‘যারা মাকে ভালোবাস না তারা আমার গান শোন না’

সজীব দে
আমার গানের ভক্ত একজন নারী। আমাকে বললেন তার বাড়িতে বেড়াতে যেতে। ঠিকানা চাইলাম। যে স্কুলে গান করছিলাম সে স্কুলের পেছনের একটি বাড়ি দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এটা আমার বাবার বাড়ি। এই বাড়িতেই আমি আছি। আসবেন। আর দূরে একটা বিল পেরিয়ে একটি গ্রাম দেখিয়ে বললেন, ‘ ঐ হলো শ^শুর বাড়ি। এখন বাবার বাড়িতে আছি। আপনি প্লিজ বাবার বাড়িতে আসবেন। একথা শুনে আমি একটা কাগজ কুড়িয়ে থিমটা লিখে রাখলাম। গানে গানে আমি প্রশ্ন করলাম সমস্ত নারী জাতিকে। গানটি এরকম ছিল-
‘বাবার বাড়ি এই গেরাম শ্বশুর বাড়ি ওই
তবে তোমার বাড়ি কইগো নারী
তোমার বাড়ি কই?
একটু ভেবে দেখবেন, আসলে আমাদের বাঙালি নারীদের কোন বাড়ি নেই। শিশুকালে বাবার বাড়িটাই তার বাড়ি, যৌবনে স্বামীর বাড়িটা তার বাড়ি আর বৃদ্ধ বয়সে ছেলের বাড়িটাই তার বাড়ি। তাই আমি লিখেছি-
‘শিশুকাল আর কৈশোর কাটে বাবার আশ্রয়ে
যৌবন কাটে স্বামীর কাছে শ্বশুরালয়ে
আবার বৃদ্ধ বয়সে আশ্রয় নাই আর ছেলের কাছে বই।
তবে তোমার বাড়ি কইগো নারী
তোমার বাড়ি কই?
…………………………….
আসল বাড়ি কই আমাদের আসল বাড়ি কই’?
এমনই জীবন সংশ্লিষ্ট গান গেয়ে কখনো শ্রোতাদের আনন্দ, আবার কখনো অশ্রুসিক্ত করে উদ্বেলিত করলেন গণশিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাস। তিনি একাধারে কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গীতিকার। করেন অভিনয়। নির্মাণ করছেন অনুষ্ঠানও। জীবনমুখী গান করার মধ্য দিয়ে নকুল কুমার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছেন বহু আগেই। তার গানে সামাজিক বিড়ম্বনার কথা উঠে আসে, সামাজিক অসংগতিকে তিনি গানের ভাষায় তুলে ধরেন মানুষের কাছে।
গত শুক্রবার রাতে সুনামগঞ্জ সৎসঙ্গ আশ্রমে ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের ১৩২তম জন্ম মহোৎসবে গণশিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাস গান গেয়ে দর্শকদের কখনো হাসিয়েছেন, কখনো কাঁদিয়েছেন। হাজারো দর্শকের করতালি আর হৃদয়সিক্ত ভালোবাসায় শিল্পী নিজেও মঞ্চে কেঁদেছেন। প্রতিটি গানেই শ্রোতারা তুমুল করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দিত করেছেন।
রাত প্রায় ৯টায় গান শুরু হলেও সন্ধ্যা থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন সড়কে ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’ অবস্থা। তিল ধরণের স্থান নেই। বিশাল জন¯্রােত এসে মিশে সৎসঙ্গেও মোহনায়। অনেকে নতুনপাড়ার দুই পয়েন্টে স্থাপিত প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপভোগ করেন গান। গানে গানে নকুল কুমার বিশ^াস শ্রোতাদের কাছে মিনতি করেন, যাদের মা বেঁচে আছে সবাই যেনো মায়ের পাশে থাকে। তিনি নিজের মা হারিয়েছেন একদম ছোটবেলায়। বাবাও হারিয়েছেন নাবালক বয়সে। তাই অভিভাবক হারানোর যাতনা উপলব্ধি করেন ভীষণ রকম। বললেন- পৃথিবীর যে জায়গায় যাই সেখানে বলি, যারা মাকে ভালবাসে না, তারা যেনো তার গান না শুনে। –
‘যারা মাকে ভালোবাস না
তারা আমার গান শোন না
যারা মাকে অবহেলা কর
মায়ের কষ্ট বোঝ না
তারা আমার গান শোন না
…………………….
সেই জ্যান্ত মাকে রেখে যারা
করো মাটির মায়ের সাধনা
তারা আমার গান শোন না..’
গিভ এন্ড টেক। এটা পৃথিবীর নিয়ম। সারা পৃথিবী এই নিয়মে চলে। আপনি কিছু দেবেন কিছু নেবেন। আমি গান করছি এর বিনিময়ে সম্মানী পাচ্ছি। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে পায় লভ্যাংশ। চাকরী করলে অর্থ। আপনারা আমার গান শুনতে এসে সময় ব্যয় করছেন। যারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন তারা সময়ের সঙ্গে অর্থও ব্যয় করেছেন মনের শান্তির জন্য। কোনো স্বার্থ ছাড়া ভালোবাসে শুধু আমার মা। বললেন-
‘কাদা আর খড় কুটা দিয়ে মাটির মূর্তি গড়ে
লক্ষ টাকা মজুরী নেয় মূর্তির কারিগরে।
মা আমার সুন্দর দেহ গড়ে দিয়েও মূল্য চাইল না
স্বার্থ ছাড়া ভালোবাসে শুধু আমার মা
……………………
সাধকের জীবন কাটে তার মুক্তির সাধনায়
আমার মায়ের জীবন কাটে
তার সন্তানের মঙ্গল কামনায়…।’
বললেন, আমি আমার মাকে পাই নাই। আমি জানি মা কী জিনিস। আমি চাই প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রত্যেক সন্তান তার মাকে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সম্মান করুক। সন্তানের অবহেলায় কোনো মা যেন আর বৃদ্ধাশ্রমে না থাকে। কুঁড়ে ঘরেও যদি মা থাকেন মনে করো সেই ঘরটাই একটা মন্দির। আর রাজপ্রাসাদে যদি মা না থাকেন তাহলে সেটা ঘর ছাড়া আর কিছু নয়। গাইলেন-
‘লক্ষ্মী ছাড়া এই ঘরটা যদি আমার মায়ের ছোঁয়া পেত
তার চরণ যুগলের পরশে ঘর মন্দির হয়ে যেতো
……..
মাকে ছাড়া শহর বন্দর মনে হয় অরণ্য
যদি আবার ফিরে পেতাম মাকে
এ জীবন হতো ধন্য
………
আমি মাকে ভেবে দশভুজা
তোদের মতো করব পূজা
………………..
মাকে এনে দে, আমার মাকে এনে দে।’
শ্রোতাদের শোনালেন ঠাকুরের বাণী-‘মাতৃ ভক্তি যার যত, সেই ছেলে হয় কৃতী তত’, ‘পিতায় শ্রদ্ধা মায়ে টান সেই ছেলে হয় সাম্য প্রাণ’। পিতা মাতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে।
এরপর তিনি দর্শকদের কাছে প্রশ্ন করেন, দুনিয়াতে কোন জেলা সবচেয়ে বড় তারা জানেন কিনা। শ্রোতারাও স্বউল্লøাসে বলেন, ‘সিলেট’। নকুল কুমার বিশ^াস বলেন, আমি আবার যদি জন্ম নিয়ে আসি এই পৃথিবীতে, গায়ক হয়ে জন্ম নেবো সিলেটের মাটিতে। বাংলা থেকে লন্ডন হয়ে এমেরিকা যদি ধর, দুনিয়াতে সিলেট জেলা সবচেয়ে বড়। আজ আমি যখন লন্ডনের পথে গাড়িতে যাই আব্দুল করিমের গান শুনি। এমেরিকায় গেলে রাধারমণের গান শুনি। আমি যখন ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে যাই তখন হাসন রাজার গান শুনি। আমার বাড়ি একটি অঁজ পাড়া গাঁয়ে। আমার বাবার এতো টাকা ছিল না যে আমাকে বিলেতে পাঠাবেন। সিলেটের মানুষ যদি না থাকতো আর সিলেট যদি না থাকতো আজকে আমি এখানে আসতে পারতাম না। সিলেটবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই গান-
‘সিলেটের মাটি মহা পবিত্র
মনে রেখো চিরকাল
সিলেটের মাটি বেছে নিয়েছিলেন
বাবা শাহজালাল
দুনিয়াতে সিলেট জেলা

সবচেয়ে বড়

আছো যত সিলেটবাসী লও প্রীতি
তোমরা সারাবিশে^ ছড়িয়ে দিয়েছ বাংলার সংস্কৃতি
হাছন, লালন, রাধারমণকে
তোমরাই লালন করো…’
‘সদগুরু’ গানের শুরুতে তিনি বললেন, আপনি ভুল করলে আপনার পরিবার সাফার করবে। নেতা ভুল করলে পরিণতি ভোগ করবে জাতি। গুরু ভুল করলে কোটি কোটি পরিবার। এ জন্য সদগুরু নির্বাচন করতে পরখ করে দেখতে হবে। সাজপোষাকে গুরু হয় না। ‘চলো যাই বৃন্দাবন’ গানের পূর্বে বললেন, ‘এই গানটি তাদের জন্য যারা এখন বৃদ্ধ, চাকরি করেন না বলে এখন পরিবারে কদর নাই। সংসারে অবাঞ্ছিত। তাদের দুর্দশা নিয়েই এই গান। এই অবস্থা হয়তো আমারও হতে পারে। লন্ডনের মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রায় হলে গান করে ঘেমেছি। কার জন্য? আমার ছেলের জন্য। গাইলেন-
‘ছেলে শুনে না কথা
মেয়ে দেয় ব্যাথা
চলো যাই বৃন্দাবন
………………..
একদিন যারা ছিল
তোমার প্রচ- ভক্ত
আজ তারা তোমায় দেখে বিরক্ত
চলো যাই বৃন্দাবন……।’
অসাধারণ এই জীবনমুখী গায়ক এসময় শ্রোতাদের ভালো কাজ করার জন্য সকলকে তাগিদ দেন। বলেন, অশুভ কাজ দ্রুত করার জন্য রাবনের সাথে সাথে স্বর্ণ লংকার পতন হয়েছিল।
এসব গান ছাড়াও ঠাকুল অনুকূল চন্দ্রকে নিয়ে –
‘ও ঋষি ঠাকুর অনকূল
তুমি খুলে দিলে সবার দৃষ্টি
জীবন পথের অমর নীতি
যোজন যোজন বিশ^নীতি
দিয়ে সবার প্রাণের সম্প্রীতি
বিশ^কে করলে আকুল…’,
সহ দয়াল ঠাকুর, হরণ করেছ, জল আনিতে যাইরে সখি… ভক্তিমূলক কিছু গান শোনান। ছিল একটি গানাটিকাও। যাতে গান ও নাটক ছিল একই সাথে। এতে বউ চরিত্রে নাট্যশিল্পী অজন্তা ও বন্ধু চরিত্রে তবলা বাদক রনজিত বাবু অভিনয় করেন। তবে অধিকাংশ শ্রোতা সাউন্ড সমস্যার কারণে এটি আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে নকুল কুমার বিশ^াস পৌর মেয়রকে নিয়ে তাৎক্ষণিক গান রচনা করেন। গেয়ে শোনান- ‘তোমার কথা কি বলব আর/তুমি উন্নয়নের রূপকার……’ চার লাইনের গান। উপমহাদেশের প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী নকুল কুমার বিশ^াসের গানের পর সাড়ে ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলে বাউল গানের আসর। আসরে গান করেন বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পী বাউল হীরা মোহন ও বাবুল বর্মন সরকার।