রাষ্ট্রপতির মোক্ষম কথা ও আমাদের উপলব্ধি

সোমবার মহামান্য রাষ্ট্রপতির মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, ৬ এমপি, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরমেয়রসহসহ প্রায় ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তব্য রেখেছেন। তাঁদের বক্তৃতার সারাসার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরসহ স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের সকলের বক্তব্যের মধ্যে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে অভিন্নতা পাওয়া যায়। এই অভিন্ন বক্তব্যগুলো হলো-ফসল হানির ফলে বিপন্ন কৃষক কূলের জন্য বছরব্যাপী পুনর্বাসন কর্মসূচী গ্রহণ, হাওর দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং সুনামগঞ্জের হাওরগুলোকে অকাল বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা। রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে সকলের মতামত শুনেছেন এবং পরে স্বভাবসুলভ তীব্ররসবোধ দ্বারা দীর্ঘসময় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনামূলক কথা বলেছেন। যারা এই সভায় বক্তৃতা রেখেছেন মূলত তাঁরাই জেলার মূল নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারক। তাঁদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জেলায় কোন কিছুই হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং একটি অনুষ্ঠানে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবৃন্দ যখন অভিন্ন সুরে কিছু কথা বলেন তখন আসলে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ে। উপরে যে তিনটি বিষয়ে সাধারণ ঐক্য স্থাপিত হয়েছে আমরা আশা করি এবার সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন তাঁরা।
ওস্তাদের মার শেষ রাতে- বলে একটি প্রবাদ বাংলা ভাষায় চালু আছে। আমাদের রাষ্ট্রপতি ওস্তাদ ব্যক্তি। তিনি জীবনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ প্রজ্ঞাবান ও মহৎপ্রাণ। সকলেই যখন হাওর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরবকণ্ঠে দাবি উচ্চারণ করেছেন সেখানে হুল ফুটিয়েছেন রাষ্ট্রপতি স্বয়ং। মোক্ষম কথাটি বলেছেন তিনিই। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই মতবিনিময় সভায় সকলে যেভাবে বললেন, আপনারা বাঁধ নির্মাণের সময় সকলে এভাবে সোচ্চার থাকলে দুর্নীতি হতো না’। একবারেই সত্যকথন। বলা যায় যাবতীয় কথার সারাৎসার এই। যাঁরা দায়িত্বে থাকেন তাঁদের তো অভিযোগ বা দাবি জানানোর কথা নয়। তাঁরা তো ব্যবস্থা নিবেন। এই যে বিভিন্ন বাঁধে কাজ শুরু হয় নি, অনেক বিলম্বে শুরু হয়েছে, নামেমাত্র কাজ করানো হচ্ছে; ইত্যাদি বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রচুর সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে বাঁধ নির্মাণ তদারকী কমিটি। এইসব সূত্র থাকার পর তো বাঁধ নির্মাণে এমন বল্গাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির খবর নীতিনির্ধারক বা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-প্রশাসনিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারও অজানা থাকার কথা নয়। তাঁরা যথাসময়ে সরব হলে আজ হয়তো কৃষকদের এতো বড় বিপন্ন অবস্থা আমাদের দেখতে হতো না।
ঘর চুরি হয়ে গেলে সজাগ হওয়ার গুরুত্ব আছে বটে। চোরকে খোঁজে বের করে চুরি যাওয়া জিনিস উদ্ধার করা যায়, চোরকে শাস্তিও দেয়া যায়। তবে সবচাইতে উচিৎ কাজ হলো চোর যাতে ঘরেই ঢুকতে না পারে সেজন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। আমাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্পষ্টতই সময় থাকতে এই বাঁধ দুর্নীতি ঠেকানোয় সফলতা অর্জন করতে পারেন নি।   
শুধু বাঁধ কেন। কোথায় নেই দুর্নীতি? বরং দুর্নীতি সর্বব্যাপী, সর্বত্র এর অপরিসীম বাস্তবতা। বাঁধ দুর্নীতির মধ্য দিয়ে আমাদের চোখ খুলেছে। সর্বস্ব হারানোর পর এই যে তীব্র সচেতনতা তৈরি হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এরও মূল্য অনেক বেশি। এই দুর্নীতিবিরোধী মনোভাবকে সর্বত্র বিস্তৃত করতে হবে। যেখানেই দুর্নীতির মহোৎসব হবে, রাষ্ট্রপতির মতবিনিময় সভার গুরুত্বপূর্ণ বক্তাদের প্রতি আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ আপনাদের এই দুর্নীতিবিরোধী ঐকমত্য দিয়ে সেখানেই প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। নতুবা আপনাদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বৃহৎ অঞ্চলের সুনাম ক্ষুন্ন হবে। রাষ্ট্রপতির ইঙ্গিতপূর্ণ কথাকে আসুন সকলে আত্মস্থ করি।