উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে তাকে মোটামোটি সন্তোষজনকই বলা যেতে পারে। পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্তি, নারী পরীক্ষার্থীদের সাফল্য সবকিছুতেই সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। তবে বরাবরের মতো এবারও মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মেধায় পিছিয়ে থাকার চিত্র ফুটে উঠেছে। মেধা কিংবা পরীক্ষার ফলাফল যেনো শহুরে বা নগরকেন্দ্রীক স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়ে গেছে। জাতীয় শিক্ষাচিত্রে এটি একটি বৈসাদৃশ্য বিষয় বটে। এর মধ্য দিয়ে সারা দেশে মেধা বিকাশের যে স্বপ্ন আমরা লালন করি সেটির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আগে প্রায়সই মফস্বলের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত মেধা তালিকায় উঠে আসার খবর পাওয়া যেতো। এখন আর সেটি হয় না। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাগত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এখানে গ্রামের শিক্ষার্থীদের দীন অবস্থান প্রকট হয়। গ্রাম ও শহরের ফলাফলে কেন এমন বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে? প্রশ্নটি জোরালো এবং এর ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ এখন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম চাহিদা হওয়া উচিৎ।
এখন ভাল ফলাফল করতে কিংবা ভাল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হলে প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়। শুধু মেধা দিয়ে এখন পড়াশোনা সম্ভব নয়। পয়সা খরচের প্রশ্ন যখন আসে তখন সংগত কারণেই গ্রামের গরিব অভিভাবকরা পিছিয়ে থাকবেন। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা এখন পল্লীবাসীর না থাকলেও নিজের সন্তানের শিক্ষার পিছনে মাস মাস কয়েক হাজার টাকা খরচ করার মতো অবস্থানে পৌঁছাতে তাদের এখনও অনেক বাকি রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো, উপকরণ ও শিক্ষক দৈনতাও প্রকট। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিজ্ঞান বিভাগ উঠে যাচ্ছে। অংক ও ইংরেজি বিষয়ে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। পাঠ্যসূচীতে নতুন অন্তর্ভূক্ত তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে এখনও বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নেই। টানাপোড়েনের সংসারে প্রাত্যহিক অভাববোধ দ্বারা প্রভাবিত শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্থ থাকে। এমন অবস্থায় গ্রামের শিক্ষার্থীরা সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে যাবে, এ হলো স্বতঃসিদ্ধ।
আমাদের দেশ শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন আরও অগ্রগতি অর্জন করতে চায়। শতভাগ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী পেতে হলে এই প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এরকমই আছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ভিন্ন এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়। শিক্ষা অর্জনের বিষয়টিকে প্রাইভেট টিউশন, গাইডবই আর কোচিং প্রতিষ্ঠানের খপ্পর থেকে বের করে শ্রেণি কক্ষের ভিতরে নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত পাঠ গ্রহণে সক্ষম হয় এবং এর ভিত্তিতে বাড়িতে তৈরি হতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিবেশ তৈরি ভিন্ন বিকল্প কোন উপায়ে শিক্ষার প্রত্যাশিত উন্নয়ন ঘটানো সম্বব হবে না। এজন্য শিক্ষকদের মানসিকতার পরিবর্তনসহ তাঁদের চাকুরিগত সুবিধা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। সরকার সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের পর প্রচুর সংখ্যক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে ওই লক্ষপানেই হাঁটছেন। এখন যদি শিক্ষাদানকে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে আসা যায় তাহলে গ্রাম-শহরের শিক্ষার বৈষম্য কমতে বেশিদিন লাগবে না। এর মধ্য দিয়ে আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত করে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন পূরণেই এগিয়ে যাব। শিক্ষার উন্নয়ন ভিন্ন অন্য উন্নয়ন কখনও স্থায়িত্ব পেতে পারে না। এই উপলব্ধি এখন সকলেরই রয়েছে।

