রক্তবর্ণা শরৎশশী

হেমন্ত দত্ত পুরকায়স্থ
মোঘল আমলে সিলেট জেলার প্রতাপশালী জমিদার লক্ষ্মীকান্ত দাসের উত্তরপুরুষ মুনশি সর্বানন্দ দাস স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পাঁচগাঁওয়ের জমিদার বাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী শরৎশশী এখানে রক্তবর্ণা। সময়ের হাত ধরে এই ঐতিহাসিক পূজা এ বার পা রাখতে চলেছে ৩০৮ বছরে। পাঁচগাঁওয়ের জমিদার বাড়ির কয়েকশ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহাসিক পূজাকে ঘিরে জড়িয়ে রয়েছে নানা লৌকিক-অলৌকিক আখ্যান, ঐতিহ্য আর নষ্টালজিয়া।  
লোকশ্রুতিতে রয়েছে মোঘল আমলে গোড়াপত্তন হওয়া এই জমিদার বাড়ির দেহলিপ্রান্তে দেবী দুর্গা নিজে থেকেই বাঁধা পড়ে রয়েছেন। পাঁচগাঁও সিলেট জেলার ইটা পরগনার একটি অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু জনপদ। ইংরেজ শাসনকাল থেকেই গ্রামটির নাম ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভারতবর্ষে। শিল্প, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার দিক থেকেও পাঁচগাঁও ছিল সবার আগে। প্রতাপশালী জমিদার লক্ষ্মীকান্ত দাস মোঘল বাদশাহের আমলে দক্ষিণ ভারত থেকে এসে বঙ্গদেশের সুবেদারের কাছ থেকে ভূমি সনদ পেয়ে পাঁচগাঁও এর তাঁর নতুন জমিদারির গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে জমিদার লক্ষ্মীকান্ত দাসের উত্তরসূরি মুনশি সর্বানন্দ দাস অসমের কামাখ্যার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পান। সর্বানন্দ দাস ছিলেন খুবই ধর্মপ্রাণ মানুষ। অসমে থাকায় সময়ে তিনি দেবী তীর্থ কামাখ্যায় নিয়মিত সাধন-ভজন করতেন। সে আজ প্রায় ৩০৭ বছর আগের কথা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ওই বছরের আশি^ন মাসের শুক্লপক্ষে সর্বানন্দ তার ভদ্রাসন পাঁচগাঁয়ে ছুটি কাটাতে যান। অনেকদিন পর বাড়ি গিয়ে তাঁর আনন্দ ফূর্তি করে কাটানোরই কথা, কিন্তু বাড়ির সবাই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, জমিদার বাড়ির ঝুল বারান্দায় একা একা চুপ করে বসে থাকেন তিনি। সর্বানন্দের মনোকষ্টের কারণ ছিলেন দেবী কামাখ্যা। পূজোর তো আর মাত্র ক’দিন বাকি এবং এই ক’দিন পাঁচগাঁওয়েই থাকতে হবে। তার মানে দেবী কামাখ্যার শ্রীচরণে পূজোর দিনগুলোতে আর অঞ্জলী দেওয়া হবে না।  
পাঁচগাঁও যাওয়ার দু’দিন পর ধর্মপ্রাণ সর্বানন্দ স্বপ্নে দেবী দুর্গার দর্শন পান। রক্তবসনা আর রক্তবর্ণা এক দিব্যদেহী দেবী। সূর্যোজ্যোতির মতোই তিনি জ্যোতির্ময়ী। স্বপ্নে সিংহবাহনা রক্তবর্ণা দেবী দুর্গাকে দর্শন করে এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে মনটা ভরে উঠে তাঁর। দেবী ভগবতী সর্বানন্দকে পাঁচগাঁওয়ে জমিদার বাড়িতে পূজো করার নির্দেশ দেন। প্রতিমার রূপ গাত্রবর্ণ এমনকী পূজোর আচার অনুষ্ঠান নিয়েও ভগবতী তাঁকে নির্দেশ দেন। আচমকাই ঘুম ভেঙে যায় সর্বানন্দের।  
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসেন। সত্যিই কি তিনি স্বপ্নে দেবী দুর্গাকে দর্শন করেছেন? এসব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো তাঁর। বদ্ধ শয়ন কক্ষ তখন জুঁই আর শিউলি ফুলের সুবাসে ম ম করছে………
ভোরে ঘুম থেকে উঠে জমিদার বাড়ির পূর্বপ্রান্তে বিশাল দিঘির পাড়ে বাঁধানো সিঁড়িতে জলে পা ডুবিয়ে অন্য মনস্কভাবে বসে ছিলেন সর্বানন্দ। ভোর রাতে দেখা স্বপ্নের ঘোরটা তখনও কাটেনি। শরৎ প্রভাতের সিক্ত বাতাস আর সদ্য ফোটা শিশির ভেজা শিউলির গন্ধ তাঁর দেহ মনে শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। হঠাৎই এক স্বর্গীয়, অপার্থিব আনন্দে তাঁর মনটা ভরে যায়। ঠিক তখনই দিঘির পূর্বপ্রান্ত থেকে একজন মধ্যবয়স্ক লোককে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখেন। লোকটি যতই সর্বানন্দের দিকে এগিয়ে আসছিলেন ততই তাঁর মন এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠছিল। পরিচয়পর্বে সর্বানন্দ জানতে পারেন লোকটি তাঁর গ্রামেরই একজন মৃৎশিল্পী অর্থাৎ কুমোর। তিনি সর্বানন্দকে হাত জোর করে বলেন, ‘কর্তা, এ বার আমরা আপনার এই জমিদার বাড়িতে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরী করে তাঁর আরাধনা করতে চাই……আপনি যদি আজ্ঞা দেন……’। লোকটা বলে কী? এ তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপর। এতক্ষণ তিনি তো এ নিয়েই চিন্তা করছিলেন। মুহূর্তে গত রাতে স্বপ্নে দেখা দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী আবয়ব সর্বানন্দের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তিনি তখনই সেই মৃৎ শিল্পীকে দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী রূপ বর্ণনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এবং পূজো করার অনুমতি দিলেন। কিন্তু সেই মৃৎশিল্পী সর্বানন্দের স্বপ্নে দেখা দেবী মূর্তি গড়তে রাজি হলে না। তাঁর বক্তব্য, মূর্তি গড়বেন তিনি। অতএব তাঁর মতো করেই তিনি দেবী দুর্গার আবয়ব গড়বেন। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে একটু কথা কাটাকাটিও হয়। সে দিন দুপুর পর্যন্ত এ সমস্যার কোন সমাধান হয়নি।
মধ্যাহ্নভোজের পর একটি আরাম কেদারায় বসে বিশ্রাম নিতে নিতে সর্বানন্দ ভাবলেনÑস্ব্প্ন দেখছেন তিনি, প্রতিমা তৈরির ব্যয়ভারও বহন করতে হতে তাঁকে, তাহলে কুমোরের ব্যাটা কেন বাধা দিচ্ছে কেন বারবার? সবই কি দেবী মহামায়ার লীলা? এ দিকে পূজোর তো আর মাত্র ক’টা দিন বাকী……। এ অঞ্চলে তো কেউ প্রতিমা গড়ে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন না। তাই অন্য মৃৎ শিল্পী পাওয়া খুবই কঠিন…… তা হলে? যাই হোক শেষ পর্যন্ত দেবী মহামায়ার লীলায় দু’পক্ষই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে বাধ্য হলেন। জমিদার বাড়ির অস্থায়ী দালানকোঠায় একটু একটু করে গড়ে উঠতে লাগল শরৎশশীর মৃন্ময়ী আবয়ব।    
মহালয়ার দিন দেবী দুর্গার গায়ের রং নিয়ে আবার সর্বানন্দ এবং সেই মৃৎশিল্পীর মধ্যে মতবিরোধের সুষ্টি হয়। দেবীর গায়ের রঙ কি হবে? সর্বানন্দের এ প্রশ্নে সেই মৃৎশিল্পীর সাফ জবাব, ‘সেটা আপনাকে এক্ষুণি বলব কেন? সেটা দেবীর গায়ে রঙের প্রলেপ দেওয়ার সময়ই দেখতে পাবেন? ’ সর্বানন্দ হাজার হলেও জমিদার বংশের সন্তান। তাঁর ধমনীতে বয়ে চলেছে নীল রক্তের ধারা। তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চিৎকার করে বললেন, ‘না, দেবীর গায়ের রঙ হবে রক্তবর্ণ……এবং আপনাকে সেই রঙই করতে হবে।’ আশ্চর্য হয়ে সেই মৃৎশিল্পী সবিনয়ে সর্বানন্দকে জানান,‘হুজুর, আমিও তো দেবী দুর্গার গায়ের রঙ রক্তবর্ণই ভেবে রেখেছি।’ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় গোটা বঙ্গদেশে হাতে গোনা যে ক’টা দ;ুর্গা পূজা হতো, সে সব প্রতিমার গায়ের রঙ ছিল অতসী ফুলের মতো হলুদ। কিন্তু রক্তবর্ণ প্রতিমা গড়ায় বাধ সাধল তৎকালীন কট্টর ব্রাহ্মণ সমাজ। তাঁরা রক্তবর্ণের দেবীকে আবাহন করতে অসম্মত হলেন এবং সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘রক্তবর্ণের দেবী প্রতিমা শাস্ত্রবহির্ভূত। অথৈ জলে পড়লেন সর্বানন্দ……। শেষ পর্যন্ত পাশর্^বর্তী গ্রামের কূল প-িত রক্তবর্ণা দেবী দুর্গাকে আবাহন করতে সম্মত হলেন।  
সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ ৭১ এর অন্যতম সদস্য জমিদার লক্ষ্মীকান্তদাসের উত্তরপুরুষ তথা সিলেট শহরের বিশিষ্ট আইনজীবী মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু গোপাল দাস তাঁর বাড়ির দুর্গাপূজার ইতিহাস গল্পচ্ছলে এভাবেই বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ‘সেই শুরু। দেবীর স্বপাদেশ অনুযায়ী দশহাজার একশত একটি বিল্বপত্র ও দু’মন ঘি দিয়ে অষ্টমীর পূজা সম্পন্ন হয়। মূর্তি গড়ে দুর্গাপূজা করাটা সেই সময়ে বঙ্গদেশের কয়েকজন বিত্তবান লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমাদের পরিবারের এই পূজা লাল দূর্গা নামেই বহুল পরিচিত।’
মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু গোপাল বাবু বলেন, ‘১৯৭১-এ অর্থাৎ স্বাধীনতা যুদ্ধের বছরে এই পূজা হয়নি। তবে ঐ অস্থির সময়ে আমরা ভারতের করিমগঞ্জে চলে আসি এবং এখানেই শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য ঘটপূজা করা হয়।’
পাঁচগাঁয়ের বন্ধু গোপাল বাবুদের বাড়ির ঐতিহাসিক দুর্গাপূজায় প্রতিবছর লক্ষাধিক ভক্ত সমাগম ঘটে। এই পূজায় কোন চাঁদা সংগ্রহ করা হয় না বলে জানান বন্ধু গোপালবাবু। ভক্তদের প্রণামির টাকা প্রতিবছর ব্যাংকে জমা রাখা হয় এবং পরের বছর তোলা হয়।  আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের আমলে দু’মণ ঘি হোমযজ্ঞের কাজে ব্যবহার করা হত। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় কুড়ি মণ। গত বছরের পূজায় ভক্তদের দেবীদুর্গার উদ্দেশে দেওয়া কাপড়ের সংখ্যা ছিল ন’হাজার। বন্ধুগোপালবাবুর দাবি, গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে দেবী আরাধনায় প্রায় ৮৭ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিল। এ বছর পূজার বাজেট কোটির ঘর ছুঁয়ে ফেলবে বলে তাঁর ধারণা।  
বন্ধুগোপালবাবু জানান, ‘আমাদের বাড়ির রক্তবর্ণা দেবীকে দর্শন করার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছে তাঁরা বলেন প্রচ- তেজময়ী দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা কঠিন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক বাঙালিই পূজার সময় দেবী দর্শনে আমাদের পাঁচগাঁওয়ের বাড়িতে আসেন। আমি নিজে ঘোর বাস্তববাদী মানুষ। অলৌকিক কোন কিছু বা বুজরুকিতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমাদের বাড়ির এই পূজাকে ঘিরে এমন কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে, বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে যার ব্যাখ্যা করতে পারিনি।
’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধেও সময় পাক সেনা ও রাজাকার বাহিনী হিন্দু নিধন যজ্ঞে মেতে উঠে। সবাই ভেবেছিল পাঁচগাঁওয়ে আর কোন হিন্দু পরিবারের চিহ্ন থাকবে না। সেনাবাহিনীর মর্টারের গোলায় বিধ্বস্ত হয় দেবী মন্দির। লুট হয়ে যায় আশি কিলো ওজনের দেবীর রুপোর মুকুট ও অন্যান্য স্বর্ণালঙ্কার। পরে কিছু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মুসলমান মানুষের সহায়তায় উদ্ধার করা হয় রুপোর ভগ্ন মুকুট। সেই ভগ্ন মুকুট ঠিক করার মতো কোন শিল্পীকে আজও পাওয়া যায়ান। অনেক উত্থান পতন পেরিয়ে বন্ধুগোপাল বাবুদের এ পূজা এ বছর ৩০৮ বছরে পা রাখবে। জনশ্রুতি অনুযায়ী দেবী যে ওই বাড়িতে চির অধিষ্ঠিতা। ভক্তদের রক্ষা করার জন্য মাতৃরূপে বিরাজিতা।