শাল্লায় হয়ে গেলো ঐতিহ্যবাহী সোমাই ঠাকুরানীর মেলা

স্টাফ রিপোর্টার
শাল্লা উপজেলায় হবিবপুর ইউনিয়নের দাড়াইন নদীর পূর্বপাড়ে প্রায় পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী সোমাই ঠাকুরানী (হুমাই ঠাকুরের মেলা) মেলা শেষ হয়েছে। ফাল্গুন মাসের শেষ সোমবার এক দিনের এই মেলায় হাজারো মহিলার সমাগম ঘটে। নারীদের দেবি সোমাই ঠাকুরানীকে কেন্দ্র করেই এই মেলা জমে ওঠে। একসময় এই মেলায় কেবল নারীরাই যেতেন। দোকানী ক্রেতা সকলেই ছিলেন নারী। ক্রমে ক্রমে এখন কিছু তরুণরা এই মেলায় যায়। কিছু পুরুষ দোকানী বসেন মেলায়। তবে সেই সংখ্যা বেশি নয়।
নারীরাই দেবির কাছে সংসার, সন্তান, সুন্দর আগামীসহ হাওরের কৃষি সম্পদ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার প্রার্থনা করেছেন সোমবার দিনব্যাপি। সোমবার রাতে ঠাকুরানীকে নিবেদন করে তলায় কীর্তন গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই লোকায়ত মেলা।
সোমাই ঠাকুরানি দেবীকে সাধন ভজন করতে নারীরা জড়ো হন হবিবপুর ও আনন্দপুর গ্রামের মধ্যবর্তী দাড়াই নদীর তীরে। দেবিকে পূজা অর্চনা, ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ ও মনোবাসনা পূরণের জন্য বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে দেবির কৃপা কামনা করেন শত শত নারী। বৈশাখে জমির ফলন নিরাপদে গোলায় তোলতে দেবির চরণে দেওয়া মাটিজল দুধ ছিটিয়ে দেন হাওরের জমিতে।
পূজার্থীরা বলেছেন এক সময় সনাতন ধর্মের নারীরা মেলায় অংশ নিলেও এখন অন্য ধর্মাবলম্বি নারী পুরুষও আসছেন এই উৎসবে। এই উপলক্ষে মাদারিয়া হাওরের কান্দায় প্রতিবছর এই দিনে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। নানা ধরনের পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন দোকানীরা। সেখানে কেনাকাটা করেন নারীরা।
মেলায় আসা নারীরা জানান, সোমাই ঠাকুরানী নারীদের দেবী। তারা প্রতি বছর ফালগুন মাসের শেষ সোমবার দেবীর তলায় এসে পুজা করতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন। দেবীর তলার মূল স্থানে কেবল নারীদের প্রবেশাধিকার থাকে। পুরুষরা এলেও বাইরে থাকেন। নারীরা ভোরে নিজ বাড়ি থেকে পবিত্র হয়ে রান্না-বান্নার সকল উপকরণ নিয়ে এসে রান্না বান্না করে প্রসাদ ও ভোগ বিতরণ করেন ভক্তদের। এই দিন পাশের গ্রাম গুলোতে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুলোয় আগুন দেন না গৃহিণীরা। দেবিকে পূজা দিয়ে এসেই তারা রান্না বান্না করেন। তারা যতক্ষণ অবস্থান করেন, দেবীকে ভক্তি দিয়ে জড়ো হয়ে পূজার নৈবেদ্য সামনে নিয়ে কীর্তন করেন। যাবার সময় তারা দেবীর অধীষ্ঠানস্থল থেকে আর্শিবাদ হিসেবে ধুলো ও ভেজা জল নিয়ে সুস্থ্য থাকার বাসনায় শরীরে মাখেন। বিবাহিত, অবিবাহিত, বৃদ্ধা, কিশোরী, পতিহারা নারী, যুবতি ও শিশু কন্যারা রাধা কৃষ্ণের লীলাআখ্যান সুরে সুরে পাঠ করে খাসা করতালে বাদ্যে গোপিনি কীর্তন করে দল বেঁধে সোমাই ঠাকুরানীর তলায় আসেন তারা।
হাওর-ভাটির এই লোকায়ত শত বছরের উৎসবে দুর্গম পথ মাড়িয়ে দলে দলে আসা নারীরা সোমাই ঠাকুরানীকে নারীদের ভাগ্যদেবী হিসেবে জানেন। ভাগ্যদেবির কাছে তারা নিজেদের সমর্পন করে জীবন, সম্পদ, সন্তান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে হাওরের কৃষি রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বাড়ি ফিরেন আবহমান কাল থেকে। তাদের বিশ^াস দেবীর আশির্বাদ সকল দুঃখ ঘুচে যাবে।
হাবিবপুর ইউনিয়নের আনন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা দ্রুবতী রানী তালুকদার বলেন, আমাদের মেলা পুরোনো ঐতিহ্য। ঠাকুরের কাছে ভক্তি দেয়ার জন্য প্রতিবছর এখানে আসি। এখানে এসে বাচ্চা-কাচ্চাদের জন্য মিষ্টি কিনে নিই। দেশের মঙ্গল, পরিবারের মঙ্গল কামনা করেছি। হাওরের ফসল যেনো ভালো হয় এজন্যও প্রার্থনা করেছি।
একই গ্রামের বাসিন্দা অর্চনা রানী পাল বললেন, সামনে বৈশাখ মাস আসছে, ধান যেনো ভালো হয় সে প্রার্থনা করেছি। ফাল্গুনের শেষের সোমবারে এখানে কীর্ত্তণ হয়। এসময় সারাদিন আমরা উপবাস থাকি। গত ত্রিশ বছর ধরে এখানে আসি। আমার শ^াশুড়ি এখানে এসেছেন, তাঁর শ^াশুড়ি মাও এখানে এসেছেন।
সোমাই ঠাকুরানী তলার পুরোহিত অখিল চক্রবর্তী বললেন, এখানে পাঁচশত বছর ধরে মেলা হচ্ছে। আমরা যখন বিপদে পড়ি, খড়া বা অতিবৃষ্টি হয় তখন এখানে এসে প্রার্থনা জানাই। কারও রোগ হলেও এখানে এসে প্রার্থনা করেন। আজকে (সোমবার) রাতে সোমাই ঠাকুরানীর মেলা শেষ হলো।
শাল্লা উদীচীর সভাপতি তরুণ কান্তি দাস বললেন, ছোটবেলা থেকে দেখছি, আমার ঠাকুমা-দিদিমারা এখানে এসেছেন। পরে এসেছেন মা-কাকিরা। এখন স্ত্রী, বোন, মেয়েরা যায়। বহুবার মেলায় যাওয়ার দেখার ইচ্ছে জেগেছে। কিন্তু যখন শুনি নারীদের ভিড়ে ঠাসা, তখনই বিব্রত হয়ে যাওয়া হয় নি। এখন বয়স ষাটের কাছাকাছি বাড়ির পাশের এই মেলায় যাওয়া হয় নি। গত কয়েক বছর হয় কিছু তরুণও মেলায় যায়। কিছু পুরুষ দোকানীও বসে। এটি দৃষ্টিকটু, এটা না হলেই ভালো হয়।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তালেব বললেন, এই বছর আমি স্টেশনে না থাকায় খেওয়াল করতে পারি নি। আগামী বছর ঐতিহ্য অনুযায়ী মেলা বসবে। প্রয়োজনে নারীদের দিয়ে ওখানে পরিচালনা কমিটি করে দেওয়া হবে। মহিলা পুলিশ থাকবে মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।