যুবলীগ নেতা খুনের জের/ ছাতকের রাজনীতি উত্তপ্ত

এমপি মানিক ও দলীয় নেতা শামীম চৌধুরী’র পক্ষে পাল্টাপাল্টি মামলা
বিশেষ প্রতিনিধি
ছাতকের রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে। যুবলীগ নেতা লায়েক মিয়া খুনের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের হওয়ায় উত্তেজনা বেড়েছে। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক এবং আওয়ামী লীগ নেতা শামীম চৌধুরী কে আসামী করে বুধবার আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। বিচারক মামলা দুটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে, খুন এবং পরস্পরকে দোষারোপ করে দেওয়া নানা কর্মসূচি নিয়ে ছাতক আওয়ামী লীগের দুইপক্ষ এখন মারমুখী অবস্থানে রয়েছে।
ছাতক- দোয়ারা আওয়ামী লীগ বহুদিন ধরেই দ্বিধাবিভক্ত। দলের একাংশের নেতা মুহিবুর রহমান মানিক এবং অপরাংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী ও তার ভাই শামীম চৌধুরী। স্থানীয় নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচন দলের প্রার্থীর প্রধান প্রতিপক্ষ এখানে দলীয় নেতা কর্মীরাই।
ছাতক পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ডে বিগত চারটি পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন ছাতক পৌরসভার বর্তমান প্যানেল মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা তাপস চৌধুরী ও যুবলীগ নেতা লায়েক মিয়া।
বিগত পৌর নির্বাচনের আগে তাপস ও লায়েক দুজনেই বলয় পরিবর্তন করার কাহিনী ছাতকে আলোচনার বিষয়। চার বারের কাউন্সিলর শহরের ম-লীভোগের কালীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা তাপস চৌধুরী ছাতকের রাজনীতিতে আবুল কালাম চৌধুরী ও শামীম চৌধুরী’র ঘনিষ্টজন হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, ছাতক উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি ম-লীভোগের জঙ্গলিগড় এলাকার বাসিন্দা লায়েক মিয়া তিনবার পৌর নির্বাচনে মুহিবুর রহমান মানিকের কর্মী হিসেবেই কাউন্সিলর পদে লড়েছেন তাপসের বিরুদ্ধে। প্রতিবারই তাপসের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন লায়েক। সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি’র নির্বাচনে এমপি মানিকের প্রিয়জন হিসেবে জয় পেয়েছেন তাপস, লায়েক হেরেছেন শামীম চৌধুরী’র সমর্থক হিসেবে।
সম্প্রতি, ওই ওয়ার্ডে আলোচনা রয়েছে তাপস চৌধুরী কাউন্সিলর পদে আর লড়ছেন না। তার হয়ে নির্বাচন করবেন লায়েকের স্থানীয় প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত আব্দুল কদ্দুছ শিপলু। শিপলু ম-লিভোগ জঙ্গলিগড় এলাকার তাজউদ্দিন আহমদের ছেলে।
স্থানীয় রাজনীতিতে শিপলু ও লায়েক দুই বলয়ের অন্যতম কর্মী হওয়ায় এলাকায় দুজনের আধিপত্যের লড়াই আছে বহুদিন ধরেই।
লায়েক ছাতকের সবচেয়ে বড় খেওয়াঘাটের সাব ইজারাদার। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টায় ওই ঘাটেই প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হন লায়েক। ঘটনার সময় প্রতিপক্ষের তিন তরুণকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন স্থানীয় অনেকেই। ঘটনার পর শিপলু’র ম-লীভোগের বাড়িতে হামলা এবং অগ্নি সংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। পরে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। ঘটনার পর শিপলুকে প্রধান আসামী এবং তাপস চৌধুরী ও এমপি মানিকের ভাতিজা তানভির রহমানসহ ১৮ জনকে আসামী করে লায়েক খুনের মামলা দায়ের করেন নিহতের ভাই আজিজুল ইসলাম।
এরপর থেকেই দুই পক্ষে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলনসহ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচী চলছে।
বুধবার ছাতক -দোয়ারার চার বারের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক ও ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী শামীম আহমদ চৌধুরী’র বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। সুনামগঞ্জ আদালতের ছাতক কোর্টের সিনিয়র জুডিসিলাল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাং হেলাল উদ্দীনের আদালতে মামলা দুটি দায়ের হয়।
এমপি মুহিবুর রহমান মানিকসহ ৪২ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছেন কামরুল ইসলাম কাজল নামের এক ব্যক্তি। তিনি ছাতক শহরের মন্ডলীভোগ এলাকার বাসিন্দা। এই মামলায় ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, এমপি মানিকের ভাই মুজিবুর রহমান, আকে ভাই ইউপি চেয়ারম্যান বিলালসহ ৪২ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। অপরদিকে ছাতকের আওয়ামীলীগ নেতা শামীম আহমদ চৌধুরীসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বাদী হয়েছেন একই এলাকার পারভীন বেগম। এই মামলায় শামীম চৌধুরী’র ভাই শাহীন চৌধুরী, ইউপি চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন সায়েলকে বিবাদী করা হয়।
আদালতের বিচারক মুহাং হেলাল উদ্দীন দুটি মামলাই তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বিচারক আদেশে লেখেন, নালিশা দরখাস্ত পর্যালোচনা ও নালিশকারীর হলফান্তে জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হলো। সার্বিক পর্যালোচনায় নালিশে বর্ণিত বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন (সাক্ষীদের জবানবন্দি ও বন্ডসহ) দাখিলের জন্য পুলিশ সুপার, পিবিআই, সিলেটকে নির্দেশ দেওয়া হলো।
জাতীয় নির্বাচনের এক বছর আগে ছাতক আওয়ামী লীগের এমন মারমুখী অবস্থানের বিষয়ে এমপি মুহিবুর রহমান মানিক বললেন, আমার অনেক বয়স হয়েছে। ছাতক- দোয়ারায় আওয়ামী লীগের কাউকেই আমি প্রতিপক্ষ মনে করি না। লায়েকের খুনের বিচার আমরা সকলেই চাই। শিপলু’র মাও খুনের বিচার চেয়েছেন। ১০ বছরের সাজা ভোগ করে বের হওয়া এক ব্যক্তিকে দিয়ে আমার নামে এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানসহ দলের প্রথম সারির সকল নেতার নামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের মামলা হয়েছে। এসব কাজ দলের দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য, দলকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র। আমি দলের সকল পর্যায়ের কর্মীদের এই সময়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই। তদন্ত সাপেক্ষে লায়েকের খুনীর দৃষ্টামূলক শাস্তির দাবিও জানাই।
আওয়ামী লীগ নেতা ও এই আসনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী শামীম আহমদ চৌধুরী বললেন, এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের নির্দেশেই তাপস, তানভির, শিপলু ও আলাউদ্দিনসহ জামায়াত ও বিএনপি কর্মীরা লায়েককে খুন করেছে। এর আগে ছাত্র লীগের মাসুদ ও আওয়ামী লীগ নেতা ফারুককেও এরা খুন করেছে। আওয়ামী লীগকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এসব জনপ্রিয় নেতাদের খুন করা হয়েছে। ছাতকের আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা এদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। লায়েকের জানাজা এবং পরবর্তী সময়ে মানববন্ধনই প্রমাণ করেছে লায়েক কত জনপ্রিয় ছিল।