বিন্দু তালুকদার
তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার শনি হাওরের বেহেলী ইউনিয়নের অংশে কম্পারমেন্টাল বাঁধ সংস্কারের নামে লোক দেখানো প্রকল্প দাখিল করে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাত চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ওই প্রকল্পের অর্ধেক টাকা উত্তোলন করে পকেটস্থ করেছেন পিআইসির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও পাউবোর কর্মকর্তাগণ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল বাতেন। পিআইসির সাধারণ সম্পাদক উপজেলা স্বেচ্ছাসবক লীগের সাবেক সহ সভাপতি ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা রইছ মিয়া। প্রকল্পটি ইউনিয়নের রহমতপুর গ্রামের কাছে অবস্থিত।
এই প্রকল্পের অনুমোদন, কাজের পরিমাণ ও বরাদ্দ উত্তোলন নিয়ে পিআইসির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের
বক্তব্যেও মধ্যে অমিল রয়েছে। সভাপতির দাবি ৪ টি ভাঙা বন্ধকরণ, তবে সাধারণ সম্পাদকের দাবি ভাঙা বন্ধকরণ ৮টি স্থানের। পিআইসির সাধারণ সম্পাদক রইছ মিয়ার দাবি, প্রকল্প অনুমোদনে ইউনিয়ন পরিষদের রেজুলেশনসহ সব কিছুই নিয়ম মোতাবেক করা হয়েছে। বরাদ্দ থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সভাপতির দাবি ভুল করে রেজুলেশন করা হয়নি, বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে সাড়ে ৭ লাখ টাকা।
অভিযোগ উঠেছে ওই জায়গাটুকুতে মোটা অংকের বরাদ্দ দিয়ে সংস্কারের কোন প্রয়োজন ছিলনা। ওই প্রকল্প বরাদ্দটুকু লুটপাটের জন্য একটি ভুয়া প্রকল্প দাখিল করা হয়েছে। অফিসের কাগজ-পত্র তৈরির জন্য নামমাত্র কিছু কাজ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পে যে কাজ করা হয়েছে তার পরিমাণ এক লাখ টাকার বেশি হবে না।
এদিকে এলাকার রাধানগর গ্রামের জনৈক আসাদুর রহমানের মৌখিক অভিযোগ পেয়ে রবিবার বিকালে স্থানীয় লোকজনদের সাথে নিয়ে কম্পার্টমেন্টাল বাঁধ পরিদর্শন করেছেন উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মু. রশীদ আহমদ। সরেজমিনে বাঁধ পরিদর্শনকালে তিনি সর্বোচ্চ এক লাখ টাকার মাটির কাজ হয়েছে বলে দেখতে পেয়েছেন তিনি, এমনই জানালেন এ প্রতিবেদকে ।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই বাঁধ সংস্কার প্রকল্পটি উপজেলা পরিষদ ও বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের পিআইসির চাহিদাপত্র ও রেজুলেশনের তালিকাভুক্ত নয়। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দিন ইউপি সদস্য আব্দুল বাতেনের সাথে যোগসাজশে এই ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে বরাদ্দ উত্তোলন করেন। নামমাত্র মাটির কাজ করে প্রকল্পের উত্তোলিত বরাদ্দ লুটপাট করেন।
বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার বলেন,‘এই প্রকল্পের বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে একটা খসড়া রেজুলেশন রয়েছে তবে তা চূড়ান্ত রেজুলেশন নয়। আমি স্থানীয়ভাবে জেনেছি প্রকল্পটিতে নাকি লাখ-দেড় লাখ টাকার কাজ হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়নের বিষয়ে পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পিআইসির সভাপতি আব্দুল বাতেনই বিস্তারিত বলতে পারবেন। ’
শনির হাওর এই এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারি প্রকৌশলী শাহ আলমের সাথে কথা বলতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
এ ব্যাপারে বিদায়ী সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দিনের সাথে কথা বলতে চাইলে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পিআইসির সভাপতি বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন,‘ আমাদের এই প্রকল্পটি পানি আসার কয়েকদিন আগে অনুমোদন হয়েছে। সব কাগজপত্র ঠিক আছে। সাড়ে ১৪ লাখ টাকার প্রকেল্পর মধ্যে সাড়ে ৭ লাখ টাকার বিল তুলেছি এবং প্রকল্পের কাজ করেছি। প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ মিথ্যা।’
রেজুলেশন কেন নেই জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ ভুল করে রেজুলেশনটি করা হয়নি, কাজের ফিলিং চার্ট আছে সুনামগঞ্জে রয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি রেজুলেশন তৈরি করে নিব।’
পিআইসির সাধারণ সম্পাদক রইছ মিয়া,‘ আমরা প্রকল্পে কোন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি করিনি। নিয়ম মোতাবেক প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের রেজুলেশনসহ সব কাগজপত্র আছে। আমরা ৮টি স্থানের ভাঙা বন্ধ করেছি এবং ৬ লাখ টাকার কাজ করেছি। ’
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মু. রশিদ আহমদ বলেন,‘এই প্রকল্পটির বিষয়ে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ অবগত নয়। বেহেলী ইউপির সচিব জানিয়েছেন পরিষদের কোন ধরনের কাগজপত্র নেই। মৌখিক অভিযোগ পেয়ে আমি স্থানীয় লোকজনকে সাথে নিয়ে বাঁধ পরির্দশন করেছি। আমরা যা দেখতে পেয়েছি ৭০- থেকে ৮০ হাজার বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার মাটির কাজ হয়ে থাকতে পারে।’
ভাইস চেয়ারম্যান বলেন,‘ কাজ দেখে আমার মনে হয়েছে এই প্রকল্পটি ভুয়া। কারণ পিআইসির সভাপতি ইউপি সদস্য আব্দুল বাতেনের কাছে কাগজ দেখতে চেয়েছিলাম তিনি কোন কিছুই আমাদের দেখাতে পারেননি। তবে দাবি করেছেন সাড়ে ১৪ লাখ টাকার প্রকল্প এটি। তিনি ব্যাংক থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। ’
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রসূন কুমার চক্রবর্তী বলেন,‘ শনির হাওরের বেহেলী ইউনিয়ন অংশের ওই পিআইসি ও বরাদ্দের বিষয়ে আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। পিআইসির তালিকায় ওই প্রকল্পের নাম নেই। সম্প্রতি বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। উপজেলা চেয়ারম্যানও আমাকে এই প্রকল্পের বিষয়ে বলেছেন। আমরা তাদেরকে ডেকে প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইব এবং খোঁজ খবর নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করব। ’
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জামান কামরুল বলেন,‘ শনির হাওরের জামালগঞ্জের বেহেলী এলাকার কম্পার্টমেন্টাল বাঁধে কোন ধরনের কাজ হয়নি। এখানে কোন প্রকল্প ও পিআইসি ছিল তা আমরা জানতাম না। সম্প্রতি এই বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। ’
পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম সোমবার রাতে এ প্রতিবেদককে বলেন,‘ আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। কাগজপত্র না দেখে সঠিকভাবে সবকিছু বলা সম্ভব নয়। এই প্রকল্পটির বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হবে।’


