শাল্লায় গৃহহীনদের বিক্ষোভ

বিশেষ প্রতিনিধি
আশ্রয়হীণদের দেওয়া হাওরের তলানির উপজেলা শাল্লার ১৬০০ ঘরের মধ্যে যে সব ঘর এখনো নির্মিত হয় নি। সেসব ঘর কেটে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এই সংবাদ গত সোমবার শাল্লায় পৌঁছালে মঙ্গলবার কয়েক’শ গৃহহীন উপজেলা সদরে বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে ঘর না কাটার দাবি জানিয়ে বলেছে, যারা অনিয়ম করেছে, তাদের বিচার হতে পারে, গৃহহীনদের ঘর কেটে নেওয়া কোনভাবেই মানবো না আমরা।
জানা যায়, জেলার একেবারে প্রত্যন্ত উপজেলা শাল্লার ৪ ইউনিয়নের জন্য ১৬০০ ঘর বরাদ্দ হয়েছিল। উপজেলার শাল্লা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় ১০০ আশ্রয়হীণের জন্য নতুন গ্রাম ‘মুজিবনগর’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই উপজেলায় যাতে আশ্রয়হীণ না থাকে সেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন জেলা প্রশাসন। কিন্তু ঘর তৈরি’র দায়িত্ব পালনকারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ওই উপজেলা থেকে কিছু ঘর কেটে জেলার অন্য উপজেলায় সরিয়ে নেবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার শাল্লার গৃহহীনদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছালে মঙ্গলবার দুপুরে কয়েক’শ গৃহহীন উপজেলা সদরে এসে উপজেলা পরিষদের সামনে বিক্ষোভ করেছে।
বিক্ষোভকারী উপজেলার চাকুয়া গ্রামের সুশীল দাস বললেন, সরকারি খাস জমিতে ভাঙাচোরা ঘরে থাকতাম। প্রধানমন্ত্রীর উপহার পেয়ে সেটি ভেঙে ফেলেছি। এখন এই ঘর কেটে নিলে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে।
এই গ্রামের হেলন রানী দাস বললেন, পুরাতন একছালার ঘর ভেঙে শেখ হাসিনার দেওয়া ঘর বানানোর কাজ শুরু করেছি। এখন ঘর কেটে নিলে আকাশ মাথায় লেগে যাবে। যারা দুর্নীতি করেছে তাদের শাস্তি হোক। আমাদের ঘর কেন কেটে নেওয়া হবে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বললেন, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে মানুষ এসে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, বিক্ষোভ করছে। বলতে গেলে ঘেরাও করে রেখেছে। এখন আমাদের মার খাওয়ার অবস্থা। নতুন মাটিতে যারা ঘর করতে চাইছে যেমন কান্দিগাঁও, শাল্লা কলেজের পাশে এসব কিছু ঘর (৫০-৬০ টির মতো হবে) কেটে নিলে আমাদেরও আপত্তি থাকবে না, কিন্তু ২৩০ টির মতো ঘর মালামাল পৌঁছেনি বলে কেটে নেবার সিদ্ধান্তে আমরা বিপদে পড়েছি।
প্রসঙ্গত. শাল্লায় প্রধানমন্ত্রীর উপহার প্রদান নিয়ে কিছু এলাকায় আর্থিক লেনদেন হয়েছে, এমন তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোয়েন্দা সংস্থাও এমন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরেও ‘ঘর পেতে শাল্লায় টাকা দিতে হচ্ছে’ এমন সংবাদ ছাপা হয়েছে। একারণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি ওখানে একাধিক কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে তদন্ত করিয়ে ওই উপজেলার যেসব ঘর এখনো নির্মিত হয় নি সেগুলো কেটে অন্য উপজেলায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মঙ্গলবার বিকালে এ প্রতিবেদককে জানান, প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়হীনের ঘর নিয়ে কোন অনিয়ম সহ্য করা হবে না। অনিয়মের প্রেক্ষিতে ওখানে একাধিক কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করানো হয়েছে। আপনারাও রিপোর্ট করেছেন, আমি নিজে ওখানে যেয়ে তদন্ত করেছি, আমার মনে হয়েছে ওখানকার অনেক ঘরই বর্ষার আগে নির্মাণ করা সম্ভব নয়। এজন্য যেখানে একেবারেই মালামাল পৌঁছেনি বা সামান্য পরিমানে মালামাল পৌঁছেছে, সেগুলো কেটে অন্য উপজেলায় নিয়ে দ্রুত গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, শাল্লার আশ্রয়হীণদের মধ্যে যাদের যাতায়াত খরচের বা অন্যান্য খরচের টাকা না দিয়ে দরিদ্র মানুষদের চাপ দিয়ে খরচ করানো হচ্ছিল তাদের কাউকে কাউকে ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে টাকা ফেরৎ দেওয়া হয়েছে। রবিবার শাল্লার নারকিলা গ্রামের ৯ আশ্রয়হীণ পরিবারকে ৬ হাজার টাকা করে ফেরৎ দিয়েছেন ইউপি সদস্য এলাছ মিয়া।
ইউপি সদস্য এলাছ মিয়া বললেন, এই টাকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিয়েছেন ফেরৎ দেবার জন্য। ৬ হাজার টাকার মধ্যে মালামাল পরিবহনের ৪ হাজার টাকা, রডের ১ হাজার এবং নাট বল্টুর জন্য ১ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। যারা ঘর বানিয়ে ফেলছে, বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ করেছিল তাদেরই এই টাকা ফেরৎ দেওয়া হয়েছে।
আগে কেন এই টাকা দেওয়া হলো না, এই প্রশ্নের উত্তরে ইউপি সদস্য বললেন, আগে দিলে তো নানা সমস্যা সৃষ্টি হতো না, কেন দেওয়া হলো না আমি জবাব দিতে পারবো না। আমাকে তিনি যেভাবে আদেশ দিয়েছেন, সেভাবে আমি টাকা তুলে দিয়েছি ৯ পরিবারের কাছে।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল মুক্তাদীর হোসেন ফোন না ধরায় এ ব্যাপারে তার বক্তব্য জানা যায় নি।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বললেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মিটিংয়ে আছেন। এজন্য ফোন ধরতে পারছেন না। তিনি জানান, গৃহহীনদের পরিবহন খরচসহ অন্য যে ৬ হাজার টাকা ফেরৎ দেওয়া হচ্ছে, তা আগে থেকেই বলা ছিল, বিল প্রাপ্তি সাপেক্ষে তাদের টাকা দেওয়া হবে। তারা যেন নিজেরা খরচ করেন। সেভাবেই তারা খরচ করেছে। এখন টাকা ফেরৎ দেওয়া হয়েছে।