রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ০৫

আটাশ দিন ট্রেনিং মোটামোটি আনন্দ পরিবেশেই কাঠিয়ে দিলাম। সবাই দেশ মাতৃকার টানে বিভোর। সবার মন যুদ্ধে যেতে আনছান করছে। একে অন্যের সাথে দ্বিধা দ্বন্ধের রেশ নেই। সবাই যেন এক মায়ের সন্তান। বিপদেই মানুষকে এক কাতারে জড়ো করতে পারে। হিংসা ঘৃণা ভুলিয়ে বন্ধুত্তের সেতু বন্ধন রচনা করে। উনত্রিশ দিনের দিন আমাদের পঞ্চম ব্যাচকে শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে পোষ্টিং দেওয়া হয়। আমরা পাচঁ জন রাজেন্দ্র দাস, সোনা মুনি দাস, মোহন্ত রায় ও দিপঙ্কর রায়কে তামা বিল সাব সেক্টরে পোষ্টিং দেয় হয়তো মোহন্ত নাটকের শাস্তি হিসাবে। আর আমার পরিচিত অন্যদেরকে বালাট সেক্টরে সাব সেক্টর বড়ছড়ায় পোষ্টিং দেওয়া হয়। জগৎ জ্যোতি দাস এর বলিষ্ট নেতৃত্ব আমাদেরকে সত্যিই আকৃষ্ট করেছিল। তিনি বড়ছড়ায় চলে গেলেন, আমরা আর সঙ্গী হতে পারলাম না। তবে ঐ দিন ভুল তথ্যে জেনেছি তিনি নাকি বালাট পোষ্টিং হয়েছেন। তাই বালাটে যাওয়ার মনের টানটা রয়েই গেল। মনে কষ্ট থাকলেও করার কিছু নেই। আর দুঃখ কষ্ট প্রায় সাধ্যের আওতায় এসেগেছে। আমাদের ট্রেনিংয়ের দু একদিন বাকি থাকতেই ষষ্ঠ ব্যাচের লোকেরা ট্রেনিং সেন্টারে এসে পৌঁেছ গেছে। তাদের মধ্যে আমার এলাকার দুই জন বলল আমাদের পুরো এলাকা রটেগেছে ট্রেনিংয়ে আসার পথে আমরা চার জনকেই এক সাথে রাজাকাররা ধরে ফেলেছে। মা বাবা ভাই-বোন আতœীয় স্বজনেরা কান্নাকাটির সমাপ্তিটেনে সমাজের ধর্মাচারের চাঁপে পড়ে পারলৌকিক ক্রিয়ার ও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু দেশ ছাড়ার আকঙ্কে ঐ মুখ্য কাজটি আর হয়ে ওঠেনি। গ্রামের কেউ কেউ আবার ভারতের উদ্দ্যেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে তামাবিলে গিয়ে মনের জোরটা অনেকটা কমে গেছে। আমরা ভারতের ডাউকিতে অবস্থান নিই। তামাবিলের পুরো এলাকা পাক সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সীমান্ত পার হয়ে যোদ্ধ করা মানেই হানাদারদের খপ্পরে পরা। গেরিলা যোদ্ধের জন্য বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও বেশিক্ষণ টিকে থাকা যেত না। দৌড় যাপ দিয়ে ঢাউকি এলাকয় প্রবেশ করলেই নিরাপদ। ঢাউকি বাজারের সকল দোকনপাট বন্ধ। পাক সেনাদের মরটারের গোলা অহরহ পড়ছে। এখানে আট দশদিনের গেরিলা যোদ্ধে আমাদের অনেক হতাহত হয়েছেন। পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় দৌড়ে পালানোও কঠিন কাজ। ফাঁকে ফাঁকে জগৎ জ্যোতি দার কথাটা মনে হয়, উনার সাথে যোদ্ধা করতে মনে টানে। তামাবিলে জনব বি আর চৌধুরী ও মেজর জেনারেল সি আর দত্তের একান্ত আনুকূল্যে, বাবন টিলা ব্রিজ ভেঙ্গে দেওয়ার শর্তে আমরা পাচঁ জনকে বালাট পাঠাবেন বলে কথা দেন। হেডকোয়াটারের চৌকস চার জনকে আমাদের সাথে সংযুক্ত করেন। একজনের নাম ছিল সামছুদ্দিন অন্যদের নাম মনে করতে পারছি না। আমরা নয় জন প্রচুর বৃষ্টিতে পাহাড়ী ঝাড় জঙ্গল ভেঙ্গে প্রায় চার মাইল পাক সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হেটে ব্রিজের কাছে পৌঁছি। ব্রিজের উপর রাজাকাররা ডিউটি করছে। ব্রিজ ভেঙ্গে কেউ যাতে হায়েনাদের চলাচলের প্রতিবন্ধকাতা সৃষ্টি করতে না পারে। তৎজন্যে এই কড়াকড়ি পাহাদারের এই ব্যবস্থা। রাতের আধাঁরে অস্পষ্ট ভাবে দেখা যায় ব্রিজের
উপরে রাজাকাররা হাট চলা করছে। আমরা একটু ফাঁক বুঝেই ব্রিজের উত্তর মাথায় ডিনেমাইট এক্সপ্লোসিভ বেঁধে তার(কার্ডেক্স) টেনে টেনে নিরাপদে এসে সেপ্টিফিউজে আগুন ধরিয়ে ব্রিজ ভেঙ্গে ফেলি। পরদিন আমাদের পাচঁ জনকে গাড়িতে করে বালাট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যোগদান পত্রে দুঃসাহসিক বিরত্বের কথাটি লিখা থাকায় সেটর কমান্ডার কর্নেল মীর শৌকত সাহেব আমাদেরকে জড়িয়ে ধরে বাহবাহ দেন। আমাকে তিনি সেকসন কমান্ডারে উন্নতি করেন। তাতে মনের আনন্দটা যেন উপচে পড়ে। ভোতা রাইফেলের পরিবর্তে এসএলআর ইস্যু করা হয়। আর যাই হোক রাতের ঘুম কামাই করে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে ডিউটি করা থেকে অব্যাহত পেলাম। কমান্ডার তো কমান্ডারই হোক না যত ছোট পদ। আমার মৌলিক অভ্যাস টুটু করে গোড়ে বেড়ানো। কমান্ডারী পাওয়াতে অবাধে ঘোরার পথটা সুগম হলো। হাফ প্যান্ট গেঞ্জি পরে শরনার্থি শিবিরে গিয়ে পরিচিতদের কাছ থেকে মা বাবা ও গ্রামের মানুষদের খবর নেওয়া। শরনার্থিদের দেখভাল ভলেন্টিয়ারদের টাউট বাটপারির জন্য চড় থাপ্পুর দিয়ে শাস্তি প্রদানে মোটামোটি রাজকীয় হালচালে চলছিল। দিরাই নিতাই বাবুর(চেয়াম্যান) বাসা সেক্টর হেডকোয়াটারের পাশেই ছিল। আমি উনাকে কাকা বাবু ডাকতাম, আমাকে খুবই ¯েœহ করতেন। সময় সুযোগে উনার বাসায় মুখরোচক খাবার খেয়েছি। কখনো অস্ত্রপাতি সহ দলবল নিয়ে চিনাকান্দি গিয়েছি। রাস্তাঘাটে শরনার্থিদের কাছ থেকে লম্পটরা চাঁদা আদায় ও হয়রানি করত। চাঁদাবাজদের দমন করে শরনার্থিদের চলাচল নিশ্চত করতাম। শরনার্থীরা খুশি মনে হাত তোলে অভিবাদন জানাতেন। সেই অনুভুতিটা আজকের দিনে স্মৃতিচারণ করলে শরীরে রোগ শোকের অনেকটা উপশম হয়।