স্টাফ রিপোর্টার
বিশিষ্ট চারজন লোককবির স্মরণে আয়োজিত ‘হাওরপাড়ের গল্প’ উৎসবের শেষ দিন ছিল সোমবার। এদিন কথা ও গানে স্মরণ করা হয় বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তকে। রাধারমণ দত্তের সৃষ্টি ও জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি শিল্পীরা তাঁর গান ও ধামাইল নৃত্য পরিবেশন করেন।
সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাসনরাজা মিলনায়তনে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম। প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজম খান, জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে, লোকসংস্কৃতি গবেষক আ ত ম সালেহ, সুনামগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্রের আহবায়ক অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ, অ্যাডভোকেট খায়রুল কবির রুমেন পিপি প্রমুখ। আলোচনা সভার সঞ্চালনা করেন- নেজারত ডেপুটি কালেক্টর নাহিদ হাসান খান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘রাধারমণ বৈষ্ণব সহজিয়া ধারার কবি, তিনি ভালবেসে ভাবের ঘুরে গেয়েছেন, দুঃখের গান গেয়ে বুঝিয়েছেন, এই গানগুলোই শ্রেষ্ঠ। রাধারমণ
ভবের ঘুরে গান রচনা করেছেন, শিষ্যরা তা লিখে রেখেছেন। রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের পরিবারের ৮০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে। তাঁর বাবা প-িত ছিলেন। রাধারমণ ভাবাবেগে যখন গান গেয়েছিলেন তখন তিনি চিন্তা করেননি ১০০ বছর পরে প-িতগণ বা ড. মোহাম্মদ সাদিক তাঁর গান নিয়ে গবেষণা করবেন। তিনি বলেন, ‘সুনামগঞ্জের সঙ্গীত মহাজন সৈয়দ শাহনূর, রাধারমণ, হাসনরাজা, শাহ্ আব্দুল করিমকে সহায়তা করেছেন নারীরাও। মন্দোদরি, চমৎকার মঞ্জুরী, দিলারাম ও সরলারা সহায়তা করেছেন বলেই তারা এমনটা হতে পেরেছিলেন। এজন্য নারীদের প্রতি সম্মান জানানো জরুরি।’
ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘৯০ বছর আগে সুনামগঞ্জে আঞ্চলিক সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল, এই সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন জামাইপাড়ার বাসিন্দা সতীশ চন্দ্র রায়, সভাপতিত্ব করেন ওমর নাথ রায়। সাহিত্যে সুনামগঞ্জের ইতিহাস সমৃদ্ধ।’
তিনি বলেন, “চার দিনের লোক উৎসবের নামকরণ হয়েছে-‘হাওরপাড়ের গল্প’। এটি যথার্থ নামকরণ হয়েছে। হাওরবাসী সারাবছর কাজ করেন-‘ধান না ওঠলে, হাওরজুড়ে হাহাকার থাকে।’ ধান ওঠলে গান-বাজনা করে মনের খোরাক জোগান।’ তিনি বলেন, ‘হাওরপাড়ের এমন কোন গ্রাম নেই, যেখানে দোতারার টুংটাং শব্দ শোনা যায় না। ” তিনি রাধারমণের গান যেসব মহিয়সী নারীরা লিখে রেখেছেন-তাঁদের মঞ্চে এনে পুরস্কৃত করার অনুরোধ জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজম খান বলেন, ‘কবি রাধারমণ দত্তের গান হৃদয় মিশ্রিত ও ভাবের গান। তাঁর স্মৃতি রক্ষা ও তাঁকে নিয়ে আরো বেশী করে জানা ও গবেষণার জন্য দেরীতে হলেও কিছু করা হচ্ছে। আমরা ভাবছি আরো কিছু করার জন্য। জগন্নাথপুরে রাধারমণ কমপ্লেক্স তৈরি হবে। ’
তিনি আরো বলেন,‘পৃথিবীর সেরা ফোক গান হচ্ছে সুনামগঞ্জের গান। বাংলাদেশের বাউল গানের অধিকাংশের অংশিদার সুনামগঞ্জ। বাউল গানে এই অঞ্চল ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। কারণ সুনামগঞ্জের কবিদের রচিত গান খুব সহজেই যে কেউ বুঝতে পারেন। অসম্ভব সূর ও গান রচনা হয়েছে এই সুনামগঞ্জে।’
এর আগে বিকালে একই মিলনায়তনে রাধারমণ দত্তকে নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামরুজজামান। মুল প্রবন্ধ পাঠ করেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শরদিন্দু ভট্টাচার্য। মূখ্য আলোচক ছিলেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যাপক নীলিমা চন্দ। বিশেষ আলোচক ছিলেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের উপদেষ্টা সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক অ্যাড.স্বপন কুমার দেব। সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন জেলা শিল্পকলা একাডেমির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ কান্তি দে, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান সোমা পাল, একই কলেজের শিক্ষক ইভা রায়, সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মফিজুল হক মোল্লা, লোকসংস্কৃতি গবেষক সুবাস উদ্দিন। সেমিনার সঞ্চালনা করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাকিল আহমেদ।
আলোচনা সভা শেষে গভীর রাত পর্যন্ত স্থানীয় ও অতিথি শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
প্রতিবছর সুনামগঞ্জে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউলস¤্রাট শাহ আবদুল করিম, মরমি সাধক হাছন রাজা, বৈষ্ণব কবি রাধারণ দত্ত ও লোককবি দুর্বিন শাহ স্মরণে এই উৎসব হয়। এবার এই চারজনের সৃষ্টি ও জীবনদর্শনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে হাওরপাড়ের মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে। গত শুক্রবার বিকালে ‘হাওরপাড়ের গল্প-২০১৭’ শিরোনামের এই উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান।


