পাবলিক পরীক্ষায় বহু নির্বাচনী প্রশ্ন বা এমসিকিউ থাকবে কিনা সে নিয়ে সরকারি পর্যায়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটছে না। গত এসএসসি পরীক্ষার প্রায় প্রতিটি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁসের পেছনে এমসিকিউকে দায়ী করা হয়েছে ব্যাপকমাত্রায়। বলা হয়েছে, এমসিকিউ’র সমাধানসহ একটি চক্র পরীক্ষার্থীদের টাকার বিনিময়ে সহায়তা করত। অন্যদিকে এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় গণহারে জিপিএ-৫ পাওয়ার বিষয়েও শিক্ষাবিদরা এই এমসিকিউকে দায়ী করেছেন। এরকম অবস্থায় সরকারি পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল আগামী বছর থেকে পাবলিক পরীক্ষায় এমসিকিউ থাকবে না। গতকাল দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা গেল, অন্তত এবার জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জেডিসি পরীক্ষায় এমসিকিউ পদ্ধতির প্রশ্ন বহাল থাকবে। আমাদের দেশে শিক্ষাপদ্ধতি, পাঠ্যসূচী, প্রশ্নপত্র, পরীক্ষা পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা নীরিক্ষা করা হচ্ছে। কোন পদ্ধতিই থিতু হতে পারছে না। এর ফলে পরীক্ষার্থীরা সার্বক্ষণিক তটস্থ থাকেন সামনের বছরে তারা কোন পদ্ধতিতে পড়াশোনা করবেন বা পরীক্ষা দিবেন সে নিয়ে। এটি তাদের শিক্ষা জীবনকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। আজ প্রশ্নফাঁসের মতো একটি মন্ত্রণালয়কেন্দ্রীক ব্যর্থতাকে এমসিকিউ দিয়ে আড়াল করে দেয়ার সুনিপুণ প্রচেষ্টা চলছে। অথচ প্রশ্ন ফাঁসের জন্য মূল দায়ীদের কারও ধরা পড়ার কোন খবর পাওয়া যায় না। এই ব্যর্থতার দায় নিতেও অনীহ মন্ত্রণালয়। এরকম একটি অবস্থায় শিক্ষার জাতীয় মান যে খারাপ হতে বাধ্য তা বলাই বাহুল্য।
এমসিকিউ’র সাথে আরেকটি বিতর্কিত বিষয়বস্তু হলো সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতি। বলা হচ্ছে, শিক্ষকদের বড় অংশ সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেননি। তাই তারা প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য গাইড বইয়ের শরণাপন্ন হন। এই পদ্ধতিতে শিক্ষা দানে শিক্ষকগণের প্রয়োজনীয় পারদর্শিতার অভাবে শিক্ষার্থীরাও সৃজনশীল পদ্ধতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। অন্যদিকে আমাদের শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে ভীষণ রকম অনিচ্ছুক। তাঁরা কোচিংসেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনে অতিমাত্রায় আসক্ত। এর ফল হচ্ছে অভিভাবকদের ছাত্রদের পিছনে খরচের পরিমাণ বেড়ে গেছে বহু বহু গুণ । আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারগুলো এত টাকা খরচ করে সন্তানদের জন্য শিক্ষা নামক পণ্যটি কিনতে পারছেন না। ফলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই একটি শ্রেণিবৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার কথা আমরা মুখে বলি বটে তবে কার্যত শিক্ষা এখন হয়ে উঠেছে স্বচ্ছল ও সামর্থবান শ্রেণির আয়ত্বাধীন একটি ক্রয়যোগ্য বস্তু মাত্র। শিক্ষার এমন পণ্য হয়ে উঠার মধ্যেই মূলত প্রশ্ন ফাঁসের অপসংস্কৃতিটিও সরাসরি সম্পর্কিত। সুতরাং শিক্ষাকে জনগণের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক চাহিদার জায়গায় রাখতে হলে অবশ্যই একে পণ্যে পরিণত করার সর্বনাশা পতন থেকে রক্ষা করতে হবে।
কেবলমাত্র বছরে একটি পরীক্ষার ফলাফলের মধ্য দিয়ে মেধা নিরুপণের বর্তমান ভ্রান্ত পদ্ধটির কারণে আজ শিক্ষার মানের নি¤œাভিমুখী যাত্রা শুরু হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। প্রতিটি শ্রেণির পাঠক্রমের একটি নির্দিষ্ট শিখনমাত্রা নির্ধারিত থাকে। এই শিখনমাত্রাটি প্রতিদিনই শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থার কোন অস্তিত্ব কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং একে পণ্য হওয়ার প্রবণতা থেকে মুক্ত করার মধ্য দিয়েই কেবল কাক্সিক্ষত মান অর্জন সম্ভব। এই বিষয়টি বুঝতে হবে সর্বাগ্রে।

