শহরে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ

আসাদ মনি
জল- জোছনার শহর সুনামগঞ্জে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা পৌরবাসিন্দাদের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অভিনব কায়দায় এসব চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা সংগঠিত হচ্ছে। শহরের একটি সংঘবদ্ধ চক্র এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলছেন তারা। এজন্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত করা হলে এধরণের অপরাধের সংখ্যা কমবে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
রবিউল আওয়াল রবি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মাস্টার্স- এর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। মহামারি করোনায় বিশ^বিদ্যালয় বন্ধের জন্য শহরের হাছন নগরের বোনের বাসায় থেকে বিসিএস’র প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গেল ১৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের গেইটের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন তিনি।
তিনি জানালেন, সন্ধ্যা ৭ টার দিকে বাসায় ফিরছিলেন। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের গেইটের ডানদিকের যাওয়ার পরেই ২- ৩ জন তরুণ ডিবি পরিচয়ে আটক করে তাকে। এসময় পাশের বিল্ডিংয়ে নিয়ে গিয়ে মারধর করে তাকে। এই যুবকদের সঙ্গে কিছুক্ষণপর আরেকজন এসে যুক্ত হয়।
শিক্ষার্থী রবির কাছ থেকে বিকাশের পিন ও পরিচিত আত্মীয়দের কাছ থেকে জরুরী প্রয়োজন জানিয়ে টাকা আনায় বিকাশ একাউন্টে। তাদের মারের মুখে তিনি ২ হাজার টাকা আনতে সক্ষম হন। এভাবেই ঘন্টাখানেক তার উপর চলে নির্যাতন। কথিত ডিবি পরিচয় দেয়া যুবকরা যাওয়ার সময় তার জ্যাকেটও ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। এরপর তিনি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় এসে ঘটনা জানান।
এদিকে একই দিনে শহরের মুহাম্মদপুরে দিনে দুপুরে বাসায় ঢুকে চুরির ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সুনামগঞ্জ জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম’র বাসায় এই চুরির ঘটনা ঘটে।
জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি বাসা তালাবদ্ধ করে বেলা ১১ টার দিকে বেরিয়ে যান। পরে দুপুর পৌনে ২টায় তাঁর স্ত্রী ঘরে ফিরে এসে দেখেন দরজার তালা ভাঙা। চোর তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে আলমারির কিছু স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে গেছে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনকে খবর দেন।
পৌর শহরের হাজিপাড়ার বাসিন্দা ইমন। শহরের ডিএস রোডের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে তার ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান। ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তার বাসায়ও চুরি হয়েছে।
ইমন জানান, ১৬ ফেব্রুয়ারি আমার পরিবারের সবাই বেড়াতে যান। আমি সকাল সাড়ে ১০ টায় দোকানে চলে আসি। বিকালে ফিরে গিয়ে দেখি বাসার থালা ভাঙা। ভেতরের সব কিছু এলামেলো।
ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে ইমন বলেন, আমার ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ও প্রায় ১৩ বরি স্বর্ণ নিয়ে গেছে। আমার মায়ের বিয়ের গহনা সহ আমার নানা আমার জন্মের সময় একটা স্বর্ণের চেইন দিয়েছিলেন সেগুলোও নিয়ে গেছে। আমার মেয়ের বয়স ১৩ মাস, তার জন্যও স্বর্ণের গহনা বানিয়েছিলাম সেগুলোও নিয়ে গেছে। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে থাকা এই গহনাগুলোর সঙ্গে।
থানায় অভিযোগ ও পরের অবস্থা
শিক্ষার্থী রবিউল আওয়াল রবি ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি সুনামগঞ্জ সদর থানায় যান। সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থল হলো থানা পুলিশ। এজন্য থানায় গিয়ে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিবরণ দেন তিনি। পরে কর্তব্যরত অফিসার বাইরে থেকে লিখিত অভিযোগ জমা দেয়ার জন্য বলেন তাকে।
রবি বলেন, আমি ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি সুনামগঞ্জ সদর থানায় চলে যাই। ভেবেছিলোম তাৎক্ষণিক অবস্থায় তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কিন্তু তা হয়নি। প্রথমে আমার কথা শুনে বলা হয় বাইরে গিয়ে লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসতে। আমি পৌর মার্কেটে গিয়ে সাদাকাগজে ঘটনার বিস্তারিত লিখে এনে জমা দেই। এরপর ডিউটি অফিসার সেটি রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে বলেন।
তিনি আরও বলেন, থানা থেকে এসে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করে পরিচিত স্থানীয়রা সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ছবি দেখালে একজনকে সনাক্ত করতে পারি। চিনতে পারা ডিবি পরিচয়ে নির্যাতন করা ব্যক্তির ছবি নিয়ে আবারও থানায় যাই। সেখানে রাত ১ টা পর্যন্ত ছিলাম। ডিউটি অফিসার বললেন, সকালে এসে যোগাযোগ করতে।
এরপর বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১ টায় শিক্ষার্থী রবি সুনামগঞ্জ এসপি অফিসে গিয়ে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানকে ঘটনার বিস্তারিত জানান। এরপর সদর থানার ওসি মো. শহীদুর রহমান রবিকে আবারও অভিযোগপত্র লিখে দিতে বলেন। পরে পৌরসভার পশ্চিম সুলতানপুরের ইমাম হোসেন’র নাম উল্লেখ ও আরও ৩ জনকে অজ্ঞাত করে থানায় মামলা দায়ের করেন তিনি। এই দিনেই পুলিশ ৩জন আসামীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
এদিকে বাসায় চুরি হওয়া ইমন জানিয়েছেন, তার বাসায় চুরির পরে বাসার সামনে সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন তিনি। এখন সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিওতে হাজিপাড়া এলাকায় রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে কিছু অপরিচিত লোককে চলাচল করতে দেখেন। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত তার চুরি হওয়া মাল ও চোরকে ধরতে পারেনি প্রশাসন।
জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, ১২ দিন হলো তার বাসায় চুরি হয়েছে। এখনও প্রশাসন কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
পৌরসভার বাসিন্দা অ্যাড. মাহবুবুল হাছান শাহীন বলেন, শহরে চুরির ঘটনা বেড়ে গেছে। সম্প্রতি আমাদের সকলের পরিচিত জাগাঙ্গীরের বাসায় চুরি হয়েছে। চোরেরা যেমন কৌশল পাল্টিয়েছে তেমনি আমাদের আইন শৃঙ্খলাবাহিনীদেরও আরও কৌশলী হতে হবে। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামারা লাগানো যেতে পারে।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহ সভাপতি অ্যাড. খলিল রহমান বলেন, সম্প্রতিকালে শহরে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মানুষের মনে অসুন্তুষ্টি তৈরি হয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। বিশেষ করে পাড়া মহল্লায় যারা ছোটখাটো অবরাধের সঙ্গে যুক্ত ও মাদকসেবী রয়েছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হলে এধরনের ঘটনা কমবে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মো. শহীদুর রহমান সিসি ক্যামেরা লাগালে এধরণের ঘটনা কমবে উল্লেখ করে বলেন, সিসি ক্যামেরা ব্যক্তি উদ্যোগে লাগাতে হবে। এছাড়াও এই ঘটনাগুলোর সুষ্ঠুু তদন্ত হচ্ছে। এরকম ঘটনা বন্ধ করতে পাড়া- মহল্লায় সভা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।