জোয়ারের তোড়ে টিনের ঘরসহ পুরো গ্রাম ভেসে যেতে থাকলে জল পাহাড়ের মধ্যে চোখ বোজার আগে সে দেখেছিল স্রোতের করাল গ্রাসে জড়াজড়িরত নগ্নিকা যেনবা মৃত্যুর ছোবলে ঘাই খেতে খেতে পৃথিবীর ওপারে চলে যাচ্ছে।
ফেরেশতা নৌকা পাঠিয়েছিল। তাতে চেপেই পৃথিবীর অপূর্ব নৈসর্গের মধ্যে নিজের জীর্ণ গ্রামটিকে তলিয়ে যেতে দেখে রইস অদ্ভুত রোমাঞ্চে কাঁপে।
রইসের এই নতুন জন্ম তো আর এমনি এমনি হয় নি…পূর্ণিমার জলের দর্পণে সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে হতবাক, রীতিমতো সুঠাম রাজকুমার। মহাঅলৌকিক রাজ্যের দেবতা তোমাদের প্রণাম…। কিন্তু এই জল মরু রাজ্যে একাকী আদম বাঁচে কী করে ?
জলের মধ্যে কলরোল ওঠে…একী ? দাদির বর্ণিত কাহিনির মতো অপূর্ব এক মাছকুমারী যে জল ফুঁড়ে গলা বাড়িয়েছে, আমার হাত ধরো কুমার, আমার হাত ধরো। তোমার জন্য পাতাল বুড়ির কাছে লেজ কাটাইছি, তুমি আমায় গ্রহণ না করলে আমি জলের ফেনা হয়া যাব।
কম্পিত হাত বাড়িয়ে জলকন্যাকে দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় রইস, তার সমস্ত অস্তিত্ব স্তব্ধ গম্ভীরে কাঁপতে থাকে। মেঘালয়ের জল পোশাকের ওপর মেরুন কুয়াশার দেহ, সাপের মতো দু’বেণীর মধ্যে কলাপাতা রঙের ফুল…বিড়বিড় আনন্দে হাসে রইস, এই তো তোমারে ফির‌্যা পাইছি। জলের তোড়ে বাবলুর সঙ্গে যে ভাইস্যা গেছে সে অন্য কেউ। ওপরে চন্দ্রের নহর বেয়ে ঘি-এর মতো জ্যোৎস্না গলে গলে পড়ছে…বেহেশতি সৌন্দর্যের ওপরে নতুন জন্ম নেওয়া মানুষ তার জন্মান্তর ধরে খুঁজে ফেরা পরিকে ফের খুঁজে পেয়ে জ্যোৎস্নার অগ্নিজলে জড়িয়ে ধরে হু হু আনন্দে কাঁদতে থাকে।