হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ০৮
বড়ছাড়ায় তিন দিন বিশ্রাম নিয়ে, জগৎজ্যোতি দাশের নেতৃত্বে তিনটি নৌকায় আমরা সাইত্রিশ জন জামালগঞ্জ অভিমুখে রওয়ানা হই। সময়টা আগস্টের প্রথম দিকে। জুলাইয়ের শেষের দিকে জামালগঞ্জ পাক সেনাদের আস্তানায় মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক ভাবে হামলা করেছিল। তাতে আমাদের কয়েক জন আহত হয়েছিলেন। তবে সেই যুদ্ধে জগৎজ্যোতি দাস ছিলেন না। সেদিন পাক সেনাদের হঠাতে না পেরে নিজেরাই পিছু হটে ছিলেন। তবে এবার অস্ত্র বল বাড়িয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি। আমরা শনির হাওর ও হালির হাওর পারি দিয়ে বিকেল বেলা গোলকপুর এসে পৌঁছি। নৌকা থেকে নেমেই দেখি সুরমা নদীতে পাক সেনাদের একটি রসদবাহী লঞ্চ জামালগঞ্জের দিকে যাচ্ছে। আমরা শখের বশেই লঞ্চটি ডুবিয়ে দেই। আগ পিছ না ভেবেই লঞ্চ ডুবানোটা আমাদের একেবারে সঠিক কাজ হইনি। শত্রু পক্ষ এতে এলার্ট হয়ে যায়। তাই আমরা দুই দিন সাচনা আক্রমণের চিন্তা বাদ দিয়ে ঐ দিনই সন্ধ্যায় তাহিরপুর থানায় হিন্দু জনশূন্য গ্রাম পৈন্ডুপে গিয়ে রাত্রিযাপন করি। পরে ওখান থেকে মাঝ রাতে সাচনার উদ্দ্যেশে রওনা হই। ভোর রাতে হালির হাওর দিয়ে সাচনা চৌধুরী বাড়ির পাশে একটি বেতগড়ের ভিতরে নৌকা লাগাই। চলাচলের রাস্তা বাদ দিয়ে সাচনা গ্রামের পিছন দিয়ে পেক-কাদা ভেঙ্গে কালীবাড়ির সামনে দিয়ে সাচনা বাজারের পশ্চিম পাড়ে ওঠি। বাজারের পূর্ব পাড়ে পোস্ট অফিসে পাক সেনাদের ব্যাঙ্কার। এবং পশ্চিম পাড়েও কয়েকটি ব্যাঙ্কার। মাঝ খানে পিয়ান নদীর মুখ। পোস্ট অফিস ও হাসপাতালেরর দূরত্ব অনুমান দেড়শত গজ। গোলকপুরে লঞ্চ ডুবানোর ফলে সাচনা বাজারে পাক সেনাদের জনবল অনেক বাড়িয়ে ফেলে। আমরা হাসপাতালে আক্রমণ করতেই ওদের পাল্টা গুলি হাসপাতাল ও পোস্ট অফিসের ব্যাঙ্কার থেকে শুরু হয়। ওদের দুই দিকের গুলির তীব্রতায় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি। এরই মধ্যে আমার ভাই সিরাজুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন। ওনার লাশ নিয়ে কোনক্রমে পিছু হটি। তাও আবার জগৎজ্যোতির এলএমজির ব্রাশ ফায়ারের প্রতিরক্ষার কারণে। আসার পথে পাঁচ রাজাকারকে ধরে এনেছিলাম। ওদের মধ্যে দুই রাজাকার, আমার তিন সাথীকে ধরে ফেলতে সম্পৃক্ত ছিল। তাই এক রাজাকারকে হাত-পা বেঁধে শনির হাওরে ফেলে দেই। অন্যটাকে কিভাবে শাস্তি দিয়েছি লিখে জানাতে মনে বাঁেধ। জামালগঞ্জের রাজাকারদের কুৎসিত অপকর্মের শতভাগের এক ভাগ বর্ণনা করেছি মাত্র। পূর্ণ সত্যতা প্রকাশ করতে আমার মনের জোড় আজ আর নেই। আমরা বড়ছড়া থেকে দুই শতাধিক জামালগঞ্জের রাজাকারের তথ্য পেয়েছি। আজকের দিনে এসব তথ্য রাজনৈতিক হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। সাচনা বাজার থেকে পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে টেকেরঘাটে গিয়ে পৌঁছলাম। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা জামালগঞ্জে আর আক্রমণ করতে যাননি। আমার তিন সঙ্গীকে জামালগঞ্জের যে স্থান থেকে রাজাকাররা ধরে নিয়েছিল, সেই বেদনাসিক্ত স্থানটি প্রতি বৎসর বৈশাখ মাসে একবার গিয়ে দেখে আসি। এবং শহিদদের আত্মার শান্তি কামনা করি। ওদের আত্মীয় স্বজনদের হয়তো অবিরাম কান্নাকাটি করে চোখের জল শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আমি হতভাগা আজও তাদের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। ওদের স্মৃতি মন্থন করার জন্যই দিরাই ছেড়ে জামালগঞ্জে আসি। আমরা বড়ছড়ায় এসে দেখি বিএসএফের সুবেদার তার একটি চৌকস দল হ্যান্ডক্যাপ হাতে নিয়ে দাস কোম্পানীর ব্যারাকের সামনে দাঁড়ানো। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসার অপরাধে আমরা বারো জনকে গ্রেফতার করে বালাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছে। হ্যান্ডক্যাপ বিহীন নেওয়ার জন্য সুরঞ্জিত বাবুর অনুরোধও সুবেদার মহোদয় উপেক্ষা করলেন। তখন জগৎজ্যোতি ধমক দিয়ে বললেন, কয়েদি হয়ে ওরা যাবে না, যুদ্ধ এখান থেকেই করবে। তাৎক্ষণিক সুবেদারের তর্জন গর্জন থেমে যায়। আমাদেরকে হাতকড়া ছাড়া সসম্মানে নিয়ে যাবেন বলে জগৎজ্যোতি দাসকে আশ^স্ত করেন। নজরবন্দি হয়ে শরণার্থী শিবির পানচড়া ও মইলাম এর উপর দিয়ে যাওয়ার পথে ছিচকে চুরের মতো মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছি। রাস্তায় আমাদের হাতিয়ার গোলাবারুদ কেড়ে নিয়েছে সুবাদার। কয়েক দিনের ব্যবধানে এমন উত্থান পতন নিজেদেরকে ভাবিয়ে তুলে। মাত্র কয়েক দিনে আগে অস্ত্র হাতে মাথা উঁচু করে শিবিরের উপর দিয়ে বীর বিক্রমে হেঁটে গিয়েছিলাম। হাজার হাজার মানুষের প্রাণ ঢালা অভিনন্দন অফুরন্ত ছিল। আমাদেরকে বালাটে এনে কয়েদখানায় ঢুকিয়ে দিয়ে তালা মেরে চলে যায়। রাতে কোন খাবার দেয়নি। তবে ধারণা করে বসে আছি রাত ভোর হলে কালা মেজর সবাইকে গুলি করে মারবে। আর অন্য শাস্তি দিলেও তা কঠোর ও নির্মম হবে, সহ্য করতে পারব তো। এই সব আজে বাজে চিন্তায় অনুতাপ করেই রাতটা কাটিয়েছি। আমরা পালিয়ে না গিয়ে মেজর ডি স্যুজার বিরুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার শওকত সাহেবের কাছে অভিযোগ জানালেই একটি সুন্দর সুরাহা করে দিতেন। সবাই মাথা মোটা বিধায় সুবুদ্ধিটা কারো মাথায় আসল না। তবে এমন মাথা মোটার কাজ জীবনে বহু করেছি। আরো হয়তো করব। (চলবে)


