যাত্রা বা মেলার নামে জুয়ার আসর কঠোর হাতে দমন করুন

যাত্রা পালা মেলা ইত্যাদি বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মূলত বাংলা সংস্কৃতি বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে এসব মাধ্যম ব্যবহারের ফলে। সুদূর অতীত কাল থেকে গ্রাম বাংলার শান্ত ও নিস্তরঙ্গ জীবনে আনন্দের উপলক্ষ এনে দিতো একটি দুটি যাত্রা গান কিংবা ধর্মীয়-সামাজিক একটি মেলা। গ্রামের লোকজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষার সময় কাটাতো কবে গ্রামে যাত্রা পালার লোকজন আসবে কবে সজ্জিত প্যান্ডেলের উন্মুক্ত মঞ্চে পরিবেশিত হবে জনপ্রিয় পালা। মানুষ নিজ গ্রাম অথবা আশপাশের কোন গ্রামে অনুািষ্ঠতব্য মেলার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষমাণ থাকতেন আর মেলায় বসা পসরা থেকে সংগ্রহ করে নিতেন সাংসারিক জীবনের টুকিটাকি। ছেলে মেয়ে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সুন্দর সাজে সজ্জ্বিত হয়ে মেলা প্রাঙ্গণে এসে মিলিত হয়ে যৌথ আনন্দে বিভোর হয়ে উঠতেন। বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী এই মেলা বা যাত্রাপালার আসর আজ কতিপয় দুর্বৃত্তের আগ্রাসনে নিজস্ব চরিত্র হারিয়ে অপসংস্কৃতির অবয়ব ধারণ করেছে। শুধু অপ সংস্কৃতিই নয় এইসব মেলা হয়ে উঠেছে মানুষের চরিত্র হননের এক উৎকৃষ্ট উপায়। যে মেলা ছিল মানুষের প্রাণের সাথে যুক্ত সেই মেলার বিরুদ্ধে এখন মানুষকে রাজপথে নামতে হয়। মানুষ সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে তথাকথিত মেলা আয়োজন বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের নিকট আকুল আবেদন জানাচ্ছেন । মেলার নামে সাধারণ মানুষের কেন এত ঘৃণা আর অনীহা? এর কারণ হলো মেলা এখন বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে উঠার পরিবর্তে হয়ে উঠেছে অবাধ মাদক সেবন আর জুয়ার আখড়া। এমন কোন সামাজিক মেলা নেই যেখানে এই দুই আয়োজনের বাহুল্য থাকে না। বরং বলা চলে মেলা আয়োজনের পেছনে মূখ্যত জুয়া ও মাদকের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যটিই থাকে সংগঠকদের প্রধানতম উদ্দেশ্য। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জামালগঞ্জের বিভিন্ন পল্লীতে আয়োজিত এইসব মৌসুমী মেলার নামে অশ্লীলতা ছড়ানোসহ মাদক ও জুয়ার প্রকোপের উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব আসরে আয়োজিত  জুয়ায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ কী উপায়ে অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে তার কিছুটা বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আইনত কোন মেলায় মাদক কিংবা জুয়ার আসর বসানোর বিন্দুমাত্রা সুযোগ নেই। তারপরেও মেলায় জুয়ার আধিক্য ঘটে কীভাবে? ভূক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, আইনপ্রয়োগকারী যেসব সংস্থার এসব নিবারণ করার কথা তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থনেই হয়ে থাকে এসব এবং এই অবৈধ আয়োজন থেকে উপার্জিত অংশের একটি বড় ভাগ পৌঁছে যায় তাদের পকেটে। এই যে আজ সুকৌশলে ও দুর্বীনিত উপায়ে বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশকে কালিমালিপ্ত করে ফেলা হচ্ছে তা আটকানোর জন্য কি আমাদের কিছুই কলণীয় নেই?
বর্তমান সরকার বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে সারা বছরই সর্বত্র একটি অনুকূল সাংস্কৃতিক আবহ বজায় রাখতে সচেষ্ট রয়েছেন। সুনামগঞ্জ শহরের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যায়, জেলা প্রশাসন মোটামোটি সারা বছরই বিভিন্ন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মানুষকে নিজের সংস্কৃতির উৎসে ফেরানোর চেষ্টা করছেন। এই সুস্থ চর্চার বিরুদ্ধে গ্রামে যারা অসুস্থ সংস্কৃতির চর্চাকে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন তারা নিশ্চিতভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির শত্র“রূপে বিবেচ্য। এদের কঠোর হাতে দমন করা তাই সকলের অবশ্য দায়িত্ব। নতুবা সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা করাও একসময় হুমকির মুখে পড়বে। প্রতিক্রিয়ার ধারকরা সর্বদাই বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরুদ্ধে ছুতোনাতা খুঁজার চেষ্টা করে। এসব আয়োজন তাদেরকে অব্যর্থ অস্ত্র হাতে এনে দিচ্ছে যা বাঙালিত্বের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। সুতরাং বাংলাদেশের পল্লীতে সংস্কৃতির নামে ঢুকে যাওয়া এসব ঘুন পোকাকে এখনই দমন করতে হবে।