শান্তি কমিটি

সুশান্ত দাস (প্রশান্ত)
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৯ এপ্রিল ঐতিহাসিক দিন। এই দিনটিতে ‘নাগরিক শান্তি কমিটি’ নামে সর্বপ্রথম শান্তি কমিটি গঠিত হয়ে শুরু করে তাদের প্রাথমিক কার্যক্রম।
গত বুধবার ৩০ মার্চ লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব আয়োজিত ২৬মার্চ উপলক্ষ্যে ছিল ‘সুবর্ণ স্বাধীনতা’ অনুষ্ঠান। অতিথিবৃন্দ হতে সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চোধুরী ও যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম’র আলোচনায় স্বাধীনতার ৫০ বছরে ব্রিটেন-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোকপাত হলেও মুক্তিযুদ্ধে বৃটেনে বসবাসরত বাঙালির অবদানটুকু বিশেষ সম্মানের সাথে ফুটে ওঠে। বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম সুস্পষ্ট ভাষায় তাঁব বক্তব্যে তুলে ধরেছেন যে, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাবান ও আন্তরিক তাই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যাঁরা এখানে বাস করেও(বৃটেনে)বিভিন্ন ভাবে মুক্তিযুদ্ধকে তরান্বিত করতে সহযোগিতা করেছেন তাঁদেরকে সরকার ‘প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা’হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের এই অবদান চিরস্মরণীয়।
উপরোক্ত দুচারটি লাইন লেখার কারণ হলো আজকের লেখাটি ঐ একই সময়Ñ ১৯৭১, ঐ একই ঘটনায়Ñ দেশ স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধ, ঐ—একই দেশের সবাই বাসিন্দা হলেও দেশ মাতৃকার টানে কেউ জীবন যৌবন সঁপে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়েছেন । আর একটি পক্ষ পাকিস্তানের অখন্ডতা বজায় রাখতে পাকি মিলেশিয়াদের হাতে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন সংগঠন,কমিটি যেমন—আলবদর, আলশামস, রাজাকার, নাগরিক শান্তি কমিটি (শান্তি কমিটি); এর সাথে যুক্ত হয়েছে। কখনো কখনো এরা নিজেরাই স্বজাতি নিধনে প্রবৃত্ত হয়েছে। স্বাধীনতা আন্দেলনের সমর্থক বা এর প্রতি সহানুভূতিশীল লোকজনের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। লুটপাটে মত্ত হয়েছে। কিশোর তরুণী যুবতী মেয়দের ভোগের জন্য পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে। সুযোগ বুঝে নিজেরাও এমন অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। পবিত্র ধর্মের নামে, অখন্ড পাকিস্তানকে রক্ষার নামে হেন কুকর্ম পাপাচার নেই যা তারা করেনি বা করতে সচেষ্ট হয়নি।
যুদ্ধকালীন পাকবাহিনীকে সহায়তা করা বা তথাকথিত শান্তি রক্ষার নামে যেসব সংগঠন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিল এদের মধ্যে রয়েছে— শান্তি কমিটি। একাত্তরের ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার ১০ দিনের মধ্যে ৪ এপ্রিল নূরুল আমিন, গোলাম আযম, খাজা খয়ের উদ্দিন প্রমুখ ডানপন্থি রাজনীতিক পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক ও গভর্নর ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে কুখ্যাত জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এর পরই তারা গঠন করে শান্তি কমিটি।
বর্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর প্রবেশ হলেও এদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের পরিচয় জানা দুরূহ ছিল তাদের পক্ষে। এখানকার রাস্তাঘাটও তারা চিনতো না ঠিকমতো। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করতো স্থানীয় দালালরা। এ দালালদেরই প্রথম সম্মিলিত সংগঠনের নাম শান্তি কমিটি। কুখ্যাত এ কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামীর। একাত্তরের ৬ এপ্রিল তারা এ প্রস্তাব দিয়েছিল। এর পরদিনই জামায়াতের পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে লেখা হয় ‘বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের সমন্বয়ে শান্তি কমিটি গঠন এক্ষেত্রে (জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করা) খুবই সহায়ক হতে পারে। এ ধরনের শান্তি কমিটি দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে শান্তিকামী নাগরিকদের জানমাল রক্ষা করতে পারবে’। ওই সময় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দালালরা মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতকারী বলতো।
তবে ৬ এপ্রিল গোলাম আজম ও হামিদুল হক চৌধুরী টিক্কাখানের সাথে দেখা করে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় তথাকথিত শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ‘নাগরিক শান্তি কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখেন’। ৯ এপ্রিল ঢাকায় ১৪৪ জন (কোন কোন তথ্য মতে ১৪০ জন) সদস্য নিয়ে সর্বপ্রথম ওই কমিটি গঠত হয়। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ইতিমধ্যে পূর্ব বাংলায় গৃহীত পদক্ষেপের সমর্থনে মিছিল মিটিং করে সংগঠনটি প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। ১৪ এপ্রিল এ—সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে শান্তি কমিটি রাখা হয় (কোন কোন লেখায় ১৭ এপ্রিলও লেখা আছে)। এবং দেশের প্রত্যেকটি জেলা, মহকুমা, থানা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত সর্বত্র এর কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজাকার নির্বাচন, নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ছিল এ কমিটির মূল দায়িত্ব। এই ব্যাপারে দৈনিক প্রথম আলোতে আরো সুস্পষ্ট দেখা যায়Ñ ‘রাজাকার বাহিনী সাধারণভাবে শান্তি কমিটির নেতৃত্বাধীন ছিল। প্রতিটি রাজাকার ব্যাচ “ট্রেনিং” গ্রহণের পর শান্তি কমিটির স্থানীয় প্রধান তাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করত। এই অনুষ্ঠানে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান রাজাকাররা কোরআন শরিফ ছুঁয়ে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করত। এরপর রাজাকারদের “কুচকাওয়াজে” শান্তি কমিটির প্রধান সালাম গ্রহণ করত।…তাদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় গ্রামে—গঞ্জে অত্যাচার, নির্যাতন এবং সামরিক বাহিনীর অগ্রবর্তী পথপ্রদর্শক’(১০অক্টোবর,২০১৩)।
মার্কিন কংগ্রেস সদস্য কর্নেলিয়াস ই গাল্লাজার ১০ জুন প্রতিনিধি পরিষদে বক্তৃতা দানকালে শান্তি কমিটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন “আমি শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণকারী শত শত লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলেছি ধনী, গরীব, শিক্ষিত, নিরক্ষর শরণার্থীদের সঙ্গে। সকলের কাহিনী অনেকটা এই রকম: শান্তি কমিটির লোকেরা আসে; ঘরে পেট্রল ঢালে এবং আমরা পালাতে শুরু করতেই ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র নিতে লুটে লেগে যায়। আমরা প্রতিরোধ করলে পাকিস্তানি সৈনরা আমাদের গুলি করত। এই শান্তি কমিটি কি, সুস্পষ্টভাবে এইগুলো স্থানীয় গুন্ডাপান্ডাদের গঠিত একদল! সেনাবাহিনী এদের অগ্রবর্তী দল হিসাবে প্রেরণ করে আগুন লাগানো এবং লুটপাটের জন্য। পাকিস্তান সরকার বলছে ‘দুস্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তথাপি মনে হয় সেনাবাহিনী সবচাইতে জঘন্য লোকদের নিয়ে একটি হামলাকারী সৈন্যদল গঠনের ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছে’ ( বাংলাদেশ ডকুমেন্টস: প্রথম খন্ড পৃ—৫৪৭/৫৭৩)।
১৯৭১ সালের ২৩ জুলাই ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে সাংবাদিক পিটার আর ক্যান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী, শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের ওপর সেনাবাহিনীর আস্থার ঘাটতি থাকায় তাদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা দিয়ে গঠন করা হয় শান্তি কমিটি। অবাঙালি বিহারি এবং মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মতো কিছু রক্ষণশীল ধর্মভিত্তিক ছোট রাজনৈতিক দলের লোকজনকে নিয়ে এ কমিটি গঠন করে সেনাবাহিনী। সশস্ত্র রাজাকার বাহিনীতে লোক রিক্রুট করার দায়িত্ব পালন করে এরা। শান্তি কমিটির সদস্যরা সেনাবাহিনীর এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। এরা বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু ও স্বাধীনতাপন্থী বাঙালিদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও জমিজমা দখল করে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়’।
ইতিহাসের পাতায় আরো দেখা যায় ১০ মে ১৯৭১ সালে পাক বাহিনী সুনামগঞ্জ শহরে প্রবেশ করলে তাদের দখলকৃত এলাকায় বাঙালির জাতীয় দুশমন কিছু সংখ্যক কুলাঙ্গার লুটপাট, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে মেতে ওঠে। তাদের সাহায়তায় পাকসেনারা গড়ে তোলে রাজাকার,আলবদর বাহিনী। তাছাড়া শান্তি কমিটি নামের আড়ালে কিছু ব্যক্তি নিজেদের আখের গোছাতে থাকে। এর দুদিন পর ১২মে ১৯৭১ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমার শান্তি কমিটির সভাপতি এম মনসুর আলী (শওকত মিয়া) প্রথম সভা করেন তার নিজ বাসায়। সভায় জামায়েত ইসলামের রোকন মোহাম্মদ করম আলী(মাইজবাড়ি) কোরআন তেলওয়াত করেন, কয়েকজন বক্তা পাকিস্তান রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মহকুমা শান্তি কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফারুখ চৌধুরী(হাছননগর) জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। সভায় ১৯ মে মহকুমা প্রশাসক কার্যালয়ের চত্বরে জনসভা ও শহরের বিভিন্ন রাস্তায় মিছিল প্রদর্শন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ৭ জুন সুনামগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটির সভা হয়। এবং উক্ত কমিটিকে অনুমোদনের জন্য সিলেট জেলা কমিটির নিকট পাঠানো হয়।
১৭ জুন ১৯৭১ দুপুর ১১ ঘটিকায় এম মনসুর আলীর নিজগৃহে শান্তি কমিটির আরো একটি সভা করে সুনামগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত মহকুমা শান্তি কমিটির সভাপতি এম মনসুর আলী(শওকত মিয়া), সাধারণ সম্পাদক ফারুখ চৌধুরী ও কোষাধ্যক্ষ আব্দুল গণি(আবুল) সহ ৭০ সদস্য বিশিষ্ট সুনামগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটি গঠিত হয়। সভায় ২৫ জুনের ভেতরে সকল থানা কমিটির নামের তালিকা আহ্বান এবং ৮ জনকে ‘সামরিক আইন’ কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাৎ ও ৭জন কে হিন্দুদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তির খোঁজখবর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। উক্ত ৭০সদস্য বিশিষ্ট মহকুমা শান্তি কমিটিতে ৬৪ নং এবং ৬৫ নং ব্যক্তি ছিলেন যথাক্রমে আব্দুল খালেক (দৌলতপুর,শাল্লা) ও শরাফত আলী(সুলতানপুর,শাল্লা) । এমন তথ্য চোখে পড়ে সাহিত্য প্রকাশ হতে প্রকাশিত (২০১২) লেখক বজলুল মজিদ খসরু রচিত ‘রক্তাক্ত—৭১ সুনামগঞ্জ’ বইটিতে।
উল্লেখ্য এই ১৭ জুন একই দিনে একটি সভার মাধ্যমে সুনামগঞ্জ শহর শান্তি কমিটি গঠন ও নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদককে দপ্তর সম্পাদক মনোনয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়।এছাড়া ৫টি ওয়ার্ডে কমিটি গঠনসহ প্রতিটিতে একজন করে আহ্বায়ক নির্বাচিত করে তাদেরকে পরবর্তী ৩ দিনের মধ্যে পুরো কমিটির নামের তালিকা দাখিলের অনুরোধ জানিয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
৩০ জুন বুধবার মহকুমা শান্তি কমিটির উদ্যোগে স্থানীয় বি.ডি (শহীদ আবুল হোসেন) হলে এক বিশেষ জনসভার আয়োজন করা হয়। এই সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা শান্তি কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদ আলী। ৮ জুলাই মহকুমা শান্তি কমিটির সভায় শরণার্থীদের ফেলে যাওয়া বাড়ি,জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়। ৭ আগস্ট সিলেট জেলা প্রশাসকের নিকট সুনামগঞ্জ শান্তি কমিটি ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নামের তালিকা পাঠানো হয়। সুনামগঞ্জের জিরো পয়েন্টের সন্নিকটে সুখাইর জমিদার বাড়িটিকে অবৈধভাবে দখল করে সুনামগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটির সদর দফতর স্থাপন করা হয়। এই বাড়িটির উত্তরে গৌরারংয়ের জমিদার বাড়িতে আরেকটি কার্যালয়ের সদর দফতর স্থাপন করা হয়। সেটির নাম ছিল ‘মহকুমা শান্তি ভবন’। শান্তি ভবনের কাজ ছিল যারা পাক হানাদারদের নৃশংসতায় তাদের পৈত্রিক ভিটামাটি ছেড়ে সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেছে,তাদের আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানানো। তাছাড়া শহরের উকিল পাড়ায় পলাশের জমিদার বাড়িকে (মহিলা সমিতি)অভ্যর্থনা শিবির হিসাবে সাইনবোর্ড লাগানো হয়। যারা ভারতের পার্শ্ববর্তী শরণার্থী শিবির থেকে এসে আত্মসমর্পণ করবে তাদের এখানে অভ্যর্থনা জানানো হবে। কিন্তু ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত হওয়া পর্যন্ত এ অভ্যর্থনা শিবিরটি সাইনবোর্ড সর্বস্বই ছিল। অভ্যর্থনা শিবিরের দরজা যেভাবে প্রথম থেকে তালা মারা ছিল সেভাবেই তালা মারা ছিল।
তৎকালীন মহকুমা সুনামগঞ্জের অন্যান্য থানার মতো হাওর বেষ্টিত শাল্লা থানায়ও গড়ে ওঠে শান্তি কমিটি। দেখা যায় সদস্য সংখ্যা সাত। থানার ৪টি ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র হবিবপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ছাড়া বাকি ৩টি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ছিল জড়িত। আটগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খালেক গ্রাম দৌলতপুর, বাহারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত গ্রাম সুলতানপুর, শাল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কালাই মিয়া গ্রাম মনুয়া (বর্তমানে তার নামে নিম্ন মাধ্যমিক হতে উন্নীত হয়ে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হয়েছে)। আরো ছিল হাশিম মোড়ল কান্দিগাওঁ, খলিল উল্লা চব্বিশা, নুর মিয়া মোহাম্মদ নগর, এলিম উদ্দীন উজানগাওঁ। তাদের মদদে গড়ে ওঠেছে এলাকায় রাজাকার বাহিনী। গবেষকদের তথ্যমতে বাহারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত এর গ্রাম সুলতানপুরে রাজাকার ছিল ২২জন (প্রায়),শাল্লা ইউনিয়ন চেয়ারমযান কালাই মিয়া চৌধুরীর গ্রাম মনুয়ায় রাজাকার ছিল ১১জন (প্রায়) এবং আটগাঁও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান খালেক এর গ্রাম দৌলতপুরে রাজাকার ছিল ২৪ জন(প্রায়)। তবে শান্তি কমিটির সদস্য যে শুধু শান্তি কমিটিতেই ছিল তা নয়। ওরা সবাই রাজাকার কমিটিতেও ছিল এমন তথ্যও তুলে ধরেছেন এক সময়ের ছাত্রনেতা লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু তার ‘সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ’ নামক র বইয়ের ৮০নং পৃষ্ঠায়।
মার্চ শেষ হলেই এই ৭১—এর এই আকাম—কুকামকারীরা কিংবা তাদের বংশধরেরা খুব শান্তি পায়। কারণ আর ডিসেম্বর বিজয়ের মাস শুরু হলে পরে তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, পাকিদের অত্যাচার নিয়ে, অনাচার নিয়ে, এমনকি তাদের দোসর আলবদর,আল শামস, রাজাকার , শান্তি কমিটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এটা চলে যেতে না যেতে চলে আসে ভাষার মাস; ফেব্রুয়ারি মাস। তখনো পাকিস্তানিদের নিপীড়ন, নির্যাতন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রেরণা, উদীপ্ততা,স্বাধীকারের প্রসঙ্গ চলে আসে। অতঃপর আসে স্বাধীনতার মাস মার্চ। এই দু/তিনটা মাস তারা বেকায়দায় থাকলেও মোটামুটি ১৪ এপ্রিল নববর্ষ চলে গেলে তারা বিভিন্ন কায়দায় লম্প ঝম্প দিয়ে বিভিন্ন সভা সেমিনারে যুক্ত হতে থাকে। এরা তখন বলতে চায়, সবাই শান্তি কমিটির সদস্য হলেও রাজাকার নয়। সবাই রাজাকার হলেও শান্তি কমিটির সদস্য নয়। তার বংশবুনিয়াদ স্বাধীনতা বিরোধী হলেও সে বহুদিন যাবৎ স্বাধীনতার পক্ষের দলে কাজ করে আসছে। যদিও ওরা ছাল—বদলিয়ে বলতে চায় এলাকা রক্ষার্থে শান্তি কমিটিতে নাম লিখেছে। কিন্তু তাদের উদাহরণ খুবই নগন্য। লেখক— রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী, লন্ডন যুক্তরাজ্য।
তথ্যসূত্র–
(১) সংগ্রাম নোটবুক: শান্তি কমিটি—রাজাকার—আলবদর সমাচার
(২) https://songramernotebook.com/archives/56150
(৩) প্রথম আলো,১০অক্টোবর,২০১৩।
(৪) বাংলাদেশ ডকুমেন্টস: প্রথম খন্ড পৃ—৫৪৭৫৭৩।
(৫) রক্তাক্ত—৭১ সুনামগঞ্জ,লেখক— বজলুল মজিদ খসরু।
(৬) সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ, লেখক— রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু