মায়ানমারের আদি বাসিন্দা জাতিগত পরিচয়ে রুহিঙ্গা ও ধর্মীয় পরিচয়ে রুহিঙ্গা মুসলমানরা সেদেশের সেনাবাহিনির তীব্র রোষানলের শিকার হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে খবরাখবর প্রচারিত হচ্ছে। রুহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য বরাবরই স্পর্শকাতর। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে রুহিঙ্গা শরণার্থিদের আশ্রয় দেয়া একদিকে দেশের জন্য নানা ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় অন্যদিকে মানবিক কারণে এই উদ্বাস্তু জাতিগোষ্ঠীর দিক থেকে মুখও ফিরিয়ে রাখা যায় না। ফলে রুহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ একটি অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে আছে দীর্ঘদিন ধরে। হতাশাজনক বিষয় হলো রুহিঙ্গা সমস্যাটি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণেও তেমন করে সফল হয়নি। সম্প্রতি জাতিসংঘ ও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন এ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে কার্যত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোন ধরনের উদ্যোগ নেই। অন্যদিকে রুহিঙ্গা ইস্যুটিকে মায়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কর্তৃক মুসলমানদের উপর নির্যাতন উল্লেখ করে আমাদের দেশে একটি মহল সাম্প্রদায়িক প্রচারণা শুরু করেছে। এই মহলটি নানা ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ ছবি দিয়ে রুহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়টিকে উসকে দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এধরনের পোস্ট ও ছবিতে সয়লাব হয়ে আছে। এইসব প্রচারণার ফলে রুহিঙ্গা সমস্যার বিন্দুমাত্র সমাধান না হলেও দেশের ভিতরে একধরনের উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। সুতরাং অত্যন্ত মানবিক ও স্পর্শকাতর এই ইস্যুটিকে দায়িত্বশীলতার সাথে মূল্যায়ন করা নাগরিক সমাজের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব।
রুহিঙ্গারা ইতিহাসস্বীকৃত মতে মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের অধিবাসী। সুতরাং তাঁরা মায়ানমারের নাগরিক, এই বিষয়ে কারও কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। মায়ানমার রুহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়ে মূলত একটি জাতিসত্বাকে বিলীন করার মতো অপরাধ করে চলেছে। মায়ানমারের এমন মানবতাবিরোধী বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ফোরামসমূহে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা দরকার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে বাংলাদেশসহ মানবতাবাদী সকল রাষ্ট্র ও সংগঠন এবং অবশ্যই রুহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দকেই নিতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। রুহিঙ্গাদের একটি গোষ্ঠী যেভাবে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করছেন বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। বরং এর মধ্য দিয়ে রুহিঙ্গাদের সহজেই সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী বানিয়ে ফেলা মায়ানমারের জন্য হবে সহজতর।
মনে রাখা দরকার বর্তমান বিশ্বের নানা প্রান্তে ধর্মীয়, বর্ণগত বা গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের নানা ধরনের দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। বিশ্ব পরিস্থিতি এখন অনেকটা তাতানো লোহার মতো। আমাদের দায়িত্ব হলো যেকোন সংখ্যালঘু নির্যাতনকে মানবতার বিরুদ্ধে অপশক্তির অপপ্রয়াসরূপে চিহ্নিত করে এর প্রতিকার বের করা। আর যদি এগুলোকে আমরা সম্প্রদায়গত জিকির করে আরেক ধরনের সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় মেতে উঠি তাহলে প্রকৃত সমাধান দূরুহ হয়ে যাবে। আজ মায়ানমারে যে রুহিঙ্গা নির্যাতন চলছে এর বিরুদ্ধে মানবিক মানুষের মানবিক প্রতিরোধ বলয় রচনা করা একান্ত জরুরি। বিশ্বের প্রতিটি শান্তিকামী মানুষ ও গোষ্ঠীকে আজ রুহিঙ্গা দলনের বিরুদ্ধে মানবিক চেতনায় প্রতিবাদে উচ্চকিত হতে হবে। মনে রাখতে হবে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে নিজের দেশের ভিতরে যাতে কোন ধরনের অশান্তির আগুন জ্বলে না উঠে।
আমরা বাংলাদেশের সরকারকে অনুরোধ করব, প্রতিবেশির ঘরে আগুন লাগলে অন্য প্রতিবেশির শান্তি নষ্ট হয়। তাই রুহিঙ্গা ইস্যুটির যুক্তিগ্রাহ্য সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থাপন, লবিং ও সমাধানের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর। একই সাথে দেশের স্বার্থ বজায় রেখে এক্ষেত্রে মানবিক আচরণের প্রতিফলন ঘটানোও উচিৎ। আমরা সেই জাতি যারা উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা বুঝি। এই বোধই রুহিঙ্গাদের বিষয়ে আমাদেরকে আরও দায়িত্ব ও সহনাভূতিশীল করবে এই বিশ্বাস আমাদের হৃদয়মূলে গ্রথিত।
- দলীয় প্রার্থী তালিকায় নাম লেখাতে দৌঁড়ঝাঁপ
- বর্তমান ঐতিহাসিক স্থানেই শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হোক

