হরলাল সরকার
পুরাকালে চৈত্র বংশে সুরথ নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি শত্রু কর্তৃক আক্রন্ত হয়ে রাজ্যচ্যুত হন। সুরথ রাজা রাজ্য ছেড়ে বনে বনে ঘুরতে থাকেন। ঘুরতে ঘুরতে মেধা মুনির আশ্রমে এলেন। তার মনে জেগে রইল হারানো রাজ্যের জন্য দু:খবোধ আর প্রজাদের জন্য মমতা। একই সময়ে সেই বনে এলেন সমাধি নামে এক বৈশ্য। ব্যবসা করে প্রচুর ধন সম্পদ করেছেন কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও পুত্রগণ তা অসৎ পথে ব্যয় করতে চায়। তিনি বাধা দিয়েছেন বলে তাঁর স্ত্রী পুত্ররা তাঁকে অপমান করেছে। মনের দু:খে তিনিও বনে চলে আসেন। কিন্তু তাঁকে যারা অপমান করেছে, কষ্ট দিয়েছে, তিনি তাদের ভুলতে পারছেন না। সংসার ছেড়ে এসেও তাদের জন্য কষ্ট হচ্ছে। কেন এ কষ্ট, কেন এই অন্তরের টান?
সুরথ রাজা এবং সমাধি বৈশ্য দুজনে দুজনের মনের কথা জানালেন। দুজনেই সমব্যথী। দুজনের এক সাথে মেধা মনির কাছে জিজ্ঞাসা করলেন কেন এমন হয়? তখন মনি বললেন, এটা জগতেরই নিয়ম। এর নাম মায়া আর এই মায়া মহামায়ার প্রভাব। তবে তিনি প্রসন্ন হলে মহামায়া মঙ্গল করেন এবং মুক্তি প্রদান করেন। রাজা সুরথ তখন মহর্ষি মেধার কাছে জানতে চান, কে এই মহামায়া, কী তাঁর স্বরূপ? মেধা বলতে লাগলেন, এই জগত মহামায়ার মুর্তি হলেও তিনি নিত্য, তিনি চিরন্তন, তাঁর ধ্বংস নেই। তিনি আমাদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন। মনি আরও বললেন যে একই দেবী মহামায়া, দুর্গা, অম্বিকা ও কালিকা রূপে আর্বিভূত হয়েছেন। অসুরগণের বিনাশ করে শাস্তি স্থাপন করেছেন। দেবতাগণ তাঁকে স্তুতি করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য মেধা মনির কাছ থেকে দেবীর মাহাত্ম্য ও পূজা পদ্ধতি শিখে নিয়ে দুজনে মিলে দেবীর মৃন্ময়ী মুর্তি নির্মাণ করে পূজা করতে থাকেন। দেবী প্রসন্ন হন। দেবীর কৃপায় সুরথ রাজা তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পান। আর সমাধি বৈশ্য দেবীর কাছে কিছুই চান না। ধন সম্পদের মোহ তাঁর দূর হয়ে গেছে। তিনি চান দু:খ থেকে মুক্তি, চান অন্তরের শক্তি।
যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নম:।।
বহুকাল পূর্বে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ বাধে। তখন দেবরাজ ঈন্দ্র,
দৈত্যরাজ মহিষাসুর। দানবেরা দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গেও সিংহাসনে বসল। স্বর্গহারা দেবতারা দেবরাজ ঈন্দ্রের নেতৃত্বে প্রথমে ব্রহ্মার কাছে গেলেন। ব্রহ্মা দেবতাদের দু:খের কথা শুনলেন। তারপর ব্রহ্মা দেবতাদের নিয়ে বিষ্ণ্ ুও শিবের কাছে গিয়ে তাঁদের দু:খের কথাা জানালেন। ব্রহ্মার মুখে দেবতাদের এমন মর্মান্তিক দুখের কথা শুনে বিষ্ণু আর মহেশ্বর প্রথমে ব্যথিত হলেন, তার পর ক্রুদ্ধমুর্তি ধারণ করলেন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবসহ সকল দেবতাদের শরীর থেকে ভয়ঙ্কর ত্যাজ একত্রিত হয়ে একে নারী মুর্তি সৃষ্টি হলো। ইনিই দেবী দুর্গা। সকল দেবতারা তাঁকে নানান অস্ত্র ও অলঙ্কার দান করলেন। এভাবে দেবী দুর্গা অপূর্ব সাজে সেজে উঠলেন। দেবতারা দেবী জয়ধ্বনি দিলেন। শুরু হল দেবতা ও অসুরদের মধ্যে যুদ্ধ। যুদ্ধে দেবী দুর্গা আর মহিষাসুরের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হয়। অবশেষে দেবী শূলাঘাতে মহিষাসুরকে বধ করেন। দেবতারা স্বর্গ রাজ্য ফিরে পান। দেবরাজ ঈন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা দেবী দুর্গার স্তব করতে থাকেন।
আরেকবার শুম্ভ নামে এক অসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গ দখল করে নিয়ে দেবতাদের তাড়িয়ে দিয়ে স্বর্গ মর্ত পাতালের অধীশ্বর হয়ে বসে। তার ভাই নিশুম্ভ, সেনাপতি চন্ড, মুন্ড, রক্তবীজ প্রতিষ্ঠা করে ত্রাসের রাজত্ব। আবার দেবতারা স্তব স্তুতি করে দেবী প্রসন্ন করে। এবার দেবীর ক্রুধ থেকে আর্বিভূত হন দেবী অম্বিকা। ফলে তাঁ শরীর কালো হয়ে যায়। তিনি পরিচিত হন কালিকা নামে। এই কালিকা অম্বিকাা কাছে শুম্ভ, নিশুম্ভ, চন্ড, মুন্ড, রক্তবীজ পরাজিত ও নিহত হন। দেবতারা স্বর্গের রাজ্য ফিরে পান। এ ভাবে শুধু দেবতারা নয়, সমগ্র জীব-জগতের কল্যাণ সাধন করেন মহাদেবী মহামায়া দেবী দুর্গা। পুরাকাল থেকেই মর্তবাসী বাসী সুখ শান্তি,যশ, প্রতিপত্তি, শত্রুনাশের জন্য শ্রী শ্রী দুর্গা দেবীর পূজা বসন্তÍকালে করতে থাকেন বলে তাঁকে বাসন্তী পূজাও বলা হয়।
ত্রেতা যুগে অযোধ্যার রাজা দশরথ তাঁর মেঝরাণী কৈয়কীকে বরদানের প্রতিশ্রুতিতে জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রী রাম চন্দ্রকে চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে পাঠান। সঙ্গে সীতা দেবী ও ভাই লক্ষণ গেলেন। বন থেকে লঙ্কার রাজা রাবণ সীতা দেবীকে হরণ করে নিয়ে গিয়ে অশুক বনে বন্দী করে রাখেন। এদিকে রাম লক্ষণ দুভাই সীতা দেবীকে অরণ্যের মধ্যে খুঁজতে থাকেন। কিসকিন্ধার রাজা সুগ্রীব, হনুমান, জাম্বুবান, নল, অঙ্গদহর বানর ও ভল্লুক সৈন্যের সহযোগিতায় সুমুদ্র বন্ধন করে লঙ্কা গমণ করেন এবং সীতা উদ্ধারের জন্য রাবণের সাথে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। হনুমান যুদ্ধের আগেই স্বর্ণ লঙ্কা আগুনে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেন। রাবণের ভাই বিভীষণ ছিলেন খুবই ন্যায় পরায়ণ ধার্মিক। তিনি জানতেন শ্রী রাম চন্দ্র শ্রী বিষ্ণুর অবতার। তিনি রামের চরণে নিজেকে সমর্পণ করেন। বিভীষণ রাবণকে অনেক বিনয় করে শ্রী রাম সমন্ধে বুঝিয়েছিলেন এবং শ্রীরামের সাথে যুদ্ধ না করে সীতা দেবীকে মুক্তি দেয়ার জন্য। কিন্তু রাবণ বিভীষণকে ভুল বুঝে লাথি মেরে অপমান কওে তাড়িয়ে দেন। রাবণ ব্রহ্মা, শিব এবং দেবী দুর্গার বরে ত্রিভূবন জয় করে দেবতাদের পর্যন্ত তার গৃহে বন্দী করে রাখেন। আরম্ভ হয় রাম রাবণের যুদ্ধ। যুদ্ধে রাবণের ভাই কুম্ভকর্ণ, পুত্র ঈন্দ্রজিতসহ শত পুত্র মৃত্যুবরণ করেন। অবশেষে রাবণ স¦য়ং রামের সাথে যুদ্ধ শুরু করেন। যুদ্ধে শ্রী রাম রাবণকে বানাঘাতে মুন্ড ছেদন করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই কাটা মুন্ড জোড়া লেগে শত মুখে রাবণ হাসতে থাকে আর রামকে বধ করার জন্য ব্রহ্ম অস্ত্র্র প্রয়োগ করতে উদ্যত হলে দেবী দুর্গা রাবণের সন্মুখে আর্বিভূত হয়ে যুদ্ধের নিয়ম মেনে সন্ধ্যার পর যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দেন। রাবণ বলে আমি ত্রিভূবন বিজয়ী রাবন যুদ্ধের নিয়ম মেনেই রাম চন্দ্রকে বধ করব।
রাত্রিতে শিবিরে নিদ্রা অবস্থায় শ্রী রাম চন্দ্রকে স্বপ্নে দেবী দুর্গা দেখা দিয়ে বলেন, ’’হে রাম ভক্তিসহকারে আমার পূজা কর তবেই উদ্দেশ্যে সফল হবে।’’ প্রভাতে রাম চন্দ্র ভাই লক্ষণকে বললেন,’’তুমি সবাই ডেকে বলে দাও আমি ভগবতী দশভূজার পূজা করব। লক্ষণ সবাইকে ডেকে রামের সন্মুখে আনলেন এবং রাম সবাইকে পূজার আয়োজন করা বললেন। কিন্তু দুর্গা পূজা করতে হয় বসন্তকালে আর তখন শরৎ কাল, কি ভাবে পূজা হবে? শ্রী রাম চন্দ্র সিদ্ধান্ত নিলেন অকালেই মা দশভূজার পূজা করবেন। মায়ের মৃন্ময়ী মুর্তি নির্মাণ করে যথাবিহিত প্রথমে দেবী দুর্গার অকাল বোধন করলেন। পরের দিন বিহিত ষষ্ঠী পূজা, মহা সপ্তমী পূজার সময় মিত্র বিভীষণ এসে বললেন, মায়ের পূজায় ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে পূজা করতে হবে। শ্রী রাম হনুমান বললেন, হনুমান যাও দেবীদহ পাহাড়ের হ্রদ হতে ১০৮টি নীল পদ্ম নিয়ে আস। হনুমান জয় রাম বলে এক লম্প দিয়ে দেবীদহ হতে ১০৮টি নীল পদ্ম নিয়ে এসে প্রভু রাম চন্দ্রের হাতে দিলেন। শুরু করলেন মহা অষ্টমী পূজা। একটি একটি করে নীল পদ্ম দিয়ে মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত একটি পদ্ম কম হয়ে গেল। রাম চন্দ্র বললেন একি হলো হনুমান একটি পদ্ম কম হলো কেন? তুমি কি ১০৮টি পদ্ম এনেছিলে? হনুমান বলল, প্রভুচাঁদ আমি একটি একটি করে গুনে ১০৮টি পদ্মই এনেছি। রাম চন্দ্র আক্ষেপ কওে বলেন, হনুমান আমার কি ভগবতী পূজা হবে না আর সীতা উদ্ধার করা হবে না। হনুমান আবার বলল, প্রভুচাঁদ আমার মনে হয় দেবীই একটি পদ্ম চুরি করেছেন। তখনেই শ্রী রাম চন্দ্র বললেন আমার চোখ দুটি চোখেই নীল পদ্মের ন্যায় তাই আমার এক নাম কমলাক্ষ। এই মুহূর্তে আমার একটি চক্ষু উৎপাঠন করে মায়ের চরণে শেষ পুষ্পাঞ্জলি দেব বলেই তীর ধনুক হাতে নিয়ে চক্ষু উৎপাটন করতে যাচ্ছেন; ঠিক সেই মুহূর্তে দেবী দূর্গা আর্বিভূত হয়ে রাম চন্দ্রের হাত ধরে বললেন, রাম আমি তোমায় পরীক্ষা করছিলাম। আমি তোমার পূজায় তুষ্ট, তুমি যুদ্ধে বিজয়ী হবে। এভাবেই শ্রী রাম চন্দ্র দেবী দূর্গার পূজা সমাপন করে পরদিন যুদ্ধে রাবণ বধ করে সীতা দেবীকে উদ্ধার করে ন্যায় ধর্ম ্ও ত্রিভূবনে শান্তি স্থাপন করেন। আর এর পর হতে মর্তবাসী বাসী সুখ,শান্তি, যশ, প্রতিপত্তি, দুর্গতিনাশের জন্য শরৎকালের আশ্বিন মাসের দেবীপক্ষে যথাবিহিত শ্রী দুর্গাদেবীর পূজা শুরু করে আসছে। জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে এ সকলেই এ উৎসব উদযাপন করেন। পুরাণ মতে দুর্গাপূজা মূলত বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হলেও শারদীয় দুর্গোৎসবই বর্তমানে অধিক সমাদৃত ও প্রচলিত হওয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সব চেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে।


