স্টাফ রিপোর্টার
অবহেলিত জনগোষ্ঠীর আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য সরকার ভাতা কার্যক্রম চালু করে। বয়স্ক ভাতা, দুঃস্থ মহিলা ভাতা, বিধাব ভাতা, প্রতিবন্ধী প্রভৃতি ভাতা প্রদানের মাধ্যমে সরকার দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে কাজ করছে। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী হওয়ার শতভাগ যোগ্য, অর্থাৎ যারা ভাতা পাওয়ার সামর্থ্য রাখে, এদের অনেকে এখনও ভাতার আওতার বাইরে রয়েছেন। সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার ইকবাল নগর গ্রামের মৃত আফাজ মিয়ার স্ত্রী সালমা বেগম (৫২)। ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বিধবা ভাতার আওতায় আসতে পারেন নি তিনি। দুই ছেলে সন্তানের জননী বিধবা সালমা বেগম অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। কাজ না পেলে খাওয়া দাওয়া অনিশ্চিত তার।
বিধবা সালমা বেগম বললেন, ১৬ বছর হয় আমার স্বামী ছোট্ট দুই ছেলে সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন। তখন থেকেই আমি বাচ্চা কাচ্চা লইয়া কষ্টে দিনাতিপাত করছি। অন্যের বাসায় কাজ করি, যা পাই তা দিয়ে সংসার চালাচ্ছি। খেয়ে না খেয়ে দিনগুনতে হচ্ছে। এদিকে লোকমুখে শুনতে পেলাম, মেম্বারের মাধ্যমে বিধবা ভাতা হয়। আমি মেম্বারের সাথে যোগাযোগ করি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ১৬ বছর হয়ে গেল আজ পর্যন্ত আমার কোনো ভাতা হয়নি। সরকারি কিচ্ছু পাই নি। গেল বন্যায় আমার থাকার ঘরটি ভেঙে যায়। আমি ছেলেদের নিয়ে পাশের সাত তলা ভবনে উঠি। অনেকেই সরকারি নগদ অর্থ পেয়েছে, আমি পাইনি।
শুধু বিধবা সালমা বেগম নয়, অসংখ্য অসহায় ভাতা পাওয়ার উপযোগী ব্যক্তি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় এসব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
একই ভাবে ওয়েজখালি গ্রামের হায়দর আলী বললেন, বাবা পঙ্গু হয়ে বিছানায় থাকতে থাকতেই মারা গেলেন, ভাতা পেলেন না। এখন আমার মা বিধবা হয়েছেন। আমি একমাত্র উপার্জনকারী। কষ্ট করে পরিবার পরিজন নিয়ে দিনযাপন করছি। হঠাৎ বন্যায় থাকার ঘরটি তছনছ হয়ে যায়। দেড় মাস হয়- চিরা মুড়ি, রান্না করা খিচুড়ি খেয়ে বেঁচে আছি। সরকার নগদ অর্থ দিচ্ছে। আমি আশা করছিলাম পাব। কিন্তু আমারে এখন পর্যন্ত কোনো সাহায্য করা হয় নি। বাবা ভাতা না পেয়ে মরেছেন। মা যদি ভাতা পেতেন তবুও উপকার হত।
একই ওয়ার্ডের গনিপুর গ্রামের মৃত আব্দুল কুদ্দুসের স্ত্রী আমিরুন নেছা বললেন, বন্যায় একমাত্র থাকার ঘরটি ভেঙে গেছে। সরকারি সহায়তা পাইনি। আমার স্বামী চার বছর হয় মারা গেছেন। দৈনন্দিন কাজ করি, আর যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চালাই। কাজ না পাইলে উপোস থাকা লাগে। আমার ভাতাটা হইলেও কিছুটা উপকার হত। সরকারি সহায়তা নগদ টাকা, টিন পেলে ঘরটাও ঠিক করতে পারতাম।
গনিপুরের বাসিন্দা আব্দুল মোতালিব বললেন, আমি দুই বছর ধরে প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়েছি। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করতে পারিনি। স্ত্রী সন্তান সহ আমরা আটজন। বড় ছেলে রাজমিস্ত্রি কাজ করে সামান্য টাকা পায়, তা দিয়ে সংসার চলে না। কোনো সরকারি সহায়তা পেলে উপকার হত। লোকমুখে শুনেছি আমার মতো অনেক অচল লোক শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আসছেন, ভাতা পাচ্ছেন। আমিও ভাতা পেতে চাই।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবানগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খামতিয়র গ্রামের মৃত ফয়জুর রহমানের স্ত্রী ছফিনা বেগম (৫৫) বললেন, তিন বছর হয় স্বামী মারা গেছেন। তখন থেকেই আমি অন্যের বাড়িতে কাজ করি। সাথে আমার বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকি। বাবা নেই। মা বিধবা ভাতা পায়। আমার ভাতাটা অইলে মা ও আমি মিলে চলতে পারতাম।
একই এলাকার মৃত সাজিদুল ইসলামের স্ত্রী রাজিয়া বেগম বললেন, আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর এক মেয়েকে নিয়ে অন্যের ঘরে কাম কাজ করে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। মেয়েটার বয়সও চৌদ্দ বছর হয়েছে। গেল বন্যায় থাকার ঘরটি বিধ্বস্ত হয়েছে। কোনো সহায়তা পাইছি না। বিধবা হয়েছি চার বছর হয়। ভাতাও পাই না।
পৌর শহরের ৯ নং ওয়ার্ডের গনিপুর গ্রামের সমাজসেবক আফাজ উদ্দিন জানান, সরকার সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় অসহায় নারী পুরুষদের বিভিন্নভাবে ভাতা দিচ্ছেন। প্রকৃত ভাতাভোগী অনেকেই সেই সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গনিপুর গ্রামের বিধবা আমিরুন নেছা চার বছর হয় স্বামী হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন- তার ভাতা হয়নি। এমন অসংখ্য অসহায় নারী পুরুষ ভাতা পাচ্ছেন না। আমি কর্তৃপক্ষের অনুরোধ করছি, যেন প্রকৃত ভাতাভোগীদের ভাতার আওতায় নিয়ে আসেন।
সুনামগঞ্জের শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহিনুর আলম জানান, গেল দুই বছর ধরে বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতা সরকার দে ননি। আবার যখন বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতা চালু করা হবে তখন আমরা তাদেরকে অগ্রাধিকার দেব।
তিনি বলেন, ভাতাভোগীদের কেউ মারা গেলে প্রতিস্থাপন করে নতুনদের ভাতার আওতায় আনা হয়। যদি কেউ দীর্ঘদিন ধরে ভাতা থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাহলে তাদেরকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।


