শিক্ষা জাতীয়করণের দাবি

স্টাফ রিপোর্টার
গেল কয়েকদিন আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক নিয়োগ করা হয়েছে। যাকে সরাসরি বলা হয় পিয়ন। এখানে ৯০ ভাগ নেয়া হয়েছে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করা ছেলে-মেয়েদের। এখানে ইংরেজিতে পাস অনার্স- মাস্টার্স শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। যে শিক্ষায় মাস্টার্স ডিগ্রী নেয়ার পরেও পিওন হতে হয় সেই শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা চলবো কি চলবো না সেটা ভাবতে হবে।
মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ কলেজ- বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) সুনামগঞ্জ জেলা শাখার আয়োজনে আলোচনা ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ প্রফেসর পরিমল কান্তি দে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। বুধবার দুপুরে শহরের শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে আলোচনা ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা উৎসব হয়েছে।
আলোচনাসভায় প্রফেসর পরিমল কান্তি দে আরও বলেন, সরকারি ছাড়াও বেসরকারি কলেজগুলোতে অনার্স মাস্টার্স শ্রেণি খুলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষক দেয়া হচ্ছে না। ২ জন শিক্ষক দ্বারা একাদশ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত চলছে। মানে সম্পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি চরম অরাজগতা চলছে। কয়েক বছর আগে বেসরকারি কলেজগুলোতে সরকারিকরণ করা হয়েছে। অথচ আজও তারা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পেলেন না। এটা কেমন কথা? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করেছিলেন তেমনি এখন সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করতে হবে।
তিনি বলেন, এই সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে আমরা দেখছি বিনা পরীক্ষায় এসএসসি পাস, অনার্সে পড়লে ক্লাস করতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি শিক্ষকরা সপ্তাহে ৩ দিন ক্লাসে যান, কোনো কোনো শিক্ষক অফিস রুমে বসে আড্ডা মারেন, অথচ ক্লাসে যান না। এই চিত্রটি আমাদের সামনে ভেসে উঠছে। তথাকথিত এসাইনমেন্টের নামে যা ইচ্ছে তাই নম্বর বসানো হচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষক খাতা দেখছেন কোনো শিক্ষক দেখছেন না।
সরকারের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষা হচ্ছে ৩টি বিষয়ে। ইংরেজি, বাংলা এবং অংক ছাড়া। ঠিক একইভাবে এইচএসসি পরীক্ষা হচ্ছে। বিজ্ঞান পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে ব্যবহারিক ছাড়া। তাহলে বিজ্ঞান সম্মত শিক্ষা হবে কোথায় ? সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের বোটানিতে পড়–য়া একজন শিক্ষার্থীকে বললাম, ২ জন শিক্ষকের নাম বলো? সে বলতে পারলো না! কারণ শিক্ষার্থীদের এখন আর কলেজে যেতে হয় না। এই বিষয়গুলো আপনাদের চিন্তা করতে হবে। পঞ্চাশ বছরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন জায়গায় গেছে!
সুনামগঞ্জ জেলা বাকবিশিস সভাপতি শুভঙ্কর তালুকদারের সভাপতিত্বে ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবং স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা পরিষদের সদস্য সচিব প্রভাষক দুলাল মিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ ধূর্জটি কুমার বসু, সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর দিলীপ কুমার মজুমদার, হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী স্বপন কুমার দত্ত, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক সুখেন্দু সেন, কবি ও প্রাবন্ধিক ইকবাল কাগজী, জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান নারী নেত্রী ফৌজি আরা শাম্মী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মুজিববর্ষে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর পূর্ণ বাস্তবায়নসহ সহযোগী অধ্যাপক পদে পদায়ন ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬% বরাদ্দ, এমপিওভূক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা, বাড়ীভাড়া ও চিকিৎসাভাতা প্রদান করতে হবে। হাওরাঞ্চলের প্রতিটি উপজেলায় কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীদের ২০% হাওরভাতা এবং স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক- কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করা, শিক্ষাব্যবস্থা সাম্প্রদায়িকতা ও বাণিজ্যিকীকরণ মুক্ত করে শিক্ষার উন্নয়নে দক্ষ মানবিক বোধসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান বক্তারা।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ পৌর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা কমিটির আহ্বায়ক রামানুজ রায়। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ইসলামগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. সাজিনুর রহমান, সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি অ্যাড. খলিল রহমান, দিগেন্দ্র বর্মন সরকারি ডিগ্রী কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মো. মশিউর রহমান, বাদাঘাট সরকারি ডিগ্রী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক লিটন চন্দ্র সরকার, বাকিবিশিস জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি মাহমুদ সুলতান, সুনামগঞ্জ জেলার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রজত কান্তি রায় ও নর্থ ইস্ট আইডিয়াল কলেজের প্রভাষক সুমনা রাণী দাস প্রমুখ।
সভাশেষে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মহান বিজয়ের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ ‘অনুশীলন’র মোড়ক উম্মোচন করেন অনুষ্ঠানের অতিথিবৃন্দ।