ফসল হানির নানা প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়া শুরু করেছে। জেলার বাজার-হাটগুলোর ব্যবসাপাতিতে নেমে এসেছে ঘোর মন্দাবস্থা। অধিকাংশ দোকানিই অলস সময় কাটাচ্ছেন সারাদিন। অথচ এই সময়ে কাপড়চোপড়সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দোকানগুলোতে অন্যান্য বছরে ক্রেতা সমাগম একটু বেশি দেখা যেত। নতুন ধান বিক্রি করে প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলো বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সওদা করে নিতেন। এবার ফসল হারানোয় গভীর খাদ্য সংকটে পতিত কৃষকরা খাদ্যের বাইরে আর কিছু নিয়ে চিন্তা করতে পারছেন না। জেলার চাল কলগুলো বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। চালকলের মালিকরা আগাম ধান কিনে রেখেছিলেন, তারা এবার ধান পাচ্ছেন না। ব্যবসা-পাতির এই মন্দাবস্থার পাশাপাশি বিদ্যালয়েও এই ফসল হানির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ধর্মপাশা উপজেলায় চলমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ৩ হাজার ৫১৫ জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে। উপজেলার ১৯৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট পরীক্ষার্থী সংখ্যা ৩৩ হাজার ১৫৬ জন। প্রায় দশ শতাংশ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে। এর কারণ হিসাবে সংবাদে অভিবাবকদের কাজের সন্ধানে এলাকা ত্যাগ করাকে দায়ী করা হয়েছে এবং আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে সামনের দিনগুলোতে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার আরও বাড়তে থাকবে। ধর্মপাশার যে তথ্যটি সংবাদে পাওয়া গেল ধারণা করা খুবই সংগত যে পুরো জেলার চিত্র এরূপই। বিষয়টি উদ্বেগজনক।
সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলের প্রায় সকল মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতার জায়গাটি পুরোপুরি বিনষ্ট হওয়ার কারণে জনজীবনে যে নানামুখী বিপর্যয় নেমে আসবে এটি অনুমিতই ছিল। এখন সকলের উদ্দেশ্য থাকা উচিত এইসব বিপর্যয়কে কত কম জায়গার মধ্যে আটকে রাখা যায় সে বিষয়ে মনোযোগী হওয়া। কাজের সন্ধানে দলে দলে মানুষ এলাকা ছাড়ছেÑএটি বাস্তব সত্য। এই জন¯্রােতকে আটকে রাখতে চাইলে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। একটি দাবি উঠে আসছে জোরেশোরে। সেটি হলো এক বছরের জন্য যাবতীয় জলমহালকে উন্মুক্ত করে দেয়া। যাতে করে ফসল হারানো মানুষ জলাশয়ে মাছ ধরে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। আরেকটি দাবি ছিলো জেলার যেসব বালু ও পাথর মহাল রয়েছে সেখানে অবৈধ যান্ত্রিক উত্তোলনকে (বোমা মেশিন দিয়ে) কঠোরভাবে বন্ধ করে শ্রমজীবী মানুষদের বালু ও পাথর তুলে জীবিকা চালানোর ব্যবস্থা করে দেয়া। সবচাইতে বড় দাবি হলো, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আগামী এক বছর যথাযথ খাদ্য সহায়তা জুগিয়ে যাওয়া। সরকার অবশ্য জনগণকে বাঁচাতে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা এই সহায়তাগুলো মাঠ পর্যায়ে যাতে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে সেটি নিশ্চিত করার দাবি জানাই।
ধর্মপাশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী অনুপস্থিতির যে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেলো একে রোধ করতে গ্রামীণ নেতৃত্ব, স্কুল কমিটি ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সরকার স্কুল ফিডিং নামে একটি প্রকল্প বিভিন্ন জায়গায় বাস্তবায়ন করার চিন্তা করছেন। এটি এখনই সুনামগঞ্জের বিদ্যালয়গুলোতে চালু করা আশু প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে আসলে যদি শিক্ষার্থীরা দুপুরের খাবার পায় তাহলে অনুপস্থিতির পরিমাণ কমে যাবে নিঃসন্দেহে। যেসব অভিভাবক কাজের সন্ধানে বাইরে গিয়েছেন তাদের সন্তানদের নাম যাতে বিদ্যালয়ের খাতা থেকে কাটা না যায় সে ব্যবস্থা বজায় রেখে এদের পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছাত্র বেতন ও পরীক্ষা ফিস মওকুফের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

