শহীদ তালেব স্মৃতিস্তম্ভটি কেন বার বার ভেঙে পড়ে?

এই অঞ্চলের এক সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা তালেব উদ্দিন। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী উত্তাল সময়ে মহকুমা ছাত্র লীগের সভাপতি হিসাবে তিনি সংগ্রামী ভূমিকা রেখেছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধে অস্ত্র হাতে এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা জীবনকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। এক প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি পাকবাহিনির হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তানি বাহিনি আত্মসমর্পণের ঠিক আগে ১৯৭১ সনের ৬ ডিসেম্বর শান্তিগঞ্জ উপজেলার আহসানমারা এলাকায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায়। জাতির স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারী এই মহান যোদ্ধার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ ২০১৫ সনে আহসানমারা এলাকায় যেখানে তিনি শহিদ হয়েছিলেন সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। পাকা স্তম্ভের উপর ধাতব খণ্ড দিয়ে অস্ত্র হাতে সামনে ধাবমান এক বীর মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়। এই ভাষ্কর্যের মাধ্যমে অনাগত প্রজন্মের মনে শহীদ তালেবের স্মৃতি চির জাগরুক করে রাখাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। একই সাথে বাঙালির শৌর্য ও বীরত্বের প্রতীকী উপস্থাপনা ছিলো এটি। জেলা পরিষদ এমন একটি মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে সকলের শ্রদ্ধাভাজন হয়েছিলেন। কিন্তু স্তম্ভ ও মূল ভাষ্কর্যের কাঠামো দূর্বল হওয়ায় এটি প্রায়শই ভেঙে পড়ে যায়। ভেঙে যাওয়ার পর আবারও সংস্কার করা হয় পরে আবারও সেটি ভেঙে পড়ে। এমন ভাঙা—গড়ার ফাঁকতালে পড়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি রক্ষার প্রয়াসটি আজ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার চরম নিদর্শন হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে জানা যায়, গত ২৩ এপ্রিলের কালবৈশাখীর ঝড়ে স্মৃতিস্তম্ভটি পুনরায় ভেঙে পড়ে। বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাস্কর বটে।
যে ঐতিহাসিক স্থানে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছে তার আশপাশে কোনো লোকালয় নেই। মূলত নদী ও হাওরের তীরবর্তী এই জায়গাটুকু সবসময়ই কালবৈশাখী ঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝঁুকির মধ্যে থাকে। এরকম একটি খোলা স্থানে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার আগে নিশ্চয়ই উপযুক্ত নকশা তৈরি করা হয়েছিল। কালবৈশাখীর ঝড় মোকাবিলা করার মতো শক্ত কাঠামো দ্বারাই এটি নির্মিত হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যায় বড় কোনো ঝড় নয়, স্বাভাবিক ঝড়েই এই স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে পড়ছে। তাহলে এখানে কেমন নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল? নাকি নকশা সঠিক হলেও কাজের গুণগতমান খারাপ হয়েছিল? এর উত্তর আমাদের জানা নেই। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর খুব সংগত কারণেই সকলের জানা উচিৎ। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি রক্ষার বিষয়টি জাতীয় কর্তব্য। এখানে কোনো ধরনের বিচ্যুতি গ্রহণযোগ্য নয়।
যাহোক, ইতোমধ্যে হয়তো স্মৃতিস্তম্ভটি আবারও সংস্কারের মাধ্যমে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু এই সংস্কার একে স্থায়ী সুরক্ষা দিতে পারবে না। আমরা মনে করি স্মৃতিস্তম্ভটি উপযুক্তভাবে পুনঃনির্মাণ করা জরুরি। নতুবা এই ভাষ্কর্য যদি আবারও ভেঙে পড়ে তাহলে সেটি আমাদের জাতীয় লজ্জা হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যেনতেনভাবে প্রাণহীন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার মতো করে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষার কাজ করা যায় না। এই কাজে একই সাথে আন্তরিকতা, দেশপ্রেম, সততা ও দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। এই কাজের মাধ্যমে আমরা মূলত দেশমাতৃকার প্রতি নিজেদের ঋণ শোধ করার সামান্য চেষ্টা করি মাত্র। তাই এমনসব কাজে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা কাম্য। শহীদ তালেব উদ্দিন চেতনার এক অগ্নিমশালের নাম। তাঁর কথা জেনে ও শোনে আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমের দীক্ষা লাভ করবে। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ও ধারাবাহিক আন্দোলন—সংগ্রাম—লড়াইর ইতিহাসের সাথে পরিচিত হবে। সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা দায়িত্বশীল সকলের অবশ্য কর্তব্য। সেই কর্তব্যবোধের জায়গা থেকে আমরা আহ্বান জানাই, আসুন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালেব উদ্দিনের স্মৃতিস্তম্ভটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল করে নান্দনিকভাবে পুনরায় নির্মাণ করি। জাতির আবেগ ও অনুভূতিকে সম্মান জানাই।