বিশেষ প্রতিনিধি ও সুব্রত কুমার দাশ খোকন
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় পাকহায়েনা ও তাদের দোসরদের অনেক নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনা এখনো অনেকেরই অজানা রয়ে গেছে। হাওরাঞ্চলে এসব হত্যাযজ্ঞের ঘটনা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যই তুলে আনা জরুরি বলে মনে করেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা।
শাল্লার বীর মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ সরকার বললেন, ১৯৭১ সালে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে সুখলাইনের পশ্চিমের গ্রাম সুলতানপুরে পাঞ্জাবি এসেছে শুনে এবং পরেরদিন সুখলাইন আক্রমণ করবে লোকমুখে শুনে সুখলাইন গ্রামের সবাই ঘরবাড়ি ফেলে রেখে পাশের গ্রাম আনন্দপুরে চলে যায়। কিন্তু পরেরদিন সকালে কিছু মানুষ আবার গ্রামে চলে আসে। বাড়ির হাঁস-মোরগ, গরু, ছাগল, দেখাশোনা করার জন্য। বাড়ি চলে আসার দিন দুপুর একটা থেকে দুইটার দিকে সুলতানপুর গ্রামের কয়েকজনের নেতৃত্বে ৪ থেকে ৫ জন পাঞ্জাবিসহ ২০ থেকে ২৫ জনের সুলতানপুর গ্রামের একটি রাজাকারের দল আসে সুখলাইন গ্রাম লুট করতে। লুটকরেরা শুরুতেই গ্রামে ঢুকে সুখলাইন গ্রামের বড়হাটির জগৎ চন্দ্র দাস (৭০), জগতের ছেলে রসলাল দাস (৩০), সুকুমার দাস (২২), বৃন্দাবন দাস ওরফে লোকাদা (৫০), বৃন্দাবন দাসের ভাতিজা কমল দাস (২০), কমলের দাদি পার্বতী রানী দাস (৬০) এবং সুখলাইন আখড়ার বৈষ্ণবীÑএই ৭ জনকে পিছমোড়া করে বেঁধে একটি নৌকায় রাখে এবং তাদের আশ^স্থ করা হয় তখনকার ইউপি চেয়ারম্যান সরাফত আলী আসলে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে। তাঁদেরকে বেঁধে রাজাকারেরা সুখলাইন গ্রামের ধান-চাল লুট করে তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা নৌকায় তুলতে থাকে। সেই সঙ্গে রাজাকারেরা সুখলাইন গ্রামের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দেয়।
চেয়ারম্যান আসলে ছেড়ে দেওয়া হবেÑএ কথায় অন্য ৬ জন আশ্বস্থ হলেও বৃন্দাবন দাসের বিশ্বাস হলো না। তাঁর ধারণা, তাঁদেরকে মেরে ফেলা হবে। বৃন্দাবন দাস অনেক চেষ্টা করে তাঁর পেছনের বাঁধন খুলে ফেললেন এবং তাঁর ভাতিজা কমলকেও বাঁধন খুলতে বললেন। কিন্তু কমল হিতে বিপরীত হবে ভেবে বাঁধন না খুলে বাকি সবার মতো নীরবে বসে রইলেন। সারাদিন গ্রাম লুট করে সন্ধ্যার দিকে নৌকায় লুটকরেরা উঠার পূর্ব মুর্হুতে বৃন্দাবন দাস নৌকা থেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিছু দূর সাঁতরিয়ে যেয়ে মধ্য পুকুরে একটি টেকের মধ্যে কচুরিপনার ঝাঁকের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে নাক জাগিয়ে লুকিয়ে রইলেন। রাজাকারের দল নৌকায় এসে একজনকে না পেয়ে অকথ্য ভাষায় তাঁদের সবাইকে গালিগালাজ করতে লাগল এবং বাঁশের লগি দিয়ে পানিতে বাইরাইতে লাগল। কিছুক্ষণ এমনটা করার পর লোকাদাকে না পেয়ে নৌকা ভাসিয়ে গ্রামের অদূরে পূর্বদিকের দাড়াইন নদীতে নিয়ে বাকি ছয়জনকে একসঙ্গে বেঁধে পানিতে ফেলে দিলো। ফেলে দেওয়ার পূর্ব মূর্হুতে তাঁদের আর্তচিৎকারে চারদিক ভারি হয়ে উঠল। লোকাদা তাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে লুকিয়ে থাকলেও তাঁদের কোনো সহযোগিতা করতে পারলেন না। এই আক্ষেপ লোকাদা জীবনভর করে গিয়েছেন। এখনো তাঁর আক্ষেপের কথা মনে করে কাঁদেন এলাকাবাসী।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ সরকার বললেন, মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছি আমরা। আর কদিন পরই বিজয়ের রজত জয়ন্তী পালন হবে। কিন্তু ভাটি অঞ্চলে পাক হায়েনা ও তাদের দোষরগণ কর্তৃক সংগঠিত অনেক লোমহর্ষক ঘটনা এখনো অনেকেরই অজানা। সুখলাইনের ঘটনাটিও নতুন প্রজন্মের জানা নেই। ওখানে কোন স্মৃতিচিহৃও ৫০ বছরেও করা হয় নি।
জামালগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র তালুকদার বললেন, মুক্তি সংগ্রামে যখন উত্তাল দেশ, ঠিত তখনই শ্রাবণ মাসের প্রথম দিকে ভাটির উপজেলা ইটনা, মিটামইন, মদন ও কালিয়াজুরি থেকে ১৮ তরুণ যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য নৌকায় করে প্রশিক্ষণস্থল ভারতের বালাহাটে যাচ্ছিলেন। পাকহায়েনা ও তাদের দোসররা তাদের আটকায় জামালগঞ্জের লক্ষীপুর গ্রামের কাছাকাছি এলাকায়। পরে গ্রামের মাঝখানে পাটক্ষেতের পাশপাশি এনে সারিবদ্ধভাবে গুলি করে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় ওখানেই। এই হত্যাকা-ে কারা মারা গেছেন, এখনো জানে না কেউ। ঘটনাস্থলটি চিহিৃত করে রাখা হয় নি।
মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র তালুকদার জানালেন, জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের মোমিনপুরের নীচের দিকে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের কিছু দিন আগে নভেম্বরের দিকে ২৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকা-টি এখনো অজানা রয়েছে মানুষের।
হরেন্দ্র তালুকদার মনে করেন গণহত্যা বা হত্যাযঞ্জের সঠিক তথ্য তুলে ধরতে সময়ক্ষেপন করলে একসময় তথ্যই পাওয়া যাবে না। যারা তথ্য দিতে পারবেন, তারা বেঁচে থাকতেই এই কাজ শেষ করতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র সুনামগঞ্জের আহ্বায়ক, রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জের লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বললেন, হাওরাঞ্চলে বা ভাটি অঞ্চলে পাক হায়েনাদার পাশাপাশি রাজাকার-দালালরাও অনেক বড় বড় হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে। এসব কিছু ঘটনা এখনো প্রকাশ পায় নি। সুনামগঞ্জের সীমান্ত থেকে হাওরাঞ্চলে দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজ করলে, আরও অনেক লোমহর্ষক ঘটনা হয়তো পাওয়া যাবে।


