গত মৌসুমের পাহাড়ি ঢলে হাওর রক্ষায় সফলতার দেখানোয় সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে আরও ১৫ টি রাবারড্যাম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে এ সংবাদ জানা যায়। গত মৌসুমের পাহাড়ি ঢলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনেক বাঁধ পানি আটকে রাখতে পারেনি। পানিতে তলিয়েছে হাওর ও হাওরের ফলন্ত বোরো ফসল। অন্যদিকে খরচার হাওরে নির্মিত দুইটি (গজারিয়া ও ঘাগটিয়া) রাবারড্যাম এলাকা দিয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে ঢুকতে পারেনি। এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়েছে এলজিইডি। বিএডিসি কর্তৃক বিশ্বম্ভরপুরের মিছাখালিতে নির্মিত রাবারড্যামের কার্যকারিতাও প্রমাণিত হয়েছে। এলজিইডি যেসব জায়গায় রাবারড্যাম নির্মাণের জন্য প্রকল্প তৈরি করেছে সেগুলো হলো:- নলুয়ার হাওরে ৩টি, দেখার হাওরে ১টি, ধর্মপাশায় ৪টি, তাহিরপুরে ৪টি, জামালগঞ্জে ১টি ও দিরাই উপজেলায় ২টি। এলজিইডি প্রত্যাশা করছে এই রাবারড্যামগুলো নির্মিত হলে জেলার হাওরগুলোর একটি বড় অংশ অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাবে। পাশাপাশি পাউবোর অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারি অর্থ অপচয়ের পথও বন্ধ হবে। হাওর পাড়ের অধিবাসী ও হাওর কৃষির সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষসমূহ পাউবো’র অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দর্শন থেকে বেরিয়ে এসে বিকল্প চিন্তা করার জন্য বেশ আগে থেকেই তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। বিএডিসি ও এলজিইডির নির্মিত রাবারড্যামের সফলতা সেই বিকল্পকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে। রাবারড্যামগুলো হবে একটি স্থায়ী স্থাপনা। বছর বছর এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের নামে অঢেল টাকা খরচ করতে হবে না। অন্যদিকে রাবারড্যাম নির্মাণ এলাকায় সেতু ও সড়কের ব্যবস্থাও থাকে। বর্ষা মওসুমে যেমন রাবারড্যাম দিয়ে পানি ঢুকার পথ বন্ধ করে দেয়া যায় তেমনি এর মাধ্যমে পানি আটকিয়ে সেচের ব্যবস্থাও করা যাবে। সুতরাং হাওর কৃষি ব্যবস্থাপনায় রাবারড্যামটি যে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।
সুনামগঞ্জ জেলার অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হলো বোরো ধান উৎপাদন। বোরো ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়াটি বহুলাংশে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, অকাল বন্যা, খড়া এমনসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত বোরো ফসল গোলায় তোলার সাথে। প্রকৃতির এইসব বাধাবিপত্তি মোকাবিলার জন্য সংগ্রামী কৃষককূল আদিকাল থেকেই নিজেদের মতো করে সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে চাষাবাদ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে এই সুরক্ষা কর্মসূচীতে সরকারি অংশগ্রহণ বিষয়টিকে ব্যাপকতা দান করে এবং আমাদের উ’পাদনের পরিমাণ বাড়া এবং ক্ষতির পরিমাণ কমা এই দুইটিই হতে থাকে। তারপরেও সরকারি বরাদ্দ ব্যবহারে দুর্নীতি নামক দুষ্টচক্র এবং উপযুক্ত পরিকল্পনাহীনতার কারণে সোনাফলা ধান কয়েক বছর পর পরই বিনষ্ট হতে দেখি আমরা। এই কষ্টে ফলানো ধানকে যাবতীয় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা তাই আমাদের অন্যতম জাতীয় কর্তব্য। প্রস্তাবিত রাবারড্যামগুলো যদি এই উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হয় তাহলে ব্যবস্থাটিকে কৃষকসমাজ সানন্দে স্বাগত জানাবে।
এলজিইডি যেসব রাবারড্যাম প্রকল্প তৈরি করেছে অথবা বিএডিসি যেগুলো করবে সেগুলো যাতে যথাযথ নকশা অনুসরণ করে উপযুক্ত স্থানে টেকসই পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হয় সেই আহ্বান আমাদের। আমরা মনে করি ফসল উৎপাদনে সফলতা দেখাতে পারলে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। শ্রদ্ধা ও ভালবাসার অমূল্য বন্ধনে আবদ্ধ হবেন তাঁরা। আমরা হাওর রক্ষায় নবপ্রবর্তিত এই ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

