হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ০৭
জনশ্রুতি ছিল, রাজাকাররা নাকি পরস্ত্রীর গায়ে হাত দেয় না। তাই অভিনব কায়দায় যুবতীদেরকে বউয়ের সাজে সাজিয়ে রাখে। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। কার বাড়িতে কয়টা যুবতী মেয়ে আছে তা শনাক্ত করার জন্য রাজাকাররা শনাক্তকারী হিসাবে কানা দোকানদারকেও সাথে নিয়ে যায়। কানা লোকটি নয় মৌজার ঘরে ঘরে টুকরি দোকানদারী করে চষে বেড়াত। সেই জানে কার বাড়ীতে কতটি যুবতী মেয়ে আছে। কানা দোকানদারের কথা মতো রাজাকাররা ঘরে ঢুকে যুবতী মেয়ে না পেয়ে ক্ষেপে ওঠে। বাড়ির অভিভাবক জানান তার ঘরে যুবতী মেয়ে নেই। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। পরে বন্দুকের নলের তোপে কচুরিপানার তল থেকে তিনটি মেয়েকে এনে দেয়। রাজাকাররা তাতে সন্তুষ্ট নয়, তাই কানা দোকানদারের হুমকির চোটে বধূর সাজে সজ্জিত যুবতীদেরকে রান্নাঘর থেকে এনে রাজাকারদের হাতে উৎসর্গ করে। রাজাকাররা ধর্ষণের রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে লুটপাট করে চলে আসে। ঐ দিনই আক্রান্ত গ্রাম থেকে মধুসুধন দাস বাড়ি যাওয়ার পথে রাজাকাররা তাকে গুলি করে হত্যা করে। তার বাড়ি রাজাবাজ গ্রামে। আমি যখন ভাটিপাড়া হাইস্কুলে পড়ি, মধু দা তখন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলেন। সুঠামদেহী ও সৎ সাহসিকতার অধিকারী এবং ভালো গোলকিপার ছিলেন। উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীনের পরেও ঐ কুখ্যাত কানা দোকানদার নয় মৌজার ঐ আক্রান্ত গ্রামে বুক ফুলিয়ে ঘরে ঘরে দোকানদারি করেছে। তার জিনিস পত্তর খেয়ে গ্রামের কারো বদহজম হয়েছে বলে শোনা যায়নি। ঐ সময়ে বড়চড়ায় আরেকটি লোমহর্ষক ঘটনার সংবাদ পাই। ইটনা মিঠামইন ও মদন থানা এলাকার আঠারজন টকবগে যুবক ভারতে ট্রেনিং নিতে যাওয়ার পথে জামালগঞ্জের লক্ষিপুর গ্রামে রাজাকার বাহিনীর হাতে আটকা পরে। তাদেরকে বেঁধে পাট ক্ষেতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। দুর্ধর্ষ রাজাকারদের হত্যা ধর্ষণ অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জগৎজ্যোতি দাস রাজাকারদের শায়েস্তা করতে জামালগঞ্জ অপারেশন করার সিদ্ধান নেন। কিন্তু এরই মধ্যে আরেকটি সুসংবাদ আসে তাহিরপুর থানা থেকে। থানার বাঙালি ওসি শফিক সাহেব দুত মারফরত জানান যে, তিনি এতো দিন পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও পাক সেনারা যে ভাবে যুদ্ধের নামে বাঙালি হত্যায় মেতে ওঠেছে, নারী নির্যাতনকে তারা যুদ্ধ জয়ের প্রাথমিক পর্যায় মনে করেছে। রাজাকারদের আশকারা পেয়ে ধর্র্ষন লুন্টন, অগ্নিসংযোগে বিভৎসতার মাত্রাটা একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই ওসি সাহেব অনুশোচনায় মর্মাহত হয়ে একমাত্র মানবিক কারণেই মুক্তিযোদ্ধের পক্ষে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। আর তিনি মনে প্রাণে চাইছেন দেশটা অতিদ্রুত হানাদার মুক্ত হউক। তাই প্রায়শ্চিত্ত করতে তারই দায়িত্বে ন্যাস্ত তাহিরপুর থানায় অনতিবিলম্বে আক্রমণ করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা হেডকোয়ার্টারে আবেদন জানান। এবং তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগিতা করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। সেই সংবাদের ভিত্তিতেই পরদিন ভোরে তাহিরপুর আক্রমণের সিদ্ধান্ত। আমরা শেষ রাতে বড়ছড়া থেকে টেকেরঘাট নেমে এসে দেখি তিনটি নৌকার মাঝির মধ্যে একটি নৌকার মাঝি অনুপস্থিত। জগৎজ্যোতি নৌকা মাঝিদের গালাগালি করে ভোরের অপারেশনের সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে সন্ধায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। আমরা বড়ছড়ায় ফেরত এসে বিছানায় কিছু গড়াগড়ি করে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলের দিকেই আবার তাহিরপুরের দিকে রওয়ানা হই। তিনটি নৌকায় প্রায় ছত্রিশ জনের মতো জনবল নিয়ে থানার পিছন দিকে নৌকা ভিড়াই। জগৎজ্যোতি দার সাথে যুদ্ধ করার সুবিধা একটাই, তিনি সবার সামনে থেকে আক্রমণ করেন। নৌকা থেকে পাড়ে ওঠেই এক সাথে ফায়ার শুরু করি। ওসি সাহেব আমাদের পক্ষে থাকায় পাক সেনা ও রাজাকারদের আগাম প্রস্তুতি ছিল না। আমাদের আচমকা হামলায় ওরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আমরা আহত অবস্থায় একজন বিহারী হাবিলদার ও তিন জন রাজাকারদের ধরে ফেলতে সক্ষম হই। থানার সকল অস্ত্র গোলাবারুদ আমাদের কব্জায় নিয়ে আসি। আসার পথে আমাদেরই একজন, বিহারী হাবিলদারকে রাইফেল দিয়ে মাথায় আঘাত করে মেরে ফেলে। এর জন্য জগৎজ্যোতির কঠোর গালাগাল শুনতে হয়। বিহারীর লাশ পানিতে ফেলে দিয়ে তিন রাজাকারকে নিয়েই বড়ছড়ায় পৌঁছি। থানা থেকে নিয়ে আসা অস্ত্রগুলো চাইনিজ বলে ওগুলোর শব্দই আলাদা, ঐ সব অস্ত্রের শব্দ শুনেই আমরা পাক সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারি। আমরা ওই গুলো ব্যবহার করলে আমাদের অন্য কোম্পানীর মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রের শব্দের ভ্রমে আমাদেরকে পাক হানাদার মনে করবে বিধায় চাইনিজ অস্ত্র গুলি অস্ত্রাগারেই জমা থাকে। আমি শখের বশে জগৎজ্যোতি দাকে বলে অত্যাধুনিক চাইনিজ রাইফেল দিয়ে দুইটি ফাঁকা গুলি করি আর ভাবি এমন অস্ত্র আমাদের হাতে থাকলে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। (চলবে)


