বিশেষ প্রতিনিধি
‘রাত ৯ টা (শুক্রবার)। বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে রয়েছেন কয়েক’শ কৃষক। পানি ঘণ্টায় বাড়ছে ১ ফুট। কৃষকরা মাটি নিয়ে কোলাতে পারছিলেন না। পানি যখন বাঁধের এক দেড় ইঞ্চি নিচে তখন মাটির বোঝা মাথায় নিয়ে হাউ-মাউ করে কাঁদতে থাকেন কৃষকরা। রাত সোয়া ৯ টায় কয়েক স্থানে বাঁধের উপর দিয়ে পানি যাওয়া শুরু হয়। কৃষকদের বেশিরভাগেই টুকরি-কোদাল হাত থেকে ফেলে একজন-আরেকজনের গলায় জড়িয়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকেন। এক পর্যায়ে বাঁধের কোন কোন অংশের কৃষকরা চিন্তায় পড়ে যান, বাঁধ ভেঙে গেলে তাঁরা নিজেরা বিপদে পড়ে যাবেন। ওখান থেকে যাওয়াই কষ্টকর হয়ে ওঠবে, পরে নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেন কৃষকরা।’
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের প্রায় ৭ হাজার হেক্টর, নেত্রকোনার খালিয়াজুরি ও মদন এবং কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিটামইনের কয়েকটি হাওর রক্ষার জন্য নির্মিত ছায়ার হাওরের বাঘরাধরা এবং উদঘল-বিছনাই বাঁধ রক্ষার শেষ লড়াইয়ের দৃশ্য এভাবেই বলছিলেন শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস।
কালনী নদীর পানি কূল উপচে দিরাইয়ের বরাম হাওরের তুফানখালি বাঁধ ভেঙে পহেলা এপ্রিল ডুবেছে বরাম হাওর। বরাম হাওর ডুবে যাওয়ায় পর পানির চাপে মাছুয়াখাড়া বাঁধ ভেঙে গিলটিয়া হাওর ডুবিয়েছে। বৃহস্পতিবার এই পানির ধাক্কায় দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বৃহৎ ছায়ার হাওরের বাঘরাধরার দুটি বাঁধ এবং জয়পুরের মরা নদীর দুটি বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছিল। এই অবস্থায় শাল্লা উপজেলার শিবপুর, কল্যাণপুর, কৃষ্ণপুর, মামুদনগর, অজয়কান্দা, শশারকান্দা, উজানগাঁও, নলুয়ারগাঁও, নিয়ামতপুর, আনন্দপুর, নোয়াগাঁও, টরগাঁও, আঙ্গাউড়া, সুখলাইন, ও শান্তিপুর এবং নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক বৃহস্পতিবার থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। শুক্রবার রাত সোয়া ৯ টায় কৃষকদের চোখ দিয়ে একদিকে পানি ঝরছিল, অন্যদিকে ডুবছিল ছায়ার হাওর। রাত ২ টায় সকল কৃষকই হাওর রক্ষা বাঁধ ছেড়ে চলে আসেন।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অবনি মোহন দাস বললেন,‘কৃষকদের লড়াইয়ে আমিও সঙ্গে ছিলাম, আমার মনে হয়েছে বাঘরাধরা বাঁধে সাড়ে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও ৩ লাখ টাকার বেশি মাটি কাটা হয়নি।’।
গভীর রাত অবধি বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে থাকা খালিয়াজুরির কৃষ্ণপুরের বাবুল মাস্টার বলেন,‘ছায়ার হাওরের বাঘরাধরা, উদঘল ও বিছনাই বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে খালিয়াজুরির কয়েক হাজার কৃষক শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছেন। এই বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় শাল্লার কালিকুটা হাওর এবং ছায়ার হাওর ডুবে যাওয়ায় নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মদন, কিশোরগঞ্জের ইটনা ও মিটামইন উপজেলার হাওরগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
বাঁধের কাজের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ছায়ার হাওর পাড়ে ছিলেন মামুদ নগরের কৃষক হাবিবুর রহমান হবিব। তিনি বলেন,‘ছায়ার হাওরের বাঘড়াধরা, উদঘল-বিছনাই বাঁধে পিআইসিরা খুব কম কাজ করেছে। এই বাঁধের আরেক পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি) সভাপতি প্রদীপ ভৌমিকের ১৪ লাখ টাকার বরাদ্দ ছিল। কাজ করিয়েছেন ৩ লাখ টাকার বেশি হবে না।’
ছায়ার হাওর পাড়ের নলুয়ার চরের কৃষক অব. শিক্ষক হীরেন্দ্র কুমার রায় বলেন,‘শনিবার সকালে এসে কয়েক’শ কৃষক হাওর পাড়ে নিজের ডুবে যাওয়া জমি দেখার জন্য বসেছিলেন। অনেকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে হাওর পাড়ে বসে বিলাপ করছেন।’
এই বাঁধের কাজে নিয়োজিত পিআইসির সভাপতি ইউপি সদস্য শিথিল চন্দ্র দাস ও ইউপি সদস্য প্রদীপ ভৌমিক দু’জনেই বললেন,‘আমরা অর্থ বরাদ্দ যা পেয়েছি, এর চেয়েও বেশি কাজ করিয়েছি।’ শিথিল চন্দ্র দাস দাবি করলেন,‘সাড়ে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও, আমি ৬ লাখ টাকা শেষ পর্যন্ত পেয়েছি, কাজ করিয়েছি ৭ লাখ টাকার উপরে।’
ইউপি সদস্য প্রদীপ ভৌমিক বলেন,‘বরাদ্দ ১৪ লাখ হলেও আমি সর্বশেষ ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা পেয়েছি, কাজ করেছি ৮ লাখ টাকার উপরে।’
পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আফসর উদ্দিন বলেন,‘বাঘড়াধরা বা জয়পুর বাঁধের পিআইসিগণ কাজ না করলে শুক্রবার রাত পর্যন্ত বাঁধ টিকতো না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জাহিদুল হক বলেন,‘ছায়ার হাওরের সুনামগঞ্জ অংশে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে।’


