বিন্দু তালুকদার
শিল্পনগরী ছাতক ও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য দুই দিক থেকে চেষ্টা চলছে। জেলার ছাতক থেকে রেলওয়ের লাইন বর্ধিত করে শহরের মাইজবাড়ী-বদিপুর পর্যন্ত এবং নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের বৈঠাখালি পর্যন্ত। কিন্তু কোনটিই হচ্ছে না।
অবশ্য, মোহনগঞ্জ-সুনামগঞ্জ রেলাইন বর্ধিতকরণের প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী ডিপিপিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই নির্দেশনা কাগজে-ফাইলেই বন্দি রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের দাবিতে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) এর বর্তমান চেয়ারম্যান রেলওয়ের সচিব ও ডিজিকে এ বিষয়ে একটি আধা সরকারি পত্র দিয়েছিলেন।
ড. মোহাম্মদ সাদিক তাঁর দেয়া আধা সরকারি পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, ‘সুনামগঞ্জের একটি উপজেলা শহরে রেল যোগাযোগ চালু রয়েছে। অথচ. জেলা শহরকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার দাবি আমলে নেওয়া হচ্ছে না’। তিনি ছাতক থেকে আমবাড়ী হয়ে আসা সড়কের পাশ দিয়েই রেললাইন বর্ধিত করা যায় উল্লেখ করে গণমানুষের এই দাবিকে গুরুত্ব দেবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
এর আগে দিরাই-শাল্লার প্রবীণ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় সিলেট সার্কিট হাউসে বৃহত্তর সিলেটের সংসদ সদস্য, রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, ‘সুনামগঞ্জে রেললাইন সম্প্রসারিত হবে। ছাতক-সুনামগঞ্জ এবং মোহনগঞ্জ-ধরমপাশা রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের আমলেই শেষ হবে। এটা হলে হাওরের মানুষের যোগাযোগ বিড়ম্বনা অনেকটাই কমে যাবে।’
সেদিনের ওই সভায় রেলপথের দাবি জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, ছাতক-দোয়ারার সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, রেলওয়ের সচিব ফজলে কবির, মহা পরিচালক আবু তাহের, শাল্লা উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান
অবনীমোহন দাস ও ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলা শহরকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার দাবি উঠেছিল ১৯৬১ সালে। সুনামগঞ্জের সবজী, পাথর ও মাছ কম খরচে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানো এবং একমাত্র সড়কের বিকল্প একটি রেলওয়ে লাইন চালু করণের দাবি জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের। জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরের বাসিন্দা তৎকালীন সিলেট ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সদস্য রাবেয়া লেইছ ১৯৬১ সালে প্রথম ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সভায় এই দাবি তুলেছিলেন।
২০১১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকাণীন সভাপতি অ্যাড. রবিউল লেইস রোকেস জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি স্মারকলিপিও প্রদান করেন।
সম্প্রতি, সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-তাহিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন মোহনগঞ্জ থেকে ধর্মপাশা-মহেষখলা-টেকেরঘাট-লাউড়েরগড় হয়ে সুনামগঞ্জ শহরতলির বৈঠখালি ঘাট পর্যন্ত রেললাইন বর্ধিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই চিঠি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠিয়ে বলা হয়েছে এই প্রকল্পটি ডিপিপিভুক্ত করার জন্য।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জে রেললাইন স্থাপন নিয়ে জাতীয় সংসদে কথা বলেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। সেদিনের সংসদ অধিবেশনে স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সন্ধ্যার পর পীর মিসবাহ রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হককে একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন।
পীর মিসবাহ সম্পূরক প্রশ্নে বলেছিলেন, সুনামগঞ্জের ছাতকে বহু আগে থেকেই রেললাইন আছে। জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি থাকার পরও এটি জেলা সদরে সম্প্রসারণ করা হয়নি। সুনামগঞ্জের সন্তান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলপথ মন্ত্রী হবার পর রেললাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেও পরে এটি আর আলোর মুখ দেখেনি। তিনি মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন,‘ছাতকের রেললাইনটি দোয়ারাবাজার উপজেলা হয়ে জেলা সদরে সম্প্রসারণ করা যাবে কি না। জবাবে মন্ত্রী মুজিবুল হক পীর মিসবাহকে ডিও লেটারসহ সাক্ষাৎ করতে বলেন। ডিও লেটার পাবার পর তিনি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।
গত ২৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের বাজেট বক্তব্যকালে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক-সুনামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ রেললাইন স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ -৫ (ছাতক-দোয়ারা) আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক। তিনি লেলমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,‘ ছাতক পর্যন্ত রেল লাইন চালু রয়েছে। তাই ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহর পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপন সহজ উল্লেখ করে তিনি ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের দাবি জানান।
এছাড়া সম্প্রতি ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের জন্য জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় প্রস্তাব করেন বর্তমান জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। রাজধানীতে গত ১৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়ায় চার দিনব্যাপি জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে জেলা প্রশাসক ওই রেলপথ সম্প্রসারণের জন্য রেলমন্ত্রী ও রেল সচিবের কাছে ডিও লেটার তোলে দেন। ওই সম্মেলনে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও রেলপথ সম্প্রসারণের দাবি জানান তিনি।
এদিকে গত ২৭ আগস্ট ধর্মপাশায় রেললাইন সম্প্রসারণ ও রেল স্টেশন স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচিত পালিত হয়েছে। উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন সড়কে ফেসবুক ভিত্তিক অনলাইন গ্রুপ ‘ধর্মপাশার দাবি’র সহযোগিতায় ‘ধর্মপাশা রেলওয়ে স্টেশন বাস্তবায়ন আন্দোলন কমিটি’ ঘন্টাব্যাপি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এতে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করেন। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ হতে ধর্মপাশায় রেললাইন সম্প্রসারণ করে ধর্মপাশায় রেলওয়ে স্টেশন স্থাপনের জোর দাবি জানিয়ে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন, সংগঠনের উপদেষ্টা সাংবাদিক এনামুল হক এনি, চয়ন কান্তি দাস, আহ্বায়ক আপন দেবনাথ, ইউপি চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম, ফেরদৌসুর রহমানসহ আরো অনেকেই।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শেরেনুর আলী বলেন,‘ ছাতক থেকে আমাদের জেলা শহর পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের দাবি দীর্ঘদিনের। জেলার সকল শ্রেণী পেশার লোকজন এই দাবির সাথে একমত। সুনামগঞ্জ শহর পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত হলে সহজে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যোগাযোগ স্থাপন ও পণ্য পরিবহণ করা সম্ভব হবে। এতে আমাদের সময় বাঁচবে এবং অর্থের অপচয় রোধ হবে। তবে এই দাবি বাস্তবায়নের জন্য নানাভাবে উদ্যোগ নেয়া হলেও আলোর মুখ দেখছে না। সুনামগঞ্জবাসীর প্রাণের এই দাবি যত দ্রুত সম্ভব াস্তবায়ন করা হোক।’
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘ মাত্র ২৬ কিলোমিটার রেললাইন সম্প্রসারণ করলে ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপন হয়ে যাবে। এটি সুনামগঞ্জের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত চিঠি আকারে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এছাড়া গত জুলাই মাসে রাজধানীতে জেলা প্রশাসকদের ৪দিন ব্যাপি সম্মেলনে ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহর পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের দাবির বিষয়ে রেলমন্ত্রী ও রেল সচিবকে ডিও লেটার দিয়েছি। এছাড়াও রেলপথের দাবির বিষয়টি আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য প্রদানকালে বিশেষভাবে তোলে ধরেছি।’
তিনি আরো বলেন,‘বর্তমান সরকার দেশের সকল জেলাকে রেলপথ যোগাযোগের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করছেন। আমরা আশা করি আমাদের দাবি পূরণ হবে।’
মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি বলেন,‘মোহনগঞ্জ থেকে রেললাইন সুনামগঞ্জ পর্যন্ত বর্ধিত করার আবেদন করার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সম্প্রতি এটি ডিপিপিভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই চিঠির কপি আমাকেও দেয়া হয়েছে। এখন জরিপের কাজ শুরু হবে। আমি আশা করছি আগামী অর্থ বছরের মধ্যে জরিপের কাজ শেষ হবে। এর পর ডিপিপি প্রণয়ন করা হবে।’
পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) এর সভাপতি ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন,‘আমি রেলওয়ে সচিব ও ডিজিকে একাধিকবার দেখা করে এই বিষয়ে অনুরোধ করেছি, আধা সরকারিপত্র দিয়েছি। আমার অনুরোধপত্রে আমি বলেছি,‘ছাতক থেকে রেললাইন বর্ধিত করে সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ী-বদিপুর এলাকায় স্টেশন করা কঠিন কোন কাজ নয়’।


