চলতি নদের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ বোমা ও ড্রেজার মেশিন ব্যবহারকারীদের তা-বে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সনাতন পদ্ধতিতে বালু আহরণকারী সাধারণ শ্রমিকরা তেমনি বৈধ ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতির শেষ নেই। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ছাতকের জনৈক ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান ২০ ব্যক্তির নামোল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের নিকট দাখিল করা এক অভিযোগে উল্লেখ করেছেন যে, এরা চলতি নদকে ব্যবহার করে কেমন কারসাজির রাজত্ব কায়েম করেছেন। এই ব্যক্তিরা অবৈধ কর্মকা- পরিচালনা করে রীতিমত কোটিপতি বনে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে ওই অভিযোগপত্রে। এই ব্যক্তিরা নিজেরাই কিছু বালু-পাথরের মজুদ তৈরি করে রাখে নদী-তীরে। ভ্রাম্যমাণ আদালত যখন অবৈধ বোমা বা ড্রেজার মেশিন জব্দ করার অভিযান পরিচালনা করে তখন এইসব বালু ও পাথরও জব্দ করা হয়। পরে জব্দকৃত বালু ও পাথর নিলামে বিক্রি করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই নামে অথবা পছন্দের কারও নামে ওই বালু-পাথর কিনে নেয়। নিলামে কিনে নেয়া বালু-পাথর বিক্রির জন্য সরকার থেকে একটা নির্দিষ্ট সময় দেয়া হয়। পরে এরা নিলামে কেনা বালু ও পাথরের স্তূপ বিক্রির অজুহাতে আরও বহুগুণ বেশি বালু ও পাথরের মজুদ গড়ে তোলে। নিলামের বালু-পাথরের চাইতে অবৈধভাবে আহরিত বালু ও পাথরের পরিমাণ হয় হয় অনেক বেশি। চলতি নদী থেকে দৈনিক এক কোটি ৬৫ লাখ টাকার বালু ও পাথর অবৈধ ড্রেজার ও বোমা মেশিনের মাধ্যমে তোলা হয়ে থাকে। এই কারসাজি ও অবৈধ মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে চলতি নদ থেকে বালু ও পাথর আহরণ নতুন নয়। এটি বহু পুরনো একটি প্রক্রিয়া। বলাবাহুল্য এই প্রক্রিয়া বন্ধে যেসব অভিযান পরিচালনা করা হয় তার ফলাফল একেবারেই শূন্য।
অথচ চলতি নদে সনাতন পদ্ধতিতে হাত দিয়ে বালু ও পাথর সংগ্রহ করে ছোট ছোট বারকি নৌকা দিয়ে বিক্রি করে কয়েক হাজার শ্রমিক পরিবার যুগ যুগ ধরে জীবীকা পরিচালনা করে আসছিল। বোমা ও ড্রেজার মেশিন আগ্রাসনের ফলে এই শ্রমজীবী পরিবারগুলো সবচাইতে অসহায় হয়ে পড়েছে। প্রভাবশালীরা যেভাবে মেশিন দিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ বালু ও পাথর আহরণ করে থাকে তাতে নদের তলদেশে এখন কোন বালু ও পাথরের সঞ্চয় নেই। ফলে শ্রমজীবী লোকজনের সনাতন পদ্ধতিতে বালু-পাথর আহরণের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এরা কর্ম হারিয়ে গভীর সংকটে পতিত হয়েছেন। অথচ মেশিনের আগ্রাসন বন্ধ করা গেলে সনাতন পদ্ধতিতে তোলার মত পাথর ও বালুর মজুদ কখনও নিঃশেষিত হয়ে পড়ত না বলে অনেক শ্রমিক জানিয়েছেন। প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করে গুটিকয় ব্যক্তির আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠার এই সর্বনাশা প্রক্রিয়াকে বন্ধ করা আবশ্যক। বংশ পরম্পরায় যারা এই বালু ও পাথরের উপর নির্ভরশীল তাদের ঐতিহ্যগত পেশা, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক নয়, তা বজায় রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নতুবা এই খাতের উপর নির্ভরশীল প্রান্তিক মানুষগুলোর যে দুরবস্থা তৈরি হয়ে চলেছে তা আরও খারাপ পরিণতির দিকে অগ্রসর হবে।
আমরা সর্বাবস্থায় চলতি নদকে ইজারাদারির বেনিয়াবৃত্তি এবং মেশিনের পরিবেশ বিধ্বংসী আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে চাই। এই সম্পদভা-ারটি বছরের পর বছর ধরে যেভাবে কয়েক হাজার প্রান্তিক মানুষের অন্ন-বস্ত্রের জোগানদার হয়ে তাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই অবস্থায় দেখতে চাই। তাই এই নদে যত প্রকার অবৈধ কার্যকলাপ চলছে কঠোর হস্তে তা দমন করার জন্য আবারও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। অবৈধ কাজ বন্ধ করাই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক দায়িত্ব। এই নদটি যাতে আবার অতীতের মত ইজারাদারির বৃত্তে না ঢুকে পড়ে সে-দিকেও সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

