রাজনৈতিক পরিচয়ে ইউপি নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। দলীয় এই সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই বিএনপি’র প্রার্থী রয়েছেন স্বতন্ত্র হিসাবে। দল থেকে তাদের নিষেধ করা হচ্ছে না নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে আসার জন্য। বরং দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, যারা নির্বাচন করবেন তারা নিজ দায়িত্বে করবেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ভোগছে চরম প্রার্থী আধিক্যে। এক একটি ইউনিয়ন থেকে চার জন পাঁচজন করে প্রার্থী নৌকা প্রতীক পাওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। দল থেকে বারবার বলা হচ্ছে, যাকে প্রতীক দেয়া হবে তার পক্ষেই নির্বাচন করতে হবে সকলকে। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। নৌকা প্রতীক যারা পাননি তাদের বড় অংশ স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনি লড়াইয়ে থেকে যাচ্ছেন। অর্থাৎ দেশের বড় দুইটি রাজনৈতিক সংগঠন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে তৃণমূলে গ্রহণযোগ্য ও অবশ্য পালনীয় বিষয় হিসাবে সামনে আনতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কোনো দলীয় পরিচয়ে অনুষ্ঠিত হত না। যে যার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। যিনি জনপ্রিয়তাসহ নির্বাচন উতরিয়ে আসার সকল কলকব্জা হাতে রাখেন তিনি নির্বাচিত হয়ে আসতেন। তৃণমূলের এই নির্বাচনে দলীয় প্রতীক গৃহীত হওয়ার পরে এই বাস্তবতাগুলো আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। তাহলে কি তৃণমূলের এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়করণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি ভুল প্রমাণিত হচ্ছে? দলগুলোর ভিতরে কি এ কারণে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিরোধ বেড়ে যাচ্ছে?
মূলত আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তথা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার বিষয়টি সেইভাবে আত্মস্থ করতে না পারার কারণে বর্তমান সমস্যাগুলোর উদ্ভব ঘটছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন করার মধ্যে কোনো দোষ নেই। বরং এর বহু ইতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন এই দলীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৃণমূলে নেতৃত্ব তৈরির পথটি বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আদর্শ বাস্তবায়নের কাজ সহজতর হয়। দলের রাজনীতিও গণমানুষের কাছে পৌঁছানোর পথ হয়। এইসব কারণে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা যায়। কিন্তু গোড়ায় গলদ থাকায় প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অনুশীলন না থাকার কারণে বিষয়টি লেজে-গোবরে হয়ে উঠতে দেখছি আমরা। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার এই শক্তিশালী মাধ্যমটিকে যথার্থ প্রমাণের দায় এখন নিতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই। প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতিকে মানা হলে আমাদের ধারণা এতোসব সমস্যার উদ্ভব হত না।
ইউনিয়ন পরিষদ জনপ্রতিনিধিত্বের জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের সার্বক্ষণিক সুখ দুঃখের অংশীদার হন। জনগণ হাতের কাছে পায় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বারদের। জনগণ সবকিছু খোলে বলতে পারে এই তৃণমূল নেতৃত্বকে। সরকারের বহু উন্নয়ন কাজ ও সেবামূলক কাজ বাস্তবায়ন হয় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে। একসময় ইউনিয়ন পর্যায়ে বহু সম্মানীয় ব্যক্তি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কালের প্রবাহে রাজনৈতিক-ব্যবসাবৃত্তির এই সময়ে এসে প্রকৃত সমাজসেবকরা অনেক দূরে ছিটকে পড়েছেন। জনপ্রতিনিধিত্ব করাকে এখন অনেকে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর উপায় হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত হওয়ার নেতিবাচক প্রপঞ্চ দ্বারা আক্রান্ত। প্রার্থীতা নিয়ে বিশেষ করে সরকারি দলের প্রার্থীতার জন্য এতো হইচই এ কারণ থেকেই উদ্ভূত। সুতরাং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি রাজনীতির এই ব্যবসা হয়ে উঠার জাতি-বিনাশী প্রপঞ্চকে দূর করাও সমান জরুরি। আর তা করা গেলেই তৃণমূলে রাজনৈতিক পরিচয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্তটি মহিমান্বিত হয়ে উঠতে পারে।