শীতার্থের কম্বল সরকারি কর্মকর্তাদের গোদামে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে শীত জেঁকে বসেছে। আগামী সপ্তাহ এবং জানুয়ারি’র প্রথম সপ্তাহে সুনামগঞ্জের কোন কোন উপজেলায় শীতের তীব্রতা ১১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নামতে পারে বলেও সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাবাস রয়েছে। শীতের এমন তীব্রতার সময়েও সরকারের দেওয়া কম্বল কেবল উদ্যোগের অভাবে পাচ্ছেন না দরিদ্র শীতার্থরা। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন থেকে গেল ১৭ নভেম্বর কম্বল কেনার বরাদ্দপত্র পাঠালেও সুনামগঞ্জের কোন কোন উপজেলায় এখনো কম্বল কেনা হয় নি।
মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের উপজেলা ধর্মপাশায় কম্বল কেনার জন্য আট লাখ ১৬ হাজার ৭১৩ টাকা বরাদ্দ হলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই উপজেলার কম্বলই কেনা হয় নি।
দিরাইয়ে কম্বলের জন্য সাত লাখ ৭৭ হাজার ৭৬৯ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ওই উপজেলায় কম্বল কেনা হলেও বিতরণ হয় নি এখনো। জামালগঞ্জ, জগন্নাথপুর, তাহিরপুর, বিশ^ম্ভরপুর, ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার এবং ছাতকেও একই অবস্থা।
দোয়ারাবাজারে কেনা কম্বলের ওজন ১০০০ গ্রামের নীচে। অথচ এই উপজেলায় শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। শান্তিগঞ্জেও বেশি সংখ্যক কম্বল কিনতে গিয়ে কম ওজনের কম্বল কেনা হয়েছে।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান মামুন জানান, প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে দেওয়া চার হাজার ২৩০ পিস কম্বল ইতিপূর্বে বিতরণ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় বরাদ্দ পাওয়া সাত লাখ ৭৭ হাজার ৭৬৯ টাকায় দেড় কেজি ওজনের ১৪৩০ পিস কম্বল কিনলেও এগুলো এখনো বিতরণ হয় নি।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ^জিৎ দেব বললেন, ছয় লাখ ৫১ হাজার ২০৫ টাকা বরাদ্দ পেয়ে কোটেশনের মাধ্যমে ৮৪০ পিস কম্বল কেনা হয়েছে। কম্বল এখনো বিতরণ হয় নি। বিতরণের তালিকা করা হচ্ছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাজেদুল ইসলাম জানালেন, প্রথম দফায় নভেম্বরে পাওয়া কম্বল বিতরণ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় বরাদ্দ পাওয়া সাত লাখ ৪৫ হাজার ৭৯২ টাকার কম্বল কেনা হয়েছে। বিতরণও শুরু হয়েছে। তিনি বললেন, ‘আমি নিজে অসুস্থ, না হয় বিতরণ শেষ হয়ে যেত’।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো রায়হান কবির বললেন, দ্বিতীয় দফায় পাওয়া সাত লাখ ২৮ হাজার ৮৯০ টাকায় ১১৫০ টি কম্বল কোটেশনের মাধ্যমে কেনা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিতরণ হবে।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদিউর রহমান জাদিদ জানালেন, দ্বিতীয় দফার ছয় লাখ সাত হাজার ষাট টাকার কম্বল কোটেশনের মাধ্যমে কেনা হয়েছে। কম্বল এসে পৌঁছে গেছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাংশু সিংহ জানান, সাত লাখ ৩৩ হাজার ৩১৮ টাকা কম্বলের জন্য পাওয়া গেছে। আটশ গ্রাম ওজনের কম্বল এক হাজার নয়শ ৩৫ টি কেনা হয়েছে। বিতরণ দ্রুতই শুরু হবে। এতো কম ওজনের কম্বল কেন কেনা হলো জানতে চাইলে তিনি বললেন, বেশি সংখ্যক মানুষকে কম্বল দিতে চাই আমরা।
শান্তিগঞ্জে ছয় লাখ ছয় হাজার ৩১৬ টাকা বরাদ্দ পেয়ে ১৬৪০ টি কম্বল কোটেশনের মাধ্যমে কেনা হয়েছে বলে জানালেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুজ্জামান।
ধর্মপাশায় দ্বিতীয় দফায় বরাদ্দ পাওয়া আট লাখ ষোল হাজার ৭১৩ টাকার কম্বল এখনো কেনাই হয় নি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততা থাকায় কম্বল কেনা সম্ভব হয় নি জানিয়ে ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনতাসির হাসান বললেন, কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান শাহরিয়ার জানালেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার কম্বল বিতরণ শেষ পর্যায়ে তাদের। অবশ্য এই উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল হাই জানালেন, প্রথম দফায় ৪৭০ কম্বলের মধ্যে ৩০০ এবং দ্বিতীয় দফায় ১০০ কম্বল পেয়েছেন তিনি। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা দ্বিতীয় দফায় কম্বল কেনার জন্য আট লাখ ৮৪ হাজার ৮১১ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে।
ছাতকে কম্বল কেনার জন্য নয় লাখ ৩৫ হাজার ৪৩৪ টাকা ও শাল্লা উপজেলায় পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার নয়শ’ সাত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই দুই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাগণ ফোন না ধরায় তাদের বক্তব্য জানা যায় নি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের দায়িত্বশীলরা জানান, প্রথম দফায় সুনামগঞ্জে কম্বল এসেছিল ৪১ হাজার ৩২০ পিস। পহেলা নভেম্বর প্রতিটি ইউনিয়নে ৪৭০ পিস হিসাবে সেগুলো ১১ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। এই কম্বলগুলো প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার হতে দেওয়া হয়। সেগুলো ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় থেকে কেনাও হয়েছে।
এছাড়া জেলা প্রশাসককে তিন লাখ টাকা এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যকে চার লাখ টাকা কম্বল কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কোটেশন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গেল দুই জানুয়ারি সাত লাখ টাকার কম্বল কেনা হয়। রাজধানীর নিউ এলিফেন্ট রোডের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এলিট পাওয়ার টেকনোলজি থেকে ৭৭২ টি, আইটি ইনটেরিয়র থেকে ৭৭২ এবং ট্রেডকম ইন্টারন্যাশনাল থেকে ২৫৯ টি কম্বল কেনা হয়।
জেলা প্রশাসকের কম্বলগুলো এক হাজার গ্রাম ওজনের। এগুলো মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, মিশনসহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে বিলি করা হয়।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীমা আক্তার খানম মুঠোফোন রিসিভ না করায় তাঁর প্রাপ্ত কম্বল কিভাবে বিতরণ হয়েছে জানা যায় নি।
টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)’এর জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট আইনুল ইসলাম বাবলু বললেন, সরকার যথাসময়ে শীতার্থ দরিদ্র মানুষদের কম্বল কেনার টাকা দিয়েছেন। জেলাজুড়ে শীতের তীব্রতা চলছে, কোন কোন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কম্বল কিনে গোদামে রেখেছেন, কেউ কেউ এখনো কিনেন নি এটি দুঃখজনক, দুই-তিন দিনের মধ্যে গুণগত মান বজায় রেখে কম্বল বিতরণ না করলে সরকারের শীতার্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আকাঙ্খা ব্যাহত হবে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, যারা কম্বল বিতরণ করেন নি, আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভার্চুয়ালি সভা করে তাদেরকে তিনদিনের মধ্যে কম্বল বিতরণ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হবে। কোনভাবেই কেউ নি¤œমানের কম্বল বিতরণ করতে পারবেন না।