‘শেষ ট্রেনের যাত্রী’ এক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

উজ্জ্বল মেহেদী
রাজনীতি চাঙা হয় জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে। জং ধরা থাকলেও জমে যায। বড় দল, ছোট দল সব একাকার হয়। ভোটের আগে জোটবদ্ধ রাজনীতিও হয়। আবার কথা বা শব্দবানে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। প্রয়াত জাতীয় নেতা একজন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বেলায় শব্দবান রীতিমত তুফান বইত। মহান জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে রাজনীতির জনসভায়, এই নেতার ভাষণ-ব্রিফিং থেকে কোনো কথা বা শব্দ ইস্যু হয়ে যেত, অনেক অজানা দিক উন্মোচিত হতো। আমার সাংবাদিকতার সূচনাকালে এমনটি হচ্ছিল। এ জন্য আমি উন্মুখ হয়ে থাকতাম ‘সেনদার’ কথা থেকে সূত্র খোঁজে সংবাদ সূত্রপাত ঘটাতে।
একদিন একদম কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়। সূত্রধর ছিলেন সাংসদ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। তখন আইনপেশার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতেন মিসবাহ ভাই। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুযারি মাসে সুনামগঞ্জ শহরের একটি উদ্যোগ নিয়ে আমার লেখা ভোরের কাগজ-এর মেলায় প্রধান ফিচার হয়েছিল। ‘আসমান ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে’ শিরোনামের ফিচারটি সুনামগঞ্জ শহরকে জোছনার শহরের খ্যাতি এনে দেয়। সেই থেকে সুনামগঞ্জ জোছনার শহর পরিচিত। ওই বছর সেনদা তাঁর নির্বাচনী এলাকায় একটি দুর্যোগ দেখতে সাংবাদিক দলকে সঙ্গী করতে চাইলেন। মিসবাহ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা গেলাম তাঁর সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী এলাকা দিরাই-শাল্লায়। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একটি স্প্রিডবোটে করে আমাদের নিয়ে ছুটলেন গহীন হাওরে। পরিচিত হওয়ার পালায় আমাকে কাছে টেনে নিয়ে সেনদা বললেন, ‘আসমান ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে দেখলে অইত না, আফালে হাওরের বাড়ি-ঘর ভাঙে-এসবও দেখতে অইব!’
আহা, শব্দবান! বহনের সক্ষমতা ছিল শুধু সেনদার। অপ্রচলিত বা গহীনের শব্দ বহন করতেন। একবার একজনকে ‘মাংটা’ বলে ভৎর্সনা করেছিলেন। সেই লোক ক্ষমতাধর হওয়ার পরও মানুষ আড়ালে সেই ‘মাংটা’ বলা ভুলেনি। সেবার সেই পরিভ্রমণে হাওরের ‘আফাল’কে অবিকলভাবে প্রতিবেদনে তুলে এনেছিলাম আমরা। ‘আফাল’ হাওরে বর্ষাকালীন একটি দুর্যোগ। প্রলয়ংকারী ঢেউ। হাওরসাংবাদিকতায় আমি এই একটি শব্দ নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন করেছি। আফাল থেকে আরেক দুর্যোগ ‘আউকি’র দেখাও হয়েছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বলা কঠিন কথাও রাজনীতি ও সাধারণে সমাদৃত হয়েছে। অর্থ না জেনেও প্রচলিত হয়েছে কঠিন কথা। কারণ, সেনদা বলেছেন বলে!
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হাওর এলাকার আসনখ্যাত ‘সুনামগঞ্জ-১’ আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিতে নামেন। ২০০০ সালে তাহিরপুর-মধ্যনগর-ধরমপাশা-জামালগঞ্জ ঘুরে এসে বলেছিলেন হাওরের ইজারাদাররা রামরাজত্ব কায়েম করেছে। এরমধ্যে প্রভাবশালী ইজারাদারদের তিনি ‘ওয়াটারলর্ড’বলে অভিহিত করেন। আমি লুফে নিলাম ওয়াটারলর্ড শব্দটি। এই শব্দ ধরে একটি প্রতিবেদন করলাম। কৌতূহলী সম্পাদক তখন ব্যক্তিগত পত্র দিয়ে ওয়াটারলর্ড বৃত্তান্ত জানতে চান। আমি জানাই, ‘হাওরের গডফাদার’কে ওয়াটারলর্ড বলা হয়েছে। শব্দটি বাংলা করতে চাইলে ঠিক যেন জমছিল না। শেষে এই ওয়াটারলর্ড ব্যবচ্ছেদে একের পর এক প্রতিবেদন করি। সাত কিস্তির ধারাবাহিক প্রতিবেদনও হয। বছর কয়েক পর ধরা পড়ে এক ওয়াটারলর্ড। সে নিয়ে যারপরনাই চাঞ্চল্য ক্ষমতার পালাবদলের ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’অভিযানেও। ওয়াটারলর্ড প্রভাবে ধস নামলে সহজেই মুক্ত হয়েছিল টাঙ্গুয়ার হাওর।
স্থানীয় বা জাতীয় সাংবাদিকদের প্রতি অন্য রকম এক টান ছিল সেনদার। ছোটদের প্রতি মায়া আর বড়দের প্রতি সম্মান। একবার তাঁর সুনামগঞ্জ সফরকালে দলীয় প্রতিপক্ষ ‘অবাঞ্ছিত ঘোষণা’ করে কালোপতাকা ওড়ায়। তাঁর বিরাগভাজন হবেন বলে স্থানীয় অনেক সাংবাদিক ওই রিপোর্ট করেনন। শুধু আমি করেছিলাম বলে তাঁর পক্ষের নেতারা ক্ষুব্ধ হন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরদিন একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। স্থানীয় নেতারা সংবাদ সম্মেলনে আমাকে দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। সেনদা এসেই আমার মাথায় হাত রাখেন। নেতাদের একজন তখন আমাকে দেখিয়ে বলেন, ‘একমাত্র সেই রিপোর্ট করেছে। সেনদা স্থানীয় নেতার কথায় বিরক্ত হন। বলেন, ‘রিপোর্ট অইছে কোনদিন?’ ওই নেতা বলেন ‘গতকাল’। সেনদা ওই নেতার কাছে জানতে চান, ‘আজকেরটা পড়ছসনি’বলে। ওই নেতা ‘না’ বললেন। সেনদা হাতের পত্রিকা নেতার হাতে দিয়ে রাগত স্বরে বলেন, ‘এইটা পড় আগে! এরপর দোষারূপ করিস!’
সেদিন, সেই সময়ে আগের দিন রিপোর্ট ছিল, ‘সুনামগঞ্জে সুরঞ্জিতকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে কালোপতাকা’। পরদিন রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘অবাঞ্ছিত, তবু নির্বিঘ্ন সুরঞ্জিত!’
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উন্নয়নের আগে রাজনীতির ঐকতান চাইতেন। উন্নয়নকে বলতেন চলমান প্রক্রিয়া। এগুলো আমলাদের কাজ। রাষ্ট্র থাকলে হবেই। রাজনীতি সমাজকে অগ্রসর করে। সুনামগঞ্জের দলাদলি রাজনীতিতে ঐকতান প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ছিল। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি আর অস্ত্রের ঝনঝনানির বিরুদ্ধে ছিলেন। ২০০৪ সালে সুনামগঞ্জে তখন জনপ্রতিনিধির ঐক্য গড়ার মনোনিবেশ করেন। সংবাদকর্মী হিসেবে জনপ্রতিনিধিদের দলনিরপেক্ষ ঐকতানে আমাদের সহযাত্রী হওয়ার আহবান ছিল। এই সূত্রে দলনিরপেক্ষ প্রার্থী সুনামগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে প্রয়াত কবি-জনপ্রতিনিধি মমিনুল মউজদীনকে ঘিরে একটি প্ল্যাটফরমে একাত্ম হয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সঙ্গে ছিলেন সাংসদ মুহিবুর রহমান মানিকও। কিন্তু রাজনীতির গড্ডালিকা প্রবাহে এক সময় সেই উদ্যোগ ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। সুনামগঞ্জে বিরোধ থাকলেও সীমানা পেরিয়ে এক ছিলেন। সংকটকালে বিভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতেন। সাধারণের মতো মিছিলের অগ্রভাগে থাকতেন। সিলেটে এ রকম একটি দলীয় ঐক্যের মিছিল করে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ…/তালে ঠিক!’
আমার দেখা বা জানামতে ভীষণ পড়ুয়া স্বভাবের ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সমসাময়িক বইপত্র হাতের নাগালে থাকত। রোজ একটি-দুটো নয়, একগাদা পত্রিকা পড়তেন। দেশের যেখানে যেতেন, সেখানকার স্থানীয় পত্রিকাও পড়তেন। পত্রপত্রিকায় রাজনৈতিক প্রতিবেদন ছাড়াও সমস্যা-সম্ভাবনার দিকে চোখ রাখতেন। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের রোপওয়ে (রজ্জুপথ) নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছিলাম। সেনদা সেই প্রতিবেদনটি মনে রেখেছিলেন। রেলমন্ত্রী হয়ে একদিন কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ গিয়ে রোপওয়ের সর্বশেষ অবস্থা দেখেছিলেন। ছাতক-সিলেট রেলপথ বন্ধ বা সুনামগঞ্জে রেলপথ নিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনীতির কিছু টানাপোড়েন সূত্রে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ-সাংসদ মুহিবুর রহমান মানিক সেদিন বলেছিলেন, সেনদার ইচ্ছে ছিল রেলকে যোগাযোগের প্রথম বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠার। সেই সঙ্গে রোপওয়ে সচল করে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ছাতককে পর্যটনমুখী করা।
দীর্ঘশ্বাস ভর করে। কিছুই হয়নি। ৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়ে নিজেকে নিয়ে কৌতুক করেই বলেছিলেন ‘আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী। কথায় অভিমান ও দুঃখবোধ ছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের তিন বছর পর মন্ত্রিসভায় স্থান পান। রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর। সেদিনই বলেছিলেন, ‘চুল পাকছে, বয়স পঁয়ষট্টির ঘর পার হয়েছে। আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী’।


রেলওয়েকে দুর্নীতিমুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, রেলের ‘কালো বিড়ালটি’ খোঁজে বের করতে চাই। অনেকে বলেছেন, উল্টো কালো বিড়াল তাঁকে কামড়াল। রাজনীতিবিদরা দায় এড়াননি, দায় নিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ত্যাগ থাকলে পদত্যাগ করা যায়। পদত্যাগ করলেও কোনো দপ্তর ছাড়াই মন্ত্রী ছিলেন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।
সংবিধান ও আইন নিয়ে যখন বিতর্ক দেখা দিয়েছে তখনই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দ্বারস্থ হয়েছেন শিক্ষক-সাংবাদিক থেকে শুরু করে সংসদ সদস্যরাও। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মনোনয়ন নিয়ে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ন্যাপের পর একতা পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি ও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। সেই থেকে একবার ছাড়া জাতীয় সবকটি নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি অর্জন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে শেষ পর্যন্ত কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেননি। যে কারণে তিনি সেদিন ওই সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। নবম সংসদে আদালতের আদেশ অনুযায়ী বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১১ সালের ২৯ জুন বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনের পর সেদিন স্বাক্ষর না করার ব্যাখ্যা দেন।
আমি তাঁর মুক্তিযুদ্ধ ও তাঁকে লক্ষ্য করে তিন-তিনটি গ্রেনেড হামলা সইতে হয়েছে। এসব জঙ্গি-হামলার প্রেক্ষাপট নিয়ে আমার সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চেয়েছিলেন। ২০০৪ সালে ২১ আগস্টের আগে দিরাইয়ে আখড়ার মোড়ে জনসভাস্থলে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০০১ সালে শাল্লায়। সেনদা বলেছিলেন, এসব নিয়ে এমন কিছু বলবেন, যা আগে কখনো বলেননি। আমি অপেক্ষায় ছিলাম। বলা হয়নি তাঁর। মনে পড়ে, খুব অসুস্থ। ২০১৭ সালের জানুয়ারির দিকে আইন ও সংবিধান বিষয়ক লেখক-সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান তাঁর মুখোমুখি হন। সেনদা তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন কি না, আমাকে ফোন করেন।
চিরচেনা দরাজ গলা ভেঙে গেছে। মনে হচ্ছিল, কথা বলতেও ক্লান্ত লাগছিল। ‘শরীর খুব খারাপ! কিতা থেকে কিতা কইমু…’ বলে ইতস্তত করছিলেন। আমি বলি, ‘দাদা উনাকে আপনার নম্বরটা আমিই দিয়েছি। আপনি ছাড়া এসব বিষয়ে আর কে কথা বলবে? কথা বলুন!’ শুনে সেনদা অস্ফুট স্বরে বলেছিলেন, ’তরাও বড় বিপদে! আমি ছাড়া আর কে কইব!’
সেনদার সেই সব কথাই ছিল জীবনের শেষ কথা। মৃত্যুর পরদিন ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় দ্বিতীয় পাতায় ছাপা হয়েছিল ‘শেষ সাক্ষাৎকার’। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রাজনীতির ‘বিবেক’হয়ে অসুস্থ শরীরে কথা বলেছিলেন। লিপিবদ্ধ করা মিজানুর রহমান খানও করোনা মহামারিতে অকস্মাৎ চলে গেছেন। শেষ কথা বলা ও শোনার এ দুজনই অগ্রগণ্য। রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় তাঁদের জায়গায় তাঁরা দুজন ছিলেন অনন্য। দুজনই ‘শেষ ট্রেনের যাত্রী’ হয়ে পাড়ি দিলেন। তাঁদের কোনো বিকল্প থাকল না আর!
লেখা : ‘উজ্জ্বল মেহেদী নিউজিয়াম’ থেকে সংক্ষেপিত।