শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও এমপির প্রতিশ্রুতি রক্ষা

প্রতিশ্রুত পালন করা যেকোন সজ্জন ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে প্রতিশ্রুতিদানকারী ব্যক্তি যদি সমাজের বিশিষ্ট কেউ হন তখন তো তাঁর নৈতিক দায়টি আর যে কারও চাইতে বেশি। সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন গত ১৩ মে তাহিরপুরের এক সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ফসল হারানো অভিভাবকদের সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঝরে পড়া রোধ করতে তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এক বছরের বেতন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে দিয়ে দিবেন। তাঁর এই ঘোষণা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। পরে তিনি যখন বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাওনা বেতনের বিপরীতে গত ৬ সেপ্টেম্বর ১ লাখ টাকা প্রদান করেন তখন তিনি আরও বেশি প্রশংসাধন্য হয়েছিলেন। আমরা দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সম্পাদকীয় স্তম্ভে তাঁকে বিপুলভাবে অভিনন্দিত করেছিলাম। কিন্তু গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ নিশ্চিতভাবেই সকলকে হতাশ করবে। ওই সংবাদ অনুসারে বাদশাগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলকে ১ লাখ টাকা দেয়া ছাড়া গত হওয়া শিক্ষাবর্ষে তিনি আর কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বেতনের টাকা পরিশোধ করেন নি। শিক্ষাবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় তাঁর নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষগণ বলছেন, সংসদ সদস্যের ঘোষণার পর কোন অভিভাবক ছাত্র-ছাত্রীদের বেতন পরিশোধ করেন নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও অভিভাবকদের উপর তেমন কোন চাপ তৈরি করা হয় নি। তারা বলছেন, পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের বেতনের অংশবিশেষসহ নানাবিধ খরচাদির প্রধান উৎস হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে আদায়কৃত বেতনের টাকা। এক বছর ধরে বেতন আদায় বন্ধ থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক খরচ চালাতে বিশেষ সমস্যার সন্মুখিন হয়েছে বলেও তাদের বক্তব্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে নিজ প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সংসদ সদস্যকে বেতনের অর্থ পরিশোধ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
এদিকে স্বয়ং মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেছেন, তিনি পর্যায়ক্রমে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। বাদশাগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলের আসন্ন পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে তিনি বিভিন্ন বিদ্যালয় প্রধানদের হাতে প্রতিশ্রুত অর্থ তোলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা আশা করব তিনি ওইদিন নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে জনপ্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে একটি স্বর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করবেন।
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। গতবারের ফসল হারানোর রেশ এখনও জেলার কৃষকদের জীবনে সমান ক্রিয়াশীল। গতবারের ফসলহারানোর সাথে এই সময়ে নতুন বোরো চাষাবাদের জন্য কৃষকদের আর্থিক চাহিদা তীব্র। এদিকে এখনই শিক্ষার্থীদের নতুন শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময়। ভর্তি মওসুমে বিভিন্ন বিদ্যালয় কর্তৃক অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রবণতা একটি সাধারণ চিত্র। এবার অন্তত সেই সাধারণ প্রবণতা পরিহার করে সর্বনি¤œ অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ তৈরি করে দেয়ার জন্য আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনে রাখতে হবে একজন সংসদ সদস্য যখন কৃষকদের ব্যথায় সমব্যথী হয়ে শিক্ষার্থীদের বিরাট পরিমাণ বেতনের অর্থ নিজ তহবিল থেকে পরিশোধের অঙ্গীকার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অনুরূপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সরকার নির্ধারিত টাকার চাইতে এক টাকাও এবার বেশি না নেন সেটি নিশ্চিত করেই তারা কেবল সংসদ সদস্যের ওই মানবহিতৈষী পদক্ষেপকে সম্মান জানাতে পারেন।