শহীদ আবুল হোসেনের কোন স্মৃতি নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন। বাবার নাম জায়ফর মামুদ। বাড়ি সুনামগঞ্জ শহরতলির অচিন্তপুর। বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই (২৮ মার্চ, ১৯৭১) সুনামগঞ্জ সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছর পরেও তাঁর নামে ঐ বিদ্যালয়ে কোন স্মৃতিফলক, ভাস্কর্য বা ঐ কক্ষটিও তাঁর নামে করা হয়নি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্টজনেরা মনে করেন নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবুল হোসেনের নামে ঐ বিদ্যালয়ে স্মৃতিফলক হওয়া জরুরি।
মুক্তিযুদ্ধের উত্থাল দিনগুলোতে সুনামগঞ্জ শহর এবং শহরতলির মুক্তিকামী জনতার কাছে খবর পৌঁছায় ১২ জন পাকসেনা তখনকার সার্কিট হাউসে (উকিলপাড়ার পুরাতন সার্কিট হাউস) অবস্থান নিয়েছে। বিক্ষুব্ধ মানুষজন তখন ছুটতে থাকেন সার্কিট হাউসের দিকে। মুক্তিযোদ্ধা জনতা ঘেরাও করে নেন পাক সেনাদের অবস্থানস্থল সার্কিট হাউস।
সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সতীশ চন্দ্র  বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং শহর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে অবস্থান নিয়ে পাক সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকেন মুক্তিযোদ্ধা ও আনসার সদস্যরা। সতীশ চন্দ্র উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে অবস্থান নিয়ে আবুল হোসেনও সার্কিট হাউস লক্ষ করে ফায়ারিং করতে থাকেন। এখানে এক পর্যায়ে তিনি পাকবাহিনির ছুড়া বুলেটে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। শহীদ হন আবুল হোসেন।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিটের কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ান বলেন,‘১৯৭১’এর ২৭ মার্চ পাক সেনাদের ১২ জনের একটি দল তখনকার সার্কিট হাউসে এসে অবস্থান নেয়। এই খবর জানতে পেরে বিক্ষুব্ধ স্বাধীনতাকামী মানুষ নানা দিক থেকে শহরে আসতে থাকেন। ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মরহুম হুমায়ুন কবীর চৌধুরী’র নেতৃত্বে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে ছাত্রদের একটি মিছিল আসে। পশ্চিমবাজার-মধ্যবাজার থেকে মরহুম হোসেন বখ্তের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল আসে। এছাড়াও নানা দিক থেকে আসেন মুক্তিযোদ্ধা-জনতা। হাজার হাজার মানুষ সার্কিট হাউস ঘেরাও করেন। আনসার কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনসহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থান নেন এবং পাকসেনাদের সঙ্গে গুলাগুলি শুরু হয়। সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ঐ সময় শহীদ আবুল হোসেনের ফুফাতো ভাই আবেদিন ও ভাতিজা নুরুল ইসলামও ছিলেন। আবুল হোসেন ভাইয়ের বড় ভাই আবেদীন ভাই ও নুরুল ইসলাম যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের জানিয়েছেন- আবুল হোসেন পাকসেনাদের লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছুড়ছিলেন, এক পর্যায়ে তাঁর রাইফেলে গুলি ঢুকাতে গিয়ে মাথা উপরে তুলেছিলেন, ঐ সময় পাকসেনাদের ছুড়া গুলি গিয়ে মাথায় লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।’
শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন,‘সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ বা বিদ্যালয় আঙিনায় শহীদ আবুল হোসেনের স্মৃতি থাকতে হবে। এটি অনেক বিলম্ব হয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরতে হলে, এই কাজ দ্রুত করতে হবে।’
মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান বলেন,‘সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর (শহীদ আবুল হোসেনের) ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভ থাকতে হবে এবং বছরে বছরে আবুল হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে বিদ্যালয়ে স্মরণসভা হতে হবে। না হয় নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হবে।’
মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র সুনামগঞ্জের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন,‘সুনামগঞ্জে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবুল হোসেন। তিনি সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়েছেন। ঐ শেণিকক্ষটি শুনেছি এখন বিদ্যালয়ের মিলনায়তন। এই মিলনায়তন শহীদ আবুল হোসেনের নামে নামকরণ হতে পারে।’
সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরী বলেন, ‘ আবুল হোসেন যে কক্ষে শহীদ হয়েছিলেন, ঐ কক্ষটি এখন বিদ্যালয়ের মিলনায়তন, ‘নভেম্বরের ৪ তারিখে শিক্ষকদের সভায় এই কক্ষটিকে শহীদ আবুল হোসেনের নামে নামকরণ করার প্রস্তাব আমি করেছি। সর্বসম্মতভাবে সকলে এটি সমর্থন করেছেন । ’
জেলা প্রশাসক ও সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলতে অবশ্যই শহীদ আবুল হোসেনের স্মৃতি ধরে রাখতে হবে। আমি সুনামগঞ্জে যোগদানের পর মুক্তিযোদ্ধা ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে শুনেছি, শহীদ আবুল হোসেন সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়েছেন। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি আমাকে কেউ জানাননি। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির কোন সভাও ডাকা হয়নি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ‘দায়মুক্তি দিবস’ পালন করতে চান বলে আমার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েছেন। এই চিঠিতেও আমি শহীদ আবুল হোসেনের নাম উল্লেখ করতে দেখিনি। দায়মুক্তি বলতে তিনি কী চান? এটি স্পষ্ট নয়, তিনি কী শহীদ আবুল হোসেনের হত্যাকারীদেরও দায়মুক্তি চান কী না এটি স্পষ্ট করণের জন্য তাকে পত্র দেওয়া হবে।’