হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-০২
বৈশাখের প্রথম দিকে তপ্ত রোদের মধ্যে আমাদের গ্রামের পশ্চিম মাথায় আচম্ভীত-দেবীর গাছতলের ছায়ায় বসে ভাবছি কিশোরগঞ্জ শরারচরের সর্বহারা মানুষদের দুর্ভাগ্যের কথা। আর মনে মনে পণ করছি হানাদার ও তাদের দুসরদের চরম শাস্তি কিভাবে দেওয়া যায়। গ্রামের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছেন। মায়ের বাধার কারণে আর মন ঠিক করতে পারছি না। ঠিক এই সময়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী কিত্তাগাঁও গ্রামের জগৎ দাস, মহেন্দ্র দাস ও হরিমোহন দাস এসে হাজির হয় এবং আমাকে বলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য। তারা বাড়ি থেকে বিদায় হয়ে একেবারে চলে এসেছে। আমি বললাম মা’র মত না থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। জগৎ দা বললÑ তার মাও নাকি মত দেননি, তাই না বলেই চলে এসেছে। তার মাকে ধানের গোলায় ওঠিয়ে খলা থেকে ধান আনতেছে বলে পালিয়েছে। আমি বললাম, দুপুরের ভাত বেড়ে মা বসে থাকুক, চলো মুক্তিযুদ্ধেই যাত্রা করি। সকল মায়েরাই সন্তানের মঙ্গল কামনা করবেন। হাফ-পেন্ট, লুঙি পরা সেন্ডেল পায়ে ওখান থেকে তাদের সাথে রওয়ানা দিলাম। তবে আমাদের কাছে খবর আছে, জামালগঞ্জের দালাল লাল মিয়ার সাঙ্গ-পাঙ্গরা নাকি মুক্তিগামী মানুষদের উপর অত্যাচার করে। সে সময়ে রাজাকার শব্দটি আবিষ্কার হয়নি। আমি অনেক বার ফেইসবুকে হানাদারদের দুসরদেরকে রাজাকার বলে সম্বোধন করেছি। সম্ভব মে মাসের প্রথম দিকে দোসরদের গায়ে রাজাকারের তকমা লাগানো হয়েছে। আমরা কুখ্যাত দোসরদের হাত থেকে বাচঁতে সদর রাস্তা বাদ দিয়ে হাওর সোজা হাটঁতে শুরু করলাম। পাকা ধানের ক্ষেতের আইল ও কাটা ধানের ডেডা ভেঙ্গে চলায় পা একবারে জ¦ালাপালা। সকালে বোরো সিদ্ধ ভাতের পান্তা নাস্তা হাঁটার চোটে মিলিয়ে গেছে, তাই পেটের ক্ষুধায় জামালগঞ্জের নয় মৌজার রাজাপুর গ্রামের যাদব সরকারের বাড়িতে ওঠি। উক্ত গ্রামের কয়েকটি পরিবার বাদে সবাই মইলাম শরণার্থী শিবিরে চলে গেছে। জন শূন্যতায় গ্রামটি খাঁ খাঁ করছে। যাদব সরকারের বাড়িতে দু’মুঠো খেয়েই হাওর সোজা হাঁটা শুরু করলাম। পচা শামুক ও ঝিনুকে পা কেটে নাস্তানাবুদ। জামালগঞ্জের নায়াহালট গ্রামের পশ্চিমে চামার বাড়িতে গিয়ে ওঠলাম, সূর্যও অস্ত হয়ে গেছে। সুরমা নদী পার হতে বিশ টাকা দিয়ে একটি ছোট্ট নৌকা ঠিক করলাম। রাতে বেহেলী ইউপির রাজাপুর থাকার ইচ্ছা। সাথের তিন জন নৌকায় ওঠতেই এক ঝলকা পানি ওঠে গেল। ডুবে যাওয়ার ভয়ে আমি আর নৌকায় ওঠলাম না। মাঝিকে বললাম ওদেরকে ওপাড়ে পৌঁছে দিয়ে আমাকে পরে পার করতে। মাঝি বলল আমাকে পার করলে আরো পাঁচ টাকা দিতে হবে। আমার সাথের সাথীরা ওপারে ওঠতেই গোধূলির আবচা আঁধার দেখতে পাইÑ তিন জন লোক আমার সাথী তিনজন কে নিয়ে নদীর পাড় দিয়ে পশ্চিম দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। আমার দিকে আর ফিরেও তাকালো না। মাঝি এপাড়ে এসে আমাকে নৌকায় ওঠতে বললে আমি বললাম, আমার সাথের ওরা কোথায় গেল? মাঝি বলল, ওদেরকে লাল মিয়ার লোকেরা ধরে নিয়ে গেছে। যে লাল মিয়া বাহিনীর ভয়ে সদর রাস্তায় না এসে হাওর ভেঙ্গে আসলাম, সেই বাহিনীর হাতেই সাথীরা ধরা পরল। একে অদৃষ্টের লিখন বলা ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। মাঝির কথা শুনে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরল। আমি এক দৌঁড়ে প্রায় পাঁচ মাইল অতিক্রম করে উজ্জলপুর গ্রামের পাশে সুরমা নদীতে নামলাম। হাত দিয়ে চৌলিয়ে মনে হয় এক কলসি পানি খেলাম। অপরিচিত গ্রামে দুরাচারদের ভয়ে কারো বাড়িতে না ওঠে সাঁতরিয়ে নদী পার হয়ে ভোরে পাহাড় ঘেষা চিনাকান্দি গ্রামে হরিদাসের বাড়িতে গিয়ে ওঠলাম। সুঠামদেহী জগৎ দা ভালো ফুটবলার ছিলেন। হরিমোহন দাস উত্তম যাত্রাভিনেতা ও মহেন্দ্র দাসের শ^শুড় বাড়ি আমাদের গ্রামে। তার স্ত্রী ছয় মাসের অন্তসত্তা ছিল। শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পর এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। নাম বাচ্চু। সে বর্তমানে রফিনগর ইউপির গাজিয়ার গাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অনেক পরে স্বাধীন বাংলাদেশে লাল মিয়াকে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে দেখেছি। তার বিরুদ্ধে কিছু বললে তো আমার জিহ্বা কেটে দেওয়ার মতো লোক জামালগঞ্জে অভাব নাই। মুক্তিযোদ্ধার প্রভাব খাটাবো, উল্টো আমাকে রাজাকার বানিয়ে ছাড়ত। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বর্তমানে যে সহানুভূতি দেখাচ্ছেন, পঁচিশ বছর আগে যদি তেমনটা হতো তবে কুখ্যাত রাজাকার লাল মিয়ার একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়তাম। আজ বুকে অসংখ্য জ¦ালা পোষণ করে দিন কাটিয়ে যাচ্ছি। মৃত্যুই পারে আমার জ¦ালা যন্ত্রণার উপশম করতে। তবে শান্তনা এই টুকু রণাঙ্গনে লাল মিয়া রাজাকারের মতো হাজার হাজার রাজাকারকে শায়েস্তা করতে পেরেছি। মৃত্যুর আগে এই প্রশান্তিটুকু বুকে নিয়ে মরতে পারব। এক জীবনে সবার সব আশা পূর্ণ হয় না। (চলবে)


