জগন্নাথপুরে নববিবাহিত এক বঁধুর আত্মহত্যাজনিত করুণ মৃত্যুর একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে গতকালের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। উপজেলার পাটকুড়া এলাকার বাসিন্দা ওই নববঁধুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে গত শনিবার। আত্মহননকারী নারী চম্পা রানী দাস পাটকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মৃদুল চন্দ্র সরকারের নববিবাহিত স্ত্রী। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবরণ থেকে জানা যায়, শনিবার স্ত্রী চম্পাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে বিদ্যালয়ে চলে যান মৃদুল। বিকেলে বাড়ি এসে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত স্ত্রীর লাশ দেখতে পান তিনি। মৃদুল ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও নিহত নারীর ভাই নিহার সরকার দাবি করেছেন যৌতুকের কারণে তার বোনকে খুন করা হয়েছে। নিহারের ভাষ্য অনুসারে জায়গা ক্রয়ের জন্য ১০ লাখ টাকা এনে দিতে স্ত্রীর উপর চাপ দিচ্ছিলেন স্বামী মৃদুল। মৃদুলকে ইতোমধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন নিহার। নিহার তার বোনের মৃত্যুর জন্য ভগ্নিপতি মৃদুলসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
চম্পা আত্মহত্যা করুন কিংবা তাকে খুন করা হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তার স্বামী মৃদুলের সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, সংবাদ অনুসারে তিনি স্ত্রীকে তালাবদ্ধ অবস্থায় রেখে বিদ্যালয়ে গমন করেন। কেন তিনি নিজের স্ত্রীকে ঘরে তালা মেরে রেখে যাবেন? এই একটি কারণই মৃদুলকে সন্দেহ করার জন্য যথেষ্ট। তাদের বিয়ে হয়েছে গত অক্টোবর মাসে। অর্থাৎ বিয়ের ৬ মাসও পেরোয়নি। মধুচন্দ্রিমার মেজাজেই এই দম্পতির বসবাস করার কথা এখন। কিন্ত্র এর পরিবর্তে এ সময়ের মধ্যে কী এমন হল যে, তাকে ঘরে তালা মেরে যেতে হয় আর চম্পাই বা কেন জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠলেন? চম্পার ভাই বর্ণিত যৌতুককাণ্ড আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। যৌতুকের কারণে স্ত্রীকে নির্যাতন করা এবং পরিনামে নির্যাতিত নারীর আত্মহননের পথ বেছে নেয়ার ঘটনা আমাদের সমাজে নেহায়েৎ কম কিছু দেখা যায় না। অর্থাৎ চম্পাকে যদি খুন করা নাও হয়ে থাকে তবু এই আত্মহননের পিছনে স্বামী মৃদুলের মদদ কম নয় বলেই অনুমান করা যেতে পারে। মূল কারণটি পুলিশ খোঁজে বের করবেন। তদন্ত শেষে চম্পার মৃত্যুরহস্য উদঘাটিত হবে। ইতোমধ্যে চম্পার স্বামীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তার জবানীতেও ভিতরের আরও খবর বেরিয়ে আসবে।
চম্পার আত্মহত্যা কিংবা খুন যাই বলি না কেন, এই ঘটনা আমাদের সামনে নতুন করে সমাজে বিদ্যমান কিছু অমানবিক বিষয় তোলে এনেছে। নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের মনোভাব কী সেটি বুঝা যায় স্ত্রীকে তালাবদ্ধ করে স্বামীর বাইরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। নারীরা অনেক এগিয়েছে সত্য কিন্তু এসব অগ্রগতি সমাজের মূল ে¯্রাতে এখনও সেরকম ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়নি। যৌতুক আরেক ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি এতোটাই নিরব ঘাতক যে অনেক সময় এর বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া বাইরে প্রকাশ হয় না। ভূক্তভোগীরা তথাকথিত সামাজিক লজ্জার ভয়ে ঘটনাগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করেন না। চম্পার মৃত্যুর পর তার ভাই বিষয়টি সামনে আনলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে তারা মৃদুলের ১০ লাখ টাকা দাবির প্রেক্ষিতে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়েও ফেলেছেন। চম্পার মৃত্যু না হলে হয়তো এই ঘটনাটিও প্রকাশ পেত না। কী নির্মম আমাদের নারী জীবন। নারীর প্রতি সাংঘাতিক অমানবিক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ কোটি উপদেশ শোনে থাকি। কত সংগঠন আছে এসব নিয়ে কাজ করার। কিন্তু আসল অবস্থা কী তা দেখিয়ে দিলেন ভাগ্যবিড়ম্বিত নারী চম্পা।
চম্পাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। একটি অমূল্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল মর্মন্তুদ নৃসংশতার মধ্য দিয়ে। এখন যদি চম্পার আত্মহত্যা বা খুনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিত করা যায় তাহলে অন্তত কিছুটা শান্ত্বনা পাওয়া যাবে যে, ক্রমাগত নারী নির্যাতনের মধ্যেও রাষ্ট্র নির্বিকার নয়। রাষ্ট্র শক্তভাবেই এসব অমানবিকতা নির্মূলে প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ।

