শাল্লা হাসপাতালে চিকিৎসকদের পালাক্রমে অনুপস্থিতি

চাকুরিতে ঢুকেই পালাক্রমে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভ্যাস রপ্ত করে ফেলার মধ্যে এক ধরনের মুন্সিয়ানার পরিচয় থাকলেও জনস্বার্থে এই অভ্যাসটি ভয়ংকর। গতকাল শাল্লা উপজেলার সদর হাসপাতালে ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সহ চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে নবীন চিকিৎসকদের মধ্যে এই ধরনের মারাত্মক স্খলন লক্ষ করা গেছে। বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে একযোগে সরকার অনেক চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছিলেন, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক জনপদে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার বিধান করা। এই উদ্দেশ্যে প্রত্যন্ত শাল্লা উপজেলায়ও কয়েকজন চিকিৎসকের পদায়ন ঘটে। সব মিলিয়ে এখন ওখানে ৮ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। সংবাদের তথ্য অনুসারে সোমবার কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন ৪ জন চিকিৎসক। আরও দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যে ৪ জন কর্মস্থলে রয়েছেন তাদেরকেও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক হাসপাতাল পরিদর্শন কালে উপস্থিত দেখতে পাননি। চিকিৎসক কিংবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকার পরিবর্তে জরুরি বিভাগে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া ওয়ার্ডবয় রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন বলে দেখা গেছে। এসময় হাসপাতালের একজন উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার পাশের ডায়গনস্টিক সেন্টারে প্রাইভেট রোগী দেখায় ব্যস্ত ছিলেন। সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে ,শাল্লা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বেতন তোলার সময় স্টেশনে আসেন। এই সুযোগে অন্য ৭ চিকিৎসক নিজেদের মধ্যে রোস্টার করে পালাক্রমে অনুপস্থিত থাকছেন। এমন অবস্থায় শাল্লার সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা দিতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারী এই হাসপাতালটি।
প্রথমেই বলছিলাম, অভ্যাসের কথা। যে চিকিৎসকরা চাকুরীতে যোগদানের পরই পালাক্রমে অনুপস্থিত থাকার অভ্যাস করতে পারেন তারা কোন্ ধরনের দায়বদ্ধতা পোষণ করেন? শিক্ষা জীবনে তাঁরা নিশ্চয়ই এখানে ওখানে বড় বড় আদর্শের কথা বলেছেন। কিন্তু যখনই ওই আদর্শ নিজেদের জীবনে প্রতিফলন ঘটানোর সময় এলো তখনই তাঁরা ইউটার্ন নিয়ে শিক্ষা জীবনে মুখস্থ করা সব আর্দশ ভুলে বসলেন বেমালুম। এই বোধ হয় প্রশাসনিক সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির আওতায় আসলেই আওতাভুক্ত ব্যক্তিরা এতে আক্রান্ত হয়ে যান। নতুবা একেবারে কর্মজীবনের ঊষালগ্নে কেউ এমন আচরণ করতে পারেন না। অবশ্য এই নবীন চিকিৎসকদের দোষ দিয়েই লাভ কী? তাঁদের যিনি তদারকি করবেন সেই স্বাস্থ্য কর্মকর্তাই যদি দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে অধীনস্তরা সুযোগ নিবেই। তিনি নিজে একই ধরনের অনৈতিকতা অবলম্বন করে অন্যের অনৈতিকতা রোধ করতে পারবেন না। ফলে যে গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসছিল শাল্লার স্বাস্থ্য বিভাগ সেই গড্ডলিকা প্রবাহেই ভাসতে থাকবে।
আমাদের সবিনয় জিজ্ঞাসা শুধু, এইভাবেই চলবে সবকিছু? এ থেকে উত্তরণ ঘটানোর কোনো আশার আলোই কি আমরা দেখতে পাব না? জানি, কোনো উত্তর নেই। কেউ কোনো উত্তর দিবেন না। যে প্রতিবেদক শাল্লা থেকে এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন তিনিই বলছেন, বারবার চেষ্টা করেও তিনি সিভিল সার্জনের বক্তব্য নিতে পারেননি। সিভিল সার্জন ফোন ধরেননি। সিভিল সার্জন অতিশয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি আমরা জানি। তিনি পুরো জেলাবাসীর প্রতিবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জেলায় পদায়ন নিতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তিনি কেন ফোন ধরতে যাবেন। ধরলেই বা কী বলতেন। গতানুগতিক কথাই বলতেন যা আমরা যুগের পর যুগ শুনে আসছি। সিভিল সার্জন যেমন ফোন না ধরে নির্লিপ্ততা দেখিয়েছেন সেই ধরনের আশ্চর্য নির্লিপ্ততা কবে আমাদের সেবাখাত থেকে অবসান ঘটবে তার উত্তর আমাদের জানা নেই। আমাদের আফসোস শুধু এটুকু, জনগণের করের টাকায় এত এত চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে জনগণের অর্থের অপচয় ঘটানো হ্েচ্ছ। লোক না থাকলেও যা লোক থাকার পরও যদি একই অবস্থা বিরাজমান থাকে তাহলে এই আফসোস হয় বৈকি।