শাহরিয়ার চৌধুরী বিপ্লব
বিএনপি জামায়াত আমলে একবার তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বগুড়ায় গেলেন। ডিসি সাহেব নিজে না এসে এডিসি সাহেবকে পাঠালেন সার্কিট হাউজে। প্রটোকল এবং সালামি নিতে। এডিসি সাহেব ছাত্রলীগ করা অফিসার। সালামীর পরে লুকিয়ে ডাইনিং রুমে তার সাবেক নেত্রীকে আপা বলে পায়ে হাত দিয়ে ছালাম করে ফেললেন। (প্রাক্তন ছাত্রলীগারদের যা অভ্যাস)। এই কথা আর লুকানো থাকেনি। ব্যাস। বগুড়ার নেতারা জায়গা মতো পৌঁছিয়ে দিলেন। উনার অন্যকোন অপরাধ না পেয়ে কর্মরত অবস্থায় কদমবুসি করার অপরাধে শোকজড হলেন, সাসপেন্ড হলেন। পরে অবশ্য ডিসি হলেন। কেয়ার টেকারের শেষ দিকে। এই কর্মকর্তা এখনো প্রমোশন বঞ্চিত। যে উপ সচিবের সিগনেচারে উনি শাস্তির চিঠি পান তিনিও এখন পূর্ণ সচিব।
আরেকটি ঘটনা বলি ২০০৩ বা ২০০৪ সালে জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত জামালগঞ্জ যাবেন গণসংযোগে। ২০০১ সালে উনার নির্বাচনে বিরোধিতাকারী গ্রুপটি পাল্টা কর্মসূচি দিলেন যাতে তিনি যেতে না পারেন। মূল কমিটির বাইরে গিয়ে ইউসুফ আল আজাদ, দ্বিজেন বাবু, কায়কোবাদ টিপু, ছাত্রনেতা নাসির আফিন্দী, যুবনেতা জুয়েল, আবুল খয়ের প্রমুখ সেনবাবুর কর্মসূচি সফল করার জন্য তৎপর ছিলেন। এই সুযোগে আগুনে ঘি ঢালছিলেন স্থানীয় সাংসদ। আমাকে হঠাৎ ফোন করলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত। বললেন তোমাদের বাড়ীতে যাবো। তুমি থাকবা। চিটাগাং থেকে এসে দেখি থমথমে অবস্থা। পুলিশী সহযোগিতায় বাধাদানকারি গ্রুপ খুবই সক্রিয়। এসপি সাহেবের সাথে গোপনে দেখা করলাম। বুঝালাম যে পুলিশ নিউট্রাল না হলে জামালগঞ্জে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হবে। তাছাড়া জাতীয় ইস্যু সৃষ্টি হবে, সংসদে আলোচনা হবে। উনি টেক্টফুলি বিষয়টি হ্যন্ডলিং করলেন। এডিশনাল এসপি সাহেবকে সব বুঝিয়ে দিয়ে ছুটিতে চলে গেলেন। এডিশনাল এসপি সাহেব সকল হুমকি উপেক্ষা করে নিজে জামালগঞ্জে থেকে প্রোগ্রাম সফল করার ব্যবস্থা নিলেন। পুলিশ নিরপেক্ষ হওয়াতে সেন বিরোধিরা এই দিন চুপসে গিয়েছিল। সেই এডিশনাল এসপি সাহেবকে প্রত্যাহার করা হয়। সংযুক্ত করা হয়। এসপি সাহেব অনেকবার বলেছেন, বিএনপি নেতার কাছে ক্ষমা চাইতে কিন্তু এডিশনাল এসপি সাহেবের উত্তর ছিল আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ক্ষমা চাইবো না। মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার একদিন আসবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার এসেছে, কিন্তু উনার এলাকার এক নেতার গ্রুপিং এর শিকার হয়ে তিনিও আজ এসপিতেই আটকা পড়ে আছেন। এই রকম হাজার হাজার ঘটনা প্রশাসনে, রাজনীতিতে বিরাজমান।
বঙ্গবন্ধুর নামে চলি আমরা প্রায় সবাই। বাঙালি মাত্রই বঙ্গবন্ধুর কাছে কমবেশি সবাই ঋণী। কেউ প্রত্যক্ষ কেউ পরোক্ষ। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিচয়ের কার্ডধারী মাত্রই তাঁর কাছে ঋণী। এই মানুষটির জীবনের এক একটি মিনিট ঘণ্টা হিসাব করলেও যে কয়টা মিনিট ঘণ্টা, তিনি বাঙালি জাতির জন্য কারাগারে কাটিয়েছেন, নির্যাতন ভোগ করেছেন, সেই মুহূর্তগুলির ঋণ কি আমরা নিজের জীবনের মিনিট ঘণ্টা থেকে দিতে পেরেছি।
যারা অস্বীকার করি তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা স্বীকার করি, যারা তাঁর নাম ভাংগিয়ে চলি, রাজনীতি করি, ব্যবসা করি, চাকুরি করি, নেতা হয়েছি, এমপি মন্ত্রী হয়েছি, তারা কি করছি? কতটুকু সম্মান জানাচ্ছি, শ্রদ্ধা করছি, কিংবা প্রতিদান দিচ্ছি ? প্রতিদান তো দিচ্ছিই না, স্মরণ করছি কি না তাই তো সন্দেহ হয়।
বঙ্গবন্ধুর নামে সারাজীবন বদনাম করেছি, উনার দল করি নাই, কিন্তু আজ উনার মেয়ের দয়ায় এমপি হয়েছি। জীবনে কোনদিন জয়বাংলা শ্লোগান দেইনি অথচ পুরো পরিবার এই সরকারের সব ধরনের সুবিধা ভোগ করছি। আত্মীয়স্বজন ভাইবোন, ছেলেমেয়ে, সবাইমিলে বঙ্গবন্ধুর মেয়ের সুবিধা নিচ্ছি, আর সুযোগ পেলেই বলি, তিনি ভুল করেছিলেন, তিনি একা দেশ স্বাধীন করেন নাই, তিনি ভালো শাসক ছিলেন না, ইত্যাদি ইত্যাদি।
শুধু তাই না, যে বঙ্গবন্ধু কন্যার করুণা ভোগ করছি, আড়ালে আবডালে তাকেও কথা শুনাতে ছাড়ি না। বলি, তিনি বেশি কথা বলেন। এইটা ভালো করেন নাই, সেইটা ঠিক হয় নাই, আরো কতকিছু।
পারিবারিক জীবনে এন্টি আওয়ামী লীগ পরিবারে জন্ম নিয়ে, এন্টি আবহাওয়ায় বড় হয়ে, জীবনে বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু না বলে, তাচ্ছিল্যের সাথে শেখ মুজিব শেখ মুজিব বলে বর্তমানে সরকারি প্রাপ্তির সর্বোচ্চ আসনে বসেছি আমরা কিছু কর্মকর্তা, তারা ভুলেও অতীতে বঙ্গবন্ধুর জন্যে কিছু তো করিই নাই, অদ্যাবধি নগদ প্রাপ্তির সময়েও কিছু করে দেখাচ্ছি না।
অনেক এমপি মন্ত্রী আছেন যারা জীবনে একবারের জন্যেও জয় বাংলা বলেন নাই, রাজপথ কাহাকে বলে দেখেন নাই, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ বা ৯১, নবাবপুর কি জিনিষ জানেন না, শুধুমাত্র ধানমন্ডি ৩ এ জীবনে একবার গিয়েই সংসদে গিয়েছেন বা পতাকা উড়াচ্ছেন। তাদের কতটুকু মায়া আছে, কতটুকু ভালোবাসা আছে, কতটুকু কমিটমেন্ট আছে দল, নেত্রী বা বঙ্গবন্ধুর জন্যে। এমপি বা মন্ত্রী হওয়ার পর দলের লোকদের সাথে উনাদের ব্যবহারেই প্রমাণ পাওয়া যায় উনারা ভবিষ্যতে কি করবেন। শুধু নিজের জন্যে, নিজের ভাইবোন, ছেলে মেয়ে, আত্মীয় স্বজনদের জন্যই সবকিছু করেছেন, দলের কর্মী দূরের কথা, জনগণের জন্যেও কিছু করেন নাই। শুধু আমি আমি করেছেন। এইসব লোকেরা সংসদের মর্যাদাও রাখেন নাই। ষোড়শ সংশোধনী কি? কেন? এইসব লোকেরা পড়েও দেখেননি। অনেকে এটা কি তা বুঝেনই নাই।
সারাদেশে আজ পোস্টার, ব্যানার, তোরণে ভরে গেছে। পোস্টারে ব্যানারে তোরণে নেতাদের, উপ নেতাদের, পাতি নেতাদের, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডের নেতাদের ছবির ভিড়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রতিটি অফিসে, দপ্তরে, শুধু বঙ্গবন্ধু প্রেমিক। কিন্তু ওই প্রেমিকদের পোস্টারে বঙ্গবন্ধুকে খুঁজতে গেলে দূরবীন লাগে।
বঙ্গবন্ধুর দল একুশ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল তখনকার কথা বাদই দিলাম। কে কি দল করেছেন বা করেন নাই, সেই কথা নাই বললাম। কিন্তু গত প্রায় ৯ বছর যাবৎ ক্ষমতা ভোগ করছেন বঙ্গবন্ধুর নামে। তারা কে কি করেছেন জাতির জনকের নামে ? এতগুলি পেশাজীবি সংগঠন। একটা সংগঠন যদি বলতো এই মাসে, বা এই সপ্তাহে বা এই দিনে আমরা কেউ ব্যবসায় লাভ নিবো না। ছাড় দিবো। বঙ্গবন্ধুর নামে ডাক্তারি ফি, উকালতির ফি, কন্সাল্টেন্সী ফি, ইঞ্জিনিয়ারিং ফি নিবো না। কেউ যদি বলতেন এই দিনে আমার দোকানের খাওয়ার বিলে ডিসকাউন্ট, দোকানের কেনাকাটায় ডিসকাউন্ট দিব। পরিবহনে অর্ধেক ভাড়া নিব। ক্লিনিকের, হোটেলের ভাড়া অর্ধেক কম। তাহলে প্রকৃতপক্ষেই কি বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করা হত না ? আমরা কেউ কি এই এতটুকু ত্যাগ বঙ্গবন্ধুর নামে করেছি?
প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। নেতা হতে চাই, বঙ্গবন্ধুর ছবি, নেতা হয়েছি বঙ্গবন্ধুর ছবি। নির্বাচন করতে চাই, প্রচার চাই, প্রমোশন চাই, পদ চাই, বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে পোস্টার। এই মাসেও নিজের প্রচারের জন্যে নিজের ছবি দিয়ে পোস্টার।
শুধু আগষ্ট মাসেই যত টাকার পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার, তোরণ করা হয়, তার তিন ভাগের একভাগও যদি বঙ্গবন্ধুর নামে গরিব মানুষদের মাঝে খরচ করা হত, তাহলে বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তি পেত। ব্যক্তি প্রচারের জন্য এই বিরাট বিশাল আড়ম্ভর না করে তার কিছুটা যদি বঙ্গবন্ধুর নামে হতো, মানুষের কল্যাণে হতো, তাহলেই সার্থক হতো ১৫ আগষ্ট। এটাই হতো প্রকৃত শোক।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় ছাত্রলীগ, সুনামগঞ্জ জেলা শাখা ও সাবেক যুগ্ম আহবায়ক, সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগ।


