শুভ কামনা নিরন্তর ব্যাঘ্র বাহিনী

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশি যুবকদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিছক কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। যোগ্যতর প্রমাণ করে ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলে যাওয়া একটি দলের চূড়ান্ত পর্যায়ে একইরকম ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মত শক্তিধর একটি বিজয় হলো এটি। এমন ঐতিহাসিক বিজয় কোনো স্তুতিবাক্যে পূর্ণ হওয়ার নয়। রবিবার রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার পটচেস্টরুমের সেনউইন পার্কে যখন ব্যাট করছিল আমাদের যুবারা তখন বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অগণিত দর্শক টিভি পর্দায় চোখ আটকে রেখেছিলেন। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় কেটেছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত। মাঠে যেমন নির্ভার খেলেছে তরুণ টাইগাররা, দর্শকরা কিন্তু এমন নির্ভার ছিলেন না। এক একটি রানে যেমন টগবগিয়ে ফুটেছে বাংলাদেশ তেমনি এক একটি উইকেট পতনের মধ্য দিয়ে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল সর্বত্র। শেষের দিকে অধরা জয় যখন করায়াত্ত তখনও উত্তেজনার পারুদ সমানে উঠানামা করছিল, পটচেস্টরুমের ক্ষণিকের বৃষ্টি তাকে শীতল করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত দলপতি আকবর আলী আর রাকিবুল জুটি জয়সূচক রান করে যখন ভো দৌঁড় শুরু করল সেই সময়ে যেন প্রতিটি বাংলাদেশির মন থেকে নামল হিমালয় পাহাড়ের মতো ভারী কোনো বস্তু। সকলেই উদ্বেল হলেন। ইয়ং টাইগার্সরা খেলার যে কোনো ইভেন্টে বিশ্ব মঞ্চে এই প্রথম বিশ্ব জয়ের খেতাব এনে দিল। অমিত শক্তিধর ভারতকে হারানোয় এ জয় পেল বিশিষ্টতা। অভিনন্দন বাংলাদেশের তরুণ টাইগার্স, তোমাদের। তোমরা আমাদের একটি দিন ও রাত আনন্দে ভাসতে দিয়েছ। তোমাদের কারণে আমরা আজ দূর মহাদেশের অজানা এক শহরে বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকাকে একেবারে শীর্ষে উড্ডীন হতে দেখলাম। তোমরা আমাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা গ্রহণ করো।
এই জয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের সুনাম যেমন বাড়িয়েছে তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছে দায়িত্ববোধ। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন (তা যতই বয়সভিত্তিক হোক না কেন) একটি দলের ছন্দপতনও অশেষ দুঃখের কারণ হবে। তাই হে যুবকরা, হে বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্তারাÑ আপনারা আনন্দ করছেন করুন, করবেনই তো; তবে একেবারে আকাশে চড়ে বসবেন না। এ থেকে বাড়তি প্রচার-প্রসার-প্রাপ্তি-বাণিজ্য করার মওকা খোঁজবেন না। বরং এর চাইতে ঢের ভাল, এই দলটিকে আরও পরিচর্যা করুন। এদের পিছনে আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এদের মূল জাতীয় দলের উপযোগী করে গড়ে তুলুন। তাহলেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিনেই পাকিস্তানে আমাদের বড় দলটি যে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে পুরো জাতিকে, সেই ধরনের লজ্জায় পড়তে হবে না। খেলায় জয় পরাজয় থাকবে, এ অবধারিত। তবে কেউ যদি ন্যূনতম প্রতিযোগিতাটুকুই গড়ে তুলতে না পারে তাহলে সেটি হয়ে উঠে হাস্যাস্পদ। বাংলাদেশ জাতীয় দল এখন এমন হাস্যকর পারফর্মেন্সই করছে। এই জায়গা থেকে শিক্ষা নিতে হবে বাংলাদেশের সবচাইতে ধনি ক্রীড়া সংগঠন বিসিবিকে।
সোমবারের মন্ত্রী পরিষদ সভায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে দেশে ফেরার পর গণ সংবর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তারা যে অমর কীর্তি গড়েছে তাতে এটুকু সম্মান তারা দাবি করে। আমরা অধীর আগ্রহে দলটির দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছি। সারা দেশ সেদিন পুরো দলের নামে জয়ধ্বনি দিবে। এই জয়ধ্বনি যাতে আকাশে মিলিয়ে না গিয়ে বরং সার্বক্ষণিক অনুরণন তৈরি করে রাখতে পারে সেই পরিবেশ তৈরি করাও সমান জরুরি, যে কথা আমরা আগেই বলেছি। ক্রিকেট এখন খেলার চাইতে অনেক বেশি বাণিজ্য হয়ে উঠেছে। আমরা এই বাণিজ্যায়নের বিরুদ্ধে। আমরা বরং খেলাধুলাকে লাভ-লোকসানের চাইতেও বড় কিছু দেখতে চাই। খেলাকে আরও মহত্তম রূপে দেখতে আগ্রহী আমরা। বাংলাদেশের যুবকরা নিশ্চয়ই জাতীয় ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন মহত্তম অবস্থানে নিয়ে যাবে। শুভ কামনা নিরন্তর ব্যাঘ্র বাহিনী।