ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার সব হাওরেই এবছর ধানের ফলন ভালো হয়েছে। নির্বিঘেœ ধান ঘরে তুলেছেন কৃষকেরা। স্বপ্নের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পেরে শান্তিগঞ্জের কৃষক-কৃষাণীর চোখে মুখে এখন হাসি। কিন্তু ধান বিক্রি করতে এসেই হাসি আর থাকে না। মুখ মলিন হয়ে যাচ্ছে কৃষকদের। কারণ ধানের কাঙ্খিত দাম পাচ্ছেন না তাঁরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দুই থেকে তিনশ টাকা কম মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে কষ্ট ফলানো ধান। অধিকাংশ কৃষকরা সরকারের কাছে সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারেন না ‘সিস্টেম’ জটিলতার কারণে। এজন্য কাঙ্খিত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। মাঝখানে লাভবান হচ্ছেন ধানের ফরিয়া ব্যবসায়ীরা।
উপজেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে এখনো ধান ক্রয় শুরু না হাওয়ায় সুযোগ নিচ্ছেন ফরিয়াবাজরা। কবে থেকে ধান ক্রয় শুরু হবে, কতজন কৃষক ধান বিক্রি করতে পারবেন কিংবা কত টাকা দরে কেনা হবে ধান, এমন কোনো তথ্য নেই শান্তিগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তার কাছে।
তবে, উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক অসীম কুমার তালুকদার জানান, জেলায় ধান কেনার উদ্বোধন হয়েছে। আমরা আশা করছি, এই সপ্তাহের মধ্যে বরাদ্দপত্র হাতে পাবো। বরাদ্দপত্র হাতে পেলেই উপজেলা পর্যায়ে ধান কেনা শুরু করতে পারবো। এবছর ধানের প্রতি কেজি ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ টাকা। প্রতি মণ ১২শ’ টাকা। ১৮১৭ মেট্রিকটন ধান ক্রয়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে উপজেলায়।
কৃষি বিভাগের কাছে কৃষকদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তারা তালিকা দিলে সে অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হবে।
ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারিভাবে আরো সহজ প্রক্রিয়ার ধান কেনা-বেচার দাবি আছে কৃষকদের এমন প্রশ্নে এই খাদ্য পরিদর্শক বলেন, এটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। এখানে আমাদের বলারও কিছু নেই। একটা সময় সাময়িক ক্রয় কেন্দ্র (টিপিসি) বলে একটা বিষয় চালু ছিলো। যার মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরাসরি ধান কেনা হতো। এখন আর সেটা নেই।
উপজেলার একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের হাওরপাড়ের অধিকাংশ কৃষকরাই নিম্ন আয়ের। তাঁরা ধার দেনা করে চাষাবাদ করেন। প্রত্যেককেই ধান কেটে ঋণ পরিশোধ করার কথা বলে এসব টাকা ধার করেন। সে সুযোগে ধার দেওয়া অতিমুনাফা লোভী অসাধু ব্যক্তিরা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক কমমূল্যে নির্ধারণ করে টাকা ধান দেন। নিরুপায় হয়ে তাদের নির্ধারণ করা মূল্যে অগ্রিম ধান বিক্রি করতে হয় কৃষকদের। আবার বৈশাখ মাসে গ্রামে গ্রামে ঘুরে আরেকদল ফরিয়াবাজরা আছেন যারা কমমূল্যে ধান কিনে থাকেন। সরকার নির্ধারিত মূল্য যেখানে ১২শ’ টাকা, সেখানে তারা ধান কিনছে ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকায়। ওজনে বেশি নিতে সনাতনী পদ্ধতিতে দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ধান ক্রয়ের চেষ্টা করেন ফরিয়ারা।
হাওরের খলায় খলায় (ধান শুকানোর জন্য বিশেষ উঠান) গিয়ে নিজেস্ব মানুষ দিয়ে ধান ক্রয় করেন ফরিয়াবাজরা। কোনো কোনো কৃষক নিকটস্থ রাইস মিলেও ধান বিক্রি করে থাকেন। ধানকে ক্রেতা-বিক্রেতারা দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। বড় এবং ছোট ধান। বড় ধানের মধ্যে আছে হিরা, পান্না, ধনকরাজ ইত্যাদি। ছোট ধানের মধ্যে ব্রি-২৮, ২৯, শক্তি-২, আফতাব, ৮৮ এবং ৮৯ জাতের ধান বেশি বিক্রয় হচ্ছে।
কৃষকরা জানান, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দেন সে মূল্যে প্রান্তিক কৃষকদের ৯৫ শতাংশ মানুষই ধান বিক্রয় করতে পারেন না। এক প্রকার বাধ্য হয়েই তাঁরা ফরিয়াদের কাছে কম মূল্যে ধান বিক্রয় করেন। সরকারিভাবে ধান বিক্রয় করতে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হয়রানি, দ্রুত টাকা না পাওয়া ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজ প্রক্রিয়ার ধান কেনা হলে কৃষক-সরকার দুই পক্ষেরই ভালো হতো। এখন তো বেশি লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ধান ব্যবসায়ীরা।
পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের টাইলা গ্রামের কৃষক সাজিদুর রহমান বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় রজনীগঞ্জ (টানাখালী) বাজারে একজন কৃষক আমার সামনে ৫ মণ ধানের দাম নিয়েছেন ফরিয়া ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। ছোট-লম্বা ধান ৯শ’ টাকা এবং বড় ধান ৮৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রয় করেছেন তিনি। শুনেছি সরকারি দর ১২শ’ টাকা। এ দাম তো আমরা পাই না। যখন এসব শুনি, তখন ধান তুলে যতটা খুশি হই, বিক্রয় করে ততটা খুশি হতে পারি না। মণ প্রতি দুইশ-তিনশ টাকা কম পাচ্ছি আমরা।
শিমুলবাক ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষক মো. জিয়া উদ্দিন ও পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের উমেদনগর (লাউগাঙ) গ্রামের কৃষক, গীতিকবি আফজল হোসেন বলেন, যদিও গত বছরের তুলনায় ধানের দাম কিছুটা বেশি পাচ্ছি, তবে এ দাম সরকারি মূল্য থেকে দুই-তিনশ টাকা কম। অধিকাংশ কৃষকেরাই অভাবী। অন্যের কাছ থেকে ধারদেনা করে চাষাবাদ করেছেন। তাঁদের টাকার একটা চাপ থাকে। সরকার যদি ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নগদমূল্যে ধান কিনতো, তাহলে সরকারও প্রচুর ধান সংগ্রহ করতে পারতো. আমরাও বেশি লাভবান হতাম।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কান্দিগাঁও গ্রামের কৃষক লিয়াকত আলীও ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজ প্রক্রিয়ায় সরকারিভাবে সরাসরি ধান ক্রয়ের দাবি জানান।
শান্তিগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তা সোহায়েল আহমদ বলেন, ধান ক্রয় সংক্রান্ত অফিসিয়াল কোনো নির্দেশনা এখনো আমি পাই নি। কবে থেকে ধান কেনা শুরু হতে পারে তাও জানা নেই এই কৃষি কর্মকর্তার। ধান বিক্রয়ে আগ্রহী প্রকৃত কৃষকদের নামের তালিকা এখনো প্রস্তুত হয় নি, তবে অচিরেই তা তৈরি হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।


