ভূমিকা
অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার
আদিতে মানুষ সবাই এক এলাকায়ই জন্মেছে বা বসতি গড়েছে তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। যদি একত্রেই থেকে থাকে খাদ্যের সন্ধানে মানুষ নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ প্রাণের প্রথম আবেদন ক্ষিধে নিবারণ। সবকিছুর আগে মানুষ উপলব্ধি করেছে উদরপুর্তির তাগিদ। আর আদি থেকে যে যে-এলাকায় এই মানব-গোষ্ঠী বসতি গড়ে তুলেছে সেখানকার জীবনোপযোগী পরিবেশ আয়ত্ব করে নিয়েছে। আর এই পরিবেশ আয়ত্ব করতে গিয়েই মানুষের মধ্যে এসেছে চারিত্রিক ভিন্নতা, ভাষার ভিন্নতা, স্বভাবের ভিন্নতা, বসতের ভিন্নতা, অভ্যাসের ভিন্নতা তথা জীবনের ভিন্নতা। আর এভাবেই মানুষ হয়ে গেছে আবহাওয়া বায়ুম-লের তথা প্রকৃতির দাস। এমনকি এলাকার আবহাওয়া-জলবায়ু বুঝে সে জীবনের নিয়ম-কানুন তৈরি করেছে। শুধু তাই নয় হাজার হাজার বছর যাবৎ লোকজ-জীবনে এসব নিয়মকে নিবীক্ষার মাধ্যমে জীবনের ধ্যানে পরিণত করেছে। পরবর্তীতে এই আচরিত নিয়মই তার কাছে তার জীবনরক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাও বললে ভুল হবে না যে এই পালিত-চর্চিত নিয়ম থেকেই প্রথা পার্যা ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে।
আবহাওয়া ভিত্তিক সব এলাকায় চিন্তা-চেতনা-উপলব্ধি কিন্তু এক নয়। এই দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার মানুষেরা ঘর বাঁধতে উপলব্ধি করেছেÑ‘পুব দুয়াইরা ঘরের রাজা, দখিন দুয়াইরা তার প্রজা, উত্তর দুয়াইরার মুখে ছাই, পশ্চিম দুয়াইরার ঠাঁই নাই। পুবের বাতাস জীবন সঞ্জীবনী ঔষধ, তাই পুুবের বাতাস লাগে ঘর এমন করেই বাঁধতে হবে। উদাহরণ দিলে এ এলাকায় এমন কোন মসজিদ পাবেন না যে পুবমুখী দরজা নেই। আগেই দেখেছে, আয়ত্ব করেছেÑÑ‘পুবের ধেনু নিত্যি বর্ষে, পশ্চিমের ধেনু সাগর শুষে, উত্তরের ধেনু বায় বাণ, দক্ষিণের ধেনু খায় ধান’। ঘরের আগেই মাথার উপরের অসীম আকাশের চাল, চরিত্র রপ্ত করে নিয়েই মানুষ তার অনন্ত বসবাস শুরু করেছে। যদিও ‘ধেনু’ বলতে শিক্ষিত-সংস্কৃত সমাজে ‘গাভী’ বুঝে, গ্রামীণ সমাজে আকাশের ‘মেঘ’র বঙ’কেই বুঝে ও বুঝায়। আধুনিক আবহাওয়ার খবর নানা সময় ব্যতিক্রম হলেও গ্রামীণ এই সূত্রের ফল অব্যর্থ-সত্য হয়ে থাকে। আরও অনেক কথা, জীবনে জটিল নিয়ম-ফর্মুলাকে মানুষ ‘সহজ’ অর্থ্যাৎ ‘সহ+জন্ম’ করে গ্রহণ করেছেÑÑ‘জরমো অউক যতা তথা করমো অউক ভালা’, ‘টেহা পইসা আতের ময়লা’, ‘দউরাইয়া হিয়াল বায় ফালানি যায় না’, ‘সোজা যাচ্ তো ঘুরাইয়া যা’, ‘আগে তিতা পাছে মিডা’, ‘আতো বৈডা ঘাডো নাও মন তুমি কারবায় চাও’, ‘কারে কেলায় মারে নিজে নিজে মরে’, ‘কালা কাজলের মাডি তার লাইগ্যা ছয়মাস আডি’, ‘গাঙ কেউ অপার থাকে না’, ‘দোহানো দুধ বান্ধো ঢুহে না’, ‘পানিত থেইক্যা কুমিরের সাথে যুদ্ধ’, ‘পরের আশা গাং পাড়ো বাসা’। এসব অমূল্য কথাবার্তা নয় শুধু, অমূল্য-বাণী মানুষ বানিয়েছে তাই নয়, এসব কথগুলির মূল্য আধুনিক শিক্ষিত জীবনে যে কত অর্থবহ তা ব্যাখ্যা করলে অবাক না হয়ে উপায় নেই। কিন্তু মনে করা হয় এসব অশিক্ষিত গ্রাম্য কথাবার্তার কী আর মূল্য আছে ? মূল্য নেই, যদি আপনার জীবনকে আপনি বিশ্লেষণ না করেন, পরিণামে কিন্তু ফল ঠিকই পান। এসব নিয়ে এখন আর বিশদ আলোচনায় যাচ্ছি না পরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করবো।
গ্রামীণ ছিলক, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, ধিটান গ্রামীণ জীবনের রূঢ় বাস্তবতার স্বত:স্ফূর্ত ফসল। যদি ধরা যায় শব্দ সৃষ্টির কাজটিই শ্রম নির্ভর, তাহলে বলা চলে এই প্রবাদ-প্রবচনগুলি কথা সংক্ষেপন বা বিষয় সংক্ষেপনের একটি কাব্যিক রূপ। শ্রমক্লান্ত সদা অনিশ্চিত গ্রামীণ জীবনে এত কথা বলার সময় নেই। কম কথায় অধিক বিষয় বুঝাতে, অধিক ধারণা দিতে, শিক্ষা দিতে, অধিক অভিজ্ঞতার উপস্থাপন করতে এই প্রবাদ-প্রবচনগুলো অন্তর-নিসৃত বাণীসর্বস্ব। অপরদিকে আলোচনা করলে অন্য একটি বিষয়ও পাওয়া যায়- আধুনিক গ্রামীণ জীবনও আধুনিক নয়-অতি পুরাতন পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরে আছে। ফলে সেখানে অতীত জীবন থেকেই এসেছে- জীবন শিক্ষার, সংসার শিক্ষার নানা দিকের নানা বিষয়, নানা ধারণা। অর্থাৎ সে জীবন ব্যবস্থায় লেখাপড়াহীন পদ্ধতিতে নিজেরা নিজেই শিক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চেয়েছে এবং হয়েছে। কারণ সমাজ-সংসারের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকেই, বেঁচে থাকার নানা শিক্ষা তাকে অল্পায়াসে আয়ত্ব করতে হয়। তার সমাজ জীবনের বাঁচার দিক, হারাবার দিক, অর্জন করার দিক, উৎপাদনের দিকে আলাদা আলাদাভাবে বুঝতে হয়েছে, শিখতে হয়েছে। আছে সমাজ, আছে সমাজ নিয়ম, আছে রূপ-রস-গন্ধ আস্বাদনের আকুতি এসব গুলিকেই সংক্ষেপে জীবন চর্চায় এনে মূলত লোক-শিক্ষার বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে এই গ্রামীণ প্রবাদ প্রবচনগুলিতে।
প্রবাদের শিল্পগুণ সম্পর্কে বলতে গেলে-সঙ্গীতের রূপ ও রস যেমন তার সুরের অভিব্যাক্তিতে, না শুনলে তার মাধুর্যের উপলদ্ধি হয় না, তেমনি প্রবাদের রূপ-রস তার বলার ভঙ্গিকে চাক্ষুস না দেখলে বা না শুনলে তার সম্পূর্ণ আস্বাদ পাওয়া যায় না। প্রবচন বা প্রবাদ বাক্যগুলি এক একটি স্থানের জল মাটি বাতাসে পরিপুষ্ট অপূর্ব সম্পদ। এদের আশ্রয় মানুষ এবং অবলম্বন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা। ঘটনাগুলি থেকে সংগৃহীত অভিজ্ঞতা কখনও কৌতুকের মাধ্যমে, কখনও গাম্ভীর্যপূর্ণ বাণীতে অতি অল্প কথায় ব্যক্ত হয়। মৃদু রসিকতা, কখনও সকৌতুক গাম্ভীর্য কখনও বিদ্রুপাত্মক রস পরিবেশন এই প্রবচনগুলির রীতি। ডরঃ এই প্রবচনগুলির প্রাণ। এ ডরঃ-ই প্রবচনগুলিকে স্থায়িত্ব দিয়েছে। এক একটি কথা বিদ্যুত ঝলকের মত মনকে জাগিয়ে তুলে। প্রবাদ যে নতুন অভিনব তত্ত্ব প্রচার করে তা নয়; জানা কথাকেই সে রূপ-রস-গন্ধ মিলিয়ে জানিয়ে দেয়। কোথাও একটু বিদ্রুপের খোঁচা দিয়ে, কোথাও একটু সমবেদনায় অশ্রুসিক্ত করে প্রবচনগুলি চিরন্তন তত্ত্বসমূহকে নতুন করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। প্রবাদ-প্রবচনগুলি দীর্ঘ কি খাটো সেটা বড় কথা নয়। সেগুলোকে যেমন সত্যাশ্রয়ী হতে হয় তেমনি কালান্তরেও দীর্ঘায়ু হতে হয়। তাই প্রবাদ বাক্য যেরূপ আনন্দের খোরাক তেমনি এর উপদেশমালা চিন্তার খোরাকও বটে। তবে এগুলি যে মানুষের বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও দর্শন সঞ্জাত ফসল এতে কোন সন্দেহ নেই। বিভিন্ন সমাজের মানুষের রীতি-নীতি, ধর্ম-বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সংস্কার-সংস্কৃতি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে কখনো সখনো হয়তো কোন তাৎপর্যমূলক বাক্যের উদ্ভব হয় যার ফলশ্রুতি এই প্রবাদ-প্রবচন। নানা দেশে নানা ভাষায় প্রবাদ প্রবচনগুলি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ভারতের বৈদিক-গ্রন্থে, ত্রিপিটকে, রামায়ণ, মহাভারতে, চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, চ-ীমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল প্রভৃতি কাব্যে প্রবাদের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
লোক সমাজে প্রবাদ প্রবচনগুলির প্রথম উন্মেষ সামাজিক কারণেই যে হয়েছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। কারণ প্রবাদ প্রবচনের মধ্যে সামাজিক আচার-আচরণ, ধর্ম-বিশ্বাস, সংস্কার-সংস্কৃতির চিত্রই সতত ভাসমান। সমাজের লোকের মুখে মুখে প্রচলিত এসব প্রবাদ প্রবচনগুলি আবার লিখে রাখার তাগিদ কখন থেকে শুরু হয়েছে বলা মুশকিল। তবে মিশরের ‘ইড়ড়শ ড়ভ ঃযব ফবধষ’ গ্রন্থে সংকলিত প্রবাদ খ্রিঃ পূর্ব ৩৭০০ অব্দে মিশরে প্রচলিত ছিল। গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল প্রাচীন প্রবাদ প্রবচন সংগ্রাহকদের অন্যতম ছিলেন।
প্রবাদ প্রবচনগুলি যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকার কারণ সম্ভবত এর ঢং, মেজাজ, গূঢ় রহস্যময়তা, সুকুমার্য রস ও ছন্দ মাধুর্য প্রভৃতি। কখনো প্রবাদ প্রবচনগুলি হয়ে উঠেছে ছড়ার মত চিত্রধর্মী ও ছন্দময়, কখনো সুখ-দুঃখের রহস্যে ঘেরা নকশী কাঁথা, আবার কখনো কথার মারপ্যাচে ভাস্বর।
এগুলি যেকোনো অঞ্চলেরই হোক না কেন, তা মাঝে মধ্যে সহজ মনে হলেও আসলে কিন্তু সহজ নয়। এর মধ্যে কোন রহস্য, মর্মন্তুদ কাহিনী, গূঢ় অর্থ ও রসিকতা থাকে যা সাধারণ অসাধারণ সবাইকে সমানভাবে আক্রমণ করতে সক্ষম। আর এগুলি বার বার বলা কওয়াতেও কোন রসহানি ঘটে না। সেজন্যই এগুলো সমাজে আজো বেঁচে আছে সগৌরবে।
বিত্ত-বৈভবের অসাম্য এবং এই সম্পদের দাপটে কিভাবে সমাজের মানুষকে মানুষ করায়ত্ব করে, অর্থের গরিমায় অন্যকে খাটায় এবং কোনো উৎপাদন ব্যবস্থায় বন্টনটা কিভাবে চলে তার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে গ্রামীণ মানুষের মুখের কথায়। যদিও এগুলিকে নিতান্তই গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ-বেদনার মধ্যেই সীমিত বলে মনে হয়। কিন্তু এগুলির অর্থ-ব্যাপকতা অনেক গভীর, অনেক সুদূরপ্রসারী, অনেক বিস্তৃত। একটি গ্রামীণ প্রবাদ আছে, যা এখানে আলোচনা করা যায় Ñ“হুইত্যা মাগুর বইয়া কই আর জাল বায় বেডা ভেড়া”। মাছ ধরা অতি সহজ কাজ নয়। যার জাল আছে সে ব্যবহার জানে না, যে পরিশ্রম করতে জানে তার উপকরণ নেই। ফলে এ দুজনের মধ্যে একটি সমতাচুক্তি হয়, ভাগের হার নির্ধারণ হয়। তাতেই কি শেষ ? দাঁড়ায় মধ্যসত্ত্বভোগী। তাকে যথেষ্ট দিতে হয়। সবশেষে যে শ্রম দেয় সে অবহেলার সাথেই একটুখানি পায় কি পায় না। অর্থাৎ জালের মালিকের শুয়ে থেকেই দামি মাগুর (সবচেয়ে ভাল) পেলে এগুলি তার, যে খলই ধরবে বা মাছ গুলি রক্ষা করবে সে কই মাছ পেলে নিয়ে যাবে। বাকী নামেমাত্র মিনি মাছ বা স্থানীয় ভেদা মাছগুলিই থাকলো তার জন্য, যে মূলত শ্রম দিল, মাছ ধরলো। তদ্রƒপ আরও অনেক গ্রামীণ কথা বা প্রবাদ আছে- “গাছো (গাছে) উঠতো (উঠতে) পারে না, বড্ডা (বড়) বাচ্চা আমার ”। এই প্রবাদগুলি যে শুধু গ্রামীণ সমাজ জীবনের তুচ্ছ ব্যবস্থারই সমালোচনা তা নয়, আধুনিক সমাজ, রাষ্ট্র ব্যবস্থারও সমালোচনা হয়ে থাকে। এমন আরও আছে- ‘টেহার (টাকার) নাম সর্বজয়, টেহা থাকলে সব অয়’। বিষয়ানুসারে ভাগ করলে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রবাদ-প্রবাচনের মাধ্যমে আলোচনা করা যাবে। সংগৃহীত প্রবাদগুলিকে অভিজ্ঞতা, উভয় সঙ্কট ও সমাজ বন্ধন, কষ্ট-যন্ত্রণা, কুসংস্কার, ক্ষমতার কাছে পদানত, গ্রামীণ জীবন : কৃষি, চিকিৎসা/স্বাস্থবিধি, ঠকামী ও দ্বন্দ্ব, দর্শন, নি:সহায় (অসহায়ত্ব), পরশ্রীকাতরতা : পরিণাম, বিশ্লেষণ, ভ-ামী-বদামী-ফাঁকি, মেকি স্বভাব, রূঢ়-বাস্তবতা, রঙ্গ-রসিকতা, লোভ ও স্বার্থপরতা, শিক্ষা, সমালোচনা, হাবাটেপনা, অন্যূন মোট এই ২০ টি বা ততোধিক ক্রমিকে ভাগ করে আলোচনা করা যায়। সুতরাং পরে সময়ান্তরে সবগুলির বিষয় ভিত্তিক আলোচনা করবো। ধন্যবাদ।
লেখক: সাবেক সহ: অধ্যাপক, সভাপতি সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবি। তারিখ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ইং মঙ্গলবার।
- আগামী ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের জন্মমহোৎসব
- ইউসুফ শোকে কাতর জামালগঞ্জ এ শূন্যতা পূরণ হবার নয়


