অমিত দেব
জগন্নাথপুর পৌর শহরের বাসুদেববাড়ির বাসিন্দা রূপক দে পটল একটি বেসরকারি মুঠোফোন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত। তিন মাস আগে চাকুরী চলে যাওয়ায় বেকার হয়ে ঘুরতে থাকে। পরে এক বন্ধুর কথামতো স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে স্বপ্নের দেশ ইটালিতে যাওয়ার আশায় দেড় লাখ টাকা চুক্তিতে অক্টোবর মাসে লিবিয়া পাড়ি জমায়। দালালরা তাকে লিবিয়া পৌঁছে দিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে ইটালি যেতে তার কাছে আরো চার লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দেয়ার তার ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। নিরুপায় ছেলেটি মুঠোফোনে বাবা-মা কে জানালে ছেলেকে অনিশ্চিত যাত্রা থেকে রক্ষা করতে মাথা গুজার শেষ অবলম্বন বাড়ি বিক্রি করে দালালের কাছে পুরো তিন লাখ টাকা দেন। কিন্তু দালালের চাহিদামতো চার লাখ টাকা দিতে না পারায় এখনো পটলের ওপর চলছে নির্যাতন। কী হবে তার ভাগ্যে একথা এখনো জানা না গেলেও জগন্নাথপুর উপজেলার শত শত তরুণ লিবিয়ায় অনিশ্চিত যাত্রায় যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কয়েকজন দালাল সিলেটের কয়েকটি ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে এভাবে শত শত বেকার তরুণদের ইটালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়া নিয়ে অনিশ্চিত গন্তব্যে ফেলে দিচ্ছে। চার লাখ টাকার বিনিময়ে লিবিয়া হয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে ইটালি যাওয়া কলকলিয়া ইউনিয়নের মজিদপুর গ্রামের এক তরুণের স্বজন জানান, ইটালির শরণার্থী শিবিরে থাকা তার ভাই মুঠোফোনে জানায়, দালালরা লিবিয়া থেকে নৌকাযোগে ইটালি সীমান্তে পৌঁছে দিতে তাদের একটি দলকে নিয়ে রওয়ানা হয়। তাদের ভায্য মতে ছয় ঘন্টা নৌকা চলার পর ইটালি সীমান্ত পাওয়া যাবে। কিন্তু দালালরা ১১ ঘন্টার তেল মজুদ করে নৌকাযোগে রওয়ানা হয়। সাড়ে ১০ ঘন্টা পরও যখন ইটালির সীমান্তে পৌঁছতে পারেনি তখন সবাই মৃত্যুর প্রহর গুনছিল। ঠিক সেই
সময় একটি বিমান সাগরে নেমে তাদেরকে উদ্ধার করে ইটালি শরণার্থী শিবিরে নিয়ে যায়। এক মাস ধরে তারা সেখানে অবস্থান করছেন । তিনি জানান, মজিদপুর গ্রামের আরেক তরুণসহ ১৫ জন তরুণ এখনো লিবিয়াতে আটক রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত বেকার যুবক লিবিয়া হয়ে ইটালি যেতে অনিশ্চিত গন্তব্যে রওয়ানা হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকের কোন খুঁজ পাচ্ছেন না স্বজনরা। অনিশ্চিত গন্তব্য দিয়ে ইটালি পৌঁছা এক যুবক জানান, দালালরা লিবিয়া সীমান্ত পাড় করে ইটালি সীমান্তে প্রবেশ করে নৌকা ডুবিয়ে দেয়। পরে সাঁতার কেটে ইটালি পৌঁছতে হয়। আবার অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না। যারা পৌঁছেন সেখানে যাওয়ার পরও কোন কাজ পান না। সম্প্রতি লিবিয়ায় নৌকা ডুবে শত শত মানুষ মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাওয়ার পর থেকে লিবিয়া সীমান্ত দিয়ে ইটালি যাওয়া তরুণদের স্বজনদের মধ্যে হাহাকার দেখা দিয়েছে। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, লিবিয়া সীমান্ত দিয়ে ইটালি যাওয়ার হিড়িকের পাশাপাশি জগন্নাথপুরে চলছে আরবের বিভিন্ন দেশে নারী পাচার। গৃহকর্মীর নামে প্রতি মাসে জগন্নাথপুর থেকে শত শত নারী আরবের বিভিন্ন দেশে গিয়ে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। আর ওই পাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত রয়েছেন জগন্নাথপুরের কয়েকজন দালাল। ওই সব দালালদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন সিলেট ও ঢাকার মানবপাচারকারী চক্র। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ওই পাচারকারী চক্র তাদের বিশ্বস্ত এজেন্টদের মন ভোলানো কথায় সাড়া দিয়ে, সহায়সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে পথ বসেছে বহু মানুষ। তাদের জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। অবর্ণনীয় নির্যাতন সয়ে ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ দেশে ফিরতে পারলেও অনেকের ঘটছে নির্মম মৃত্যু। কিন্তুু অবৈধপথে যাওয়ার কারণে কোন হদিস মিলছে না এসব পাচারকারী তরুণদের।
ভুক্তভোগী স্বজনদের সাথে আলাপ করে আরো জানা গেছে, ইটালি, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স এর মতো উন্নত রাষ্ট্রে কম খরচে আকর্ষণীয় বেতন ও নানা সুযোগ-সুবিধার লোভ দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার সহজ-সরল মানুষকে পাঠানোর জন্য আরবের বিভিন্ন দেশ লিবিয়া, সুদান, লেবানন, ইরাক, সিরিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হচ্ছে। ২০১২ সালে হয়েছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন। এসব আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হলেও কঠোর আইন, জীবনের ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা কোনো কিছুই অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া বন্ধ করতে পারছে না, বরং আরও বেড়েছে। তাছাড়া গৃহকর্মের কথা বলে নারী ও শিশুদের বিভিন্ন দেশে পাচার করে যৌনকাজে বাধ্য করানো হচ্ছে। জগন্নাথপুর উপজেলার নাদামপুর গ্রামের এক দিনমজুরের অবিবাহিতা মেয়ে সুদান গিয়ে এখন ৫ মাসের মেয়ে নিয়ে একটি মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় দেশে ফিরেছেন।
কলকলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল হাশিম বলেন, কলকলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লিবিয়া গিয়ে তরুণরা বিপথগামী হচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে কোন পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।
চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশ মিয়া বলেন, আমার ইউনিয়ন থেকে অনেক তরুণ লিবিয়া হয়ে ইটালি যাচ্ছেন বলে শুনেছি।
জগন্নাথপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মুরসালিন জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই।


